ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান: এক মাসে গ্রেফতার ৫৫ হাজার

সুজন কৈরী
০৬ জুন ২০২৬, ২২:৩৪আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ২২:৩৪

চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে দেশজুড়ে চলছে পুলিশের বিশেষ অভিযান। গত ১ মে শুরু হওয়া এই অভিযানে এ মাসের ৪ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধে ৫৪ হাজার ৭৪৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকা থেকেই গ্রেফতার হয়েছেন ৩ হাজার ৩৭ জন। গ্রেফতারদের মধ্যে বিরোধী দল ও মতের রাজনৈতিক নেতাকর্মী থাকলেও পুলিশ বলছে, তারা তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের গ্রেফতার করছেন।

সংসদে ঘোষণার পর শুরু হয় প্রস্তুতি

গত ২৭ এপ্রিল জাতীয় সংসদে মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের উত্থাপিত এক নোটিশের জবাবে তিনি বলেন, ৩০ এপ্রিল সংসদ অধিবেশন শেষ হওয়ার পর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযান শুরু হবে। তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে মাদক ব্যবসা বিস্তার লাভ করেছে। বিশেষ করে গুলশান, বনানী ও ধানমণ্ডিতে সিসা বারের আড়ালে মাদকের কারবার চলেছে। সিসা বারগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় সেগুলো আবার চালু হয়েছে। এবার এসব কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হবে বলেও তিনি ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, কোনও প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা পুলিশ সদস্য মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকলে কিংবা মদদ দিলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযানের আগে তৈরি করা হয় তালিকা

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মাদক কারবারি, চিহ্নিত চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী এবং অন্যান্য অপরাধীদের একটি তালিকা তৈরি করে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব তালিকা তৈরির পর দেশব্যাপী অভিযান শুরু হয়।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত গ্রেফতার হওয়া ৫৪ হাজার ৭৪৫ জনের মধ্যে ১৫ হাজার ৪৫৭ জন চিহ্নিত চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও চুরি-ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া বিভিন্ন মামলার আসামি ও গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত ৩৯ হাজার ২৮৮ জনকেও আটক করা হয়েছে।

ঢাকায় গ্রেফতার তিন হাজারের বেশি

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ১ মে থেকে ৫ জুন পর্যন্ত রাজধানীতে বিশেষ অভিযানে মোট ৩ হাজার ৩৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ ২১৫ জন এবং তালিকার বাইরে আরও ৪৫২ জন চাঁদাবাজ রয়েছেন। এছাড়া সন্ত্রাস, ছিনতাই ও ডাকাতির অভিযোগে ১ হাজার ৪৪ জন এবং মাদক-সংক্রান্ত অপরাধে ১ হাজার ৩২৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

‘মাদক সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে সুফল মিলবে না’

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু গ্রেফতার অভিযান চালালেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। অপরাধের পেছনের সিন্ডিকেট ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। তারা বলছেন, এক মাসে বিপুলসংখ্যক গ্রেফতার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার প্রমাণ হলেও অভিযানের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে অপরাধী চক্র, মাদক সিন্ডিকেট এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় তার ওপর। ফলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তব প্রয়োগই এখন এই অভিযানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই অভিযানকে অবশ্যই জিরো টলারেন্স নীতিতে পরিচালনা করতে হবে। মাদক ও জুয়া তরুণ সমাজের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠেছে। তাই মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, বিভিন্ন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের পেছনে যারা ইন্ধন জোগান বা সুযোগ সৃষ্টি করেন, তাদেরও বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তার মতে, ঘোষিত অভিযান যদি কঠোর ও নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে সরকারের প্রত্যাশা যেমন পূরণ হবে না, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও হতাশা তৈরি হবে।

‘জিরো টলারেন্স নীতিতেই অভিযান চলছে’

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চুরি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান পুলিশের ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ১ মে থেকে বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ সদস্য বা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য জড়িত থাকলেও কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

যৌথ অভিযান চলছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছু এলাকায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করলেও বর্তমান অভিযান মূলত পুলিশের নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছে।

/জেইউ/এম/
সম্পর্কিত
মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে বাড়িতে গিয়ে ধর্ষণের কথা জানালো ছাত্র, অধ্যক্ষ গ্রেফতার
পাবনার এসপিসহ পুলিশের ১০ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বদলি
চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ রেঞ্জে নতুন ডিআইজি
সর্বশেষ খবর
‘মহান সংসদ নামের মর্যাদাটুকু বাঁচাতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে’
‘মহান সংসদ নামের মর্যাদাটুকু বাঁচাতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে’
অবসরের পর বিতর্কে ওয়ার্নার, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর দায় স্বীকার
অবসরের পর বিতর্কে ওয়ার্নার, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর দায় স্বীকার
টানা বিক্ষোভের মুখে ইউক্রেনের সেনাপ্রধানকে সরালেন জেলেনস্কি
টানা বিক্ষোভের মুখে ইউক্রেনের সেনাপ্রধানকে সরালেন জেলেনস্কি
ধরা পড়ার আগে রোমান্টিক, ধরা পড়লে কয় বউ, এদের আবার বট বহিনী আছে: তাহেরী
ধরা পড়ার আগে রোমান্টিক, ধরা পড়লে কয় বউ, এদের আবার বট বহিনী আছে: তাহেরী
সর্বাধিক পঠিত
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নিয়ে নানান প্রশ্ন, যা বললেন স্ত্রী ও শ্বশুর
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নিয়ে নানান প্রশ্ন, যা বললেন স্ত্রী ও শ্বশুর
আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ভাইরাল, সেই রুনা ডিবির হাতে গ্রেফতার
আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ভাইরাল, সেই রুনা ডিবির হাতে গ্রেফতার
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
গুজবে তেলের পাম্পে দীর্ঘ লাইন, ট্যাংকি ভর্তি করার হিড়িক, প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তি
গুজবে তেলের পাম্পে দীর্ঘ লাইন, ট্যাংকি ভর্তি করার হিড়িক, প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তি
চাকরি হারালেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, গ্রেফতারে চলছে অভিযান
চাকরি হারালেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, গ্রেফতারে চলছে অভিযান