হাওরে সংকট ও সতর্কবার্তা 

কাসমির রেজা
২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৩৯আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৩৯

গেলো কয়দিন ধরে আবহাওয়া অধিদফতর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে হাওরে অকাল বন্যার সতর্কতা-বার্তা প্রচার করা হচ্ছে। তারা হাওরের কৃষকদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছেন। বলছেন, মেঘালয়ের পাহাড়ে বিশেষ করে চেরাপুঞ্জিতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। চেরাপুঞ্জিতে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে হাওরে পাহাড়ি ঢল নামার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ইতোমধ্যে পাহাড়ি ঢল নেমেছে। কয়েক জায়গায় হাওরে পানিও ঢুকছে। তলিয়ে গেছে অনেকের স্বপ্নের সোনালী ফসল। কৃষকরা ফসল রক্ষায় দ্রুত ধান কাটার চেষ্টা করছেন। সে চেষ্টা তারা করেই যাবেন।

দ্রুত ধান কেটে ফেলার কথা বললেই যে কৃষকরা দ্রুত ধান কেটে ফেলতে পারবেন, তা কিন্তু নয়। হাওরে রয়েছে শ্রমিক সংকট। এছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হারভেস্টার মেশিনও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আর যেখানে ধান পাকেই নাই সেখানে কেটেইবা কী হবে? যারা ধান কেটেছেন বৃষ্টির কারণে তারা সেসব ধান শুকাতে পারছেন না। এর মাঝে হাওরের ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে কৃষকরা মারা যাচ্ছেন। এসব বহুমুখী সংকটে এখন হাওরের কৃষক। তাদের যেন সমস্যার অন্ত নেই। এসব সমস্যার কোনও সরলরৈখিক সমাধানও নেই।

হাওরের এসব নানামুখী সমস্যার মূলে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতি বিরূপ আচরণ করছে। হাওরের মানুষের জীবন-জীবিকা যেহেতু প্রকৃতি নির্ভর, তাই প্রকৃতির রুষ্টতা তাদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আমরা দেখছি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বড় বড় প্রকল্প হচ্ছে। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। জলবায়ু তহবিলের টাকা দিয়ে শহরের ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু যারা প্রকৃত পক্ষেই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাদের ভাগ্যে জুটছে না ছিটেফোঁটাও। এই বৈষম্য রোধ করার জন্য হাওরে জলবায়ু সুবিচার আন্দোলন শুরু হয়েছে। সীমিত পরিসরে তরুণরাই এই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হাওরের এই জলবায়ুর সুবিচার আন্দোলনের কথা পৌঁছাচ্ছে না নীতি নির্ধারকদের কানে। জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন বা কপ-এর মত বড় আয়োজনে হাওর উপেক্ষিতই থেকে গেছে। দেশের জলবায়ু সংবেদনশীল বিভিন্ন এলাকা থেকে ওইসব আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রতিনিধিত্ব থাকলেও হাওরের প্রতিনিধিত্ব থাকছে না।

হাওরের শ্রমিক সংকট নিরসনের জন্য বালু-পাথর মহালে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে একটি প্রচারণা শোনা যাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, দিনের বেলায় বালুমহালে কাজ না হলেও রাতের আধারে পরিবেশ ধ্বংস করে— এখানে ধ্বংসযজ্ঞ ঠিকই চালানো হচ্ছে। রাতে যেসব শ্রমিক এখানে কাজ করে দিনে তারা নিশ্চয়ই ধান কাটে না। বালুমহাল এবং হাওরের দূরত্বও এখানে বিবেচ্য। হাওরে অবস্থান করে এসব বালুমহালে রাতে এসে কাজ করার কথা নয়। তাই বালুমহাল বন্ধের এই ঘোষণা অনেকটা লোক দেখানো। এতে হাওরের শ্রমিক সংকট নিরসন হচ্ছে না। অতীতে বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিকরা হাওরে ধান কাটতে আসতেন। এখন আর আসেন না। প্রযুক্তির নানা উৎকর্ষতার যুগে এমন হারভেস্টার আবিষ্কৃত হয়নি, যা কর্দমাক্ত বা কিছুটা পানি থাকলেও ধান কাটতে পারে। ড্রায়ারের অভাবে ধান শুকানো যাচ্ছে না। কার্যত ড্রায়ারের প্রচলনই নেই।

অকাল বন্যার হাত থেকে হাওরের ফসল রক্ষা করার জন্য যে ফসল রক্ষা বাঁধ দেওয়া হচ্ছে, তা অনেকটা অবৈজ্ঞানিক। এবছর তা হারে হারে টের পাওয়া গেছে। অনেক হাওরেই জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য বাঁধ কেটে দিতে হয়েছে । কেউ বাঁধ কাটার পক্ষে, কেউ বাঁধ রাখার পক্ষে। এ নিয়ে সংঘর্ষ হয়েছে। বাঁধ কাটতে গিয়ে এক তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তাই বাঁধ নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে হবে। দরকার বিজ্ঞানসম্মত সমাধান।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হাওরে অকাল বন্যার সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। এখন মার্চের শেষেও বন্যার পানি চলে আসে। তাই আগাম জাতের ধানের আবিষ্কার এবং ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। কিছু আগাম জাতের ধান আবিষ্কার হলেও এর ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে না।

