বিশ্বব্যাংকের কালো তালিকায় উঠেছে বেক্সিমকো কম্পিউটারস লিমিটেডের নাম। দরপত্রে যোগসাজশের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে অন্তত ১০ মাসের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে এই সময়ে বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত কোনও প্রকল্পের দরপত্র, চুক্তি বা সরবরাহ কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে না প্রতিষ্ঠানটি। তবে ১০ মাস পার হলেই নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উঠবে না। অবমুক্তির জন্য বেক্সিমকো কম্পিউটারসকে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং গ্রহণযোগ্য দুর্নীতিবিরোধী কমপ্লায়েন্স কাঠামো বাস্তবায়ন করতে হবে।
গত ১৮ জুন বিশ্বব্যাংক এই নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত নিলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) নোটিশটি প্রকাশ করে। এর আগে গত ৬ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপসচিব মো সাইদুজ্জামান খানের সই করা এক চিঠিতে বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
দুই দরপত্রে যোগসাজশের অভিযোগ
অভিযোগটি বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত ‘বাংলাদেশ এনহ্যান্সিং ডিজিটাল গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমি প্রজেক্ট’র দুটি সরবরাহ চুক্তি নিয়ে।
বিশ্বব্যাংকের নথি অনুযায়ী, বেক্সিমকো কম্পিউটারস এবং আরেকটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে আলাদা প্রতিযোগী হিসেবে অংশ নেয়। কিন্তু দুটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে দরপত্র তৈরির ব্যবস্থা করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
বিশ্বব্যাংক এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে যোগসাজশমূলক আচরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটির ভাষ্য, এতে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দরপত্রের স্বচ্ছতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
গত ১২ মার্চ বিশ্বব্যাংকের প্রধান সাসপেনশন ও ডিবারমেন্ট কর্মকর্তা বেক্সিমকো কম্পিউটারসকে নোটিশ দেন। প্রতিষ্ঠানটি শুরুতে একটি ব্যাখ্যা জমা দেয়।
তবে নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের স্যাংশনস বোর্ডে অভিযোগ ও প্রস্তাবিত শাস্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানায়নি। ফলে অভিযোগটি অপ্রতিদ্বন্দ্বি বা ‘আনকনটেস্টেড’ হিসেবে বিবেচিত হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়।
নিষেধাজ্ঞার ফলে বেক্সিমকো কম্পিউটারস বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত কোনও নতুন চুক্তি পাবে না। ব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত দরপত্রেও অংশ নিতে পারবে না।
প্রতিষ্ঠানটি কোনও যোগ্য দরদাতার সাব-কন্ট্রাক্টর হতে পারবে না। পরামর্শক, উৎপাদক, সরবরাহকারী বা সেবাদাতা হিসেবেও কাজ করতে পারবে না।
বিশ্বব্যাংকের ঋণের অর্থ থেকে প্রতিষ্ঠানটি কোনও আর্থিক সুবিধা নিতে পারবে না। ব্যাংক অর্থায়িত প্রকল্পের প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নেও অংশ নিতে পারবে না।
এর আগে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত ক্রয়প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেত। এখন সেই সুযোগ আর পাবে না।
সহযোগী প্রতিষ্ঠানেও পড়তে পারে প্রভাব
সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, নিষেধাজ্ঞা শুধু বেক্সিমকো কম্পিউটারসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকা সহযোগী কোম্পানিও এর আওতায় পড়তে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন বা আইএফসি এবং বহুপক্ষীয় বিনিয়োগ নিশ্চয়তা সংস্থার কার্যক্রমেও এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের গ্যারান্টি, কার্বন ফাইন্যান্স এবং নির্দিষ্ট ট্রাস্ট ফান্ডের প্রকল্পেও একই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে।
ফলে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বর্তমানে কোনও বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত প্রকল্পের চুক্তি রয়েছে কিনা, তা পর্যালোচনার প্রয়োজন হতে পারে।
কোনও প্রকল্পে প্রতিষ্ঠানটি সরবরাহকারী বা উপ-ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে। নতুন দরপত্রে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির যোগ্যতা যাচাই করতে হবে।
সরকারি প্রকল্পেও বাড়বে নজরদারি
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্বব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা সরাসরি বাংলাদেশের সব সরকারি দরপত্রে স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা নয়। তবে এ সিদ্ধান্তের কারণে প্রতিষ্ঠানটির সরকারি প্রকল্পে সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল অবকাঠামো, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং সেবা খাতের প্রকল্পগুলো পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে দেখতে হবে, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কোনও দেশীয় প্রকল্পের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক কি না।
বর্তমান চুক্তিতে কোনও অনিয়মের ঝুঁকি রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন হতে পারে। ভবিষ্যৎ দরপত্রে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা, স্বচ্ছতা ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাও গুরুত্ব পাবে।
১০ মাস পর কী হবে
বিশ্বব্যাংক ১০ মাসের ডিবারমেন্ট বা আইনগত ব্যবস্থা আরোপ করেছে। এটি নিষেধাজ্ঞার ন্যূনতম সময়।
কিন্তু ১০ মাস শেষ হলেই বেক্সিমকো কম্পিউটারস নিষেধাজ্ঞামুক্ত হবে না। অবমুক্তির জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে।
প্রথমত, অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত অনিয়ম মোকাবিলায় গ্রহণযোগ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, কার্যকর দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
তৃতীয়ত, সততা ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এসব ব্যবস্থা বিশ্বব্যাংকের ইন্টেগ্রিটি কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।
শর্ত পূরণ না হলে নিষেধাজ্ঞা ১০ মাসের পরও বহাল থাকতে পারে।
বিশ্বব্যাংক শাস্তি নির্ধারণের সময় দুটি দরপত্রে একই ধরনের যোগসাজশের অভিযোগকে গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ তদন্ত, কিছু প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ এবং কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বেক্সিমকো কম্পিউটারসকে এখন নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হতে শুধু সময় পার হওয়ার অপেক্ষা করলেই হবে না। অভিযোগের কারণগুলো দূর করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের কাছে কার্যকর সংস্কার ও দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রমাণও দিতে হবে।