যে বজ্রপাতের ভয়ে এখন অনেকেই হাওরে ধান কাটতে যাচ্ছেন না, সেই বজ্রপাতে মৃত্যু রোধে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তালগাছ রোপণ প্রকল্প বা বজ্র নিরোধক দণ্ডের প্রকল্পে অনেক টাকা খরচ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সমাধান হয়নি। এ নিয়ে একটি বিজ্ঞানসম্মত ও আন্তরিক প্রচেষ্টা দরকার।

হাওরের প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রশমনে আগাম সতর্কবার্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এর বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যতা নিয়ে কৃষকরা সন্দিহান থাকেন। অতীতে কোনও কোনও সময় সতর্কবার্তার কারণে কৃষকদের কাঁচা ধান কেটে ফেলতে দেখা গেছে। এতে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। যে সুনামগঞ্জ জেলাকে সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত প্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা, যেখানে বছর-বছর অকালবন্যায় ফসলসহানি হয়, সেই সুনামগঞ্জ জেলায় একটি পূর্ণাঙ্গ আবহাওয়া কেন্দ্র নেই। একটি পূর্ণাঙ্গ আবহাওয়া কেন্দ্র থাকলে আগাম সতর্কবার্তার সত্যতা নিয়ে সংশয় কমে যেতো। কৃষকরা ও সব সময় এসব সতর্কতা বার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতেন। এর ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমতো। কৃষকরা আগাম সতর্কবার্তা মেনে দ্রুত ধান কাটার চেষ্টা করছেন। সেই চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। ধান না বাঁচলে তো তাদের প্রাণও ওষ্ঠাগত হয়। এটা সব মহলকে বুঝতে হবে।

এই যে হাওরের এত সমস্যার কথা আমরা জানছি। এসব সমস্যার সমাধান করবে কে? সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব যাদের ঘাড়ে তারা কি আসলেই এটিকে বড় কোনও সমস্যা হিসেবে গণ্য করছেন? নাকি ধরে নিয়েছেন হাওরের প্রান্তিক মানুষের জীবনের কোনও মূল্য নেই। দুর্দশা এবং নির্মম মৃত্যুই কৃষক ও জেলেদের জন্য অবধারিত? মুক্তি কোন পথে?

লেখক: সভাপতি পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা

 [email protected]

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
হাওরের জন্য ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের দাবি
‘ঋণ পরিশোধ করমু নাকি সংসার চালামু, এই চিন্তায় ঘুম আয় না’
সুনামগঞ্জে বৃষ্টিতে হাওরে ফের বাড়ছে পানি, বাকি ধান নিয়ে উদ্বেগ
সর্বশেষ খবর
জবিতে ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে কমিটি
জবিতে ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে কমিটি
কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি, চট্রগ্রামে কুরিয়ার কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা
কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি, চট্রগ্রামে কুরিয়ার কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা
পুলিশের ওপর হামলার পর আদিতমারীর ওসিকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার
পুলিশের ওপর হামলার পর আদিতমারীর ওসিকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার
কানসাসে নামছে আর্জেন্টিনা, শাহবাগে আকাশি-সাদা ঢেউ
কানসাসে নামছে আর্জেন্টিনা, শাহবাগে আকাশি-সাদা ঢেউ
সর্বাধিক পঠিত
যারা তড়িঘড়ি আমানত ভেঙেছেন, তাদের জন্য নতুন ঘোষণা ইসলামী ব্যাংকের
যারা তড়িঘড়ি আমানত ভেঙেছেন, তাদের জন্য নতুন ঘোষণা ইসলামী ব্যাংকের
খুরশীদ আলমকে সরিয়ে দেওয়ায় বেঁচে গেলো ইসলামী ব্যাংক 
খুরশীদ আলমকে সরিয়ে দেওয়ায় বেঁচে গেলো ইসলামী ব্যাংক 
মাগুরার নতুন ডিসিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় পাঠানো হলো
মাগুরার নতুন ডিসিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় পাঠানো হলো
টাকা ভর্তি ব্যাগ নিয়ে শাবানার কাছে গিয়েছিলেন মালেক আফসারী
টাকা ভর্তি ব্যাগ নিয়ে শাবানার কাছে গিয়েছিলেন মালেক আফসারী
ভারতের সঙ্গে আমরা সম্পৃক্ত হতে চাই: ডা. জাহেদ 
ভারতের সঙ্গে আমরা সম্পৃক্ত হতে চাই: ডা. জাহেদ