রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোতে তীব্র গ্যাস সংকটের কোনও সমাধান মেলেনি। মাঝে মধ্যে স্বল্প চাপে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলেও কিছুক্ষণ পর আবারও তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহন মারাত্মক সংকটে পড়েছে। পাম্পগুলোতে দীর্ঘ অপেক্ষার সারি যেমন কমার নাম নেই, তেমনি দীর্ঘ প্রহর গুনার পর যা মিলছে— স্বল্প চাপের কারণে তাও পরিমাণে অত্যন্ত নগণ্য। সব মিলিয়ে গ্যাস না পেয়ে দিনের বড় একটি অংশ পাম্পেই কেটে যাচ্ছে চালকদের, যা পরিবহন খাতে বড় ধরনের নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছে।
সবচেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন সিএনজি অটোরিকশার চালকরা। গ্যাস না পেয়ে সারাদিন গাড়ি বন্ধ রেখে পাম্পে বসে থাকলেও দিনশেষে মালিকের নির্দিষ্ট জমার টাকা ঠিকই পরিশোধ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ আয় বন্ধ থাকলেও ব্যয় থামছে না, যা তাদের ঠেলে দিচ্ছে ঋণের মুখে।
মেরুল বাড্ডায় পাম্পে তালা, রাস্তায় ট্রাফিকের কড়াকড়ি
রাজধানীর মেরুল বাড্ডার জামান সিএনজি স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ। পাম্পের উভয় পাশে চালকরা সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে চাতক পাখির মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। সেখানে ভিড় এতই বেড়ে গেছে যে রাস্তায় যানজটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ পাম্পের বাইরের মূল সড়কে কোনও সিএনজি দাঁড়াতে দিচ্ছে না।
জামান সিএনজি স্টেশনের বিক্রয়কর্মী আবু সাঈদ বলেন, “গ্যাস কখন আসবে বা চাপ স্বাভাবিক হবে তা আমরা বলতে পারবো না। যখন আসবে, তখন থেকেই পুনরায় বিতরণ শুরু করা হবে।”
একই চিত্র রাজধানীর অন্যান্য ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। গ্যাস দিতে না পেরে অনেক পাম্প তাদের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে। আবার যেখানে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে, সেখানে প্রেশার তলানিতে। যেখানে একটি প্রাইভেট কারের ৬০ লিটারের সিলিন্ডারে ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকার গ্যাস ঢোকার কথা, প্রেশার না থাকায় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার বেশি ঢুকছে না। এতে সামান্য পথ চলতেই গ্যাস শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং চালকদের দিনে বারবার ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ধরে পাম্পের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
নিকুঞ্জে কুর্মিটোলা ছাড়ালো লাইন, ক্ষোভ প্রকাশ চালকদের
রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকার সিটি ওভারসিজ স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় দুই-তিন লাইনে সিএনজি ও প্রাইভেট কারের অভূতপূর্ব দীর্ঘ সারি, যা কুর্মিটোলা হাসপাতাল ছাড়িয়ে গেছে। ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে চালকদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ চরমে পৌঁছেছে।
চালকদের অভিযোগ, এটি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর একটি অপচেষ্টা। প্রাইভেট কার চালক শরিফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ৭-৮ ঘণ্টা ধরে প্রেশারের আশায় বসে আছি। যেখানে এই গ্যাস আমদানি করতে হয় না, সেখানে দেশীয় গ্যাসের জন্য কেন আমাদের এই হাহাকার দেখতে হবে?”
‘সংসার চালানো দূরের কথা, জমার টাকাই উঠছে না’
অটোরিকশা চালক আতাউর, শামীম ও রনিসহ অন্যান্যরা দুঃখের কথা জানিয়ে বলেন, “প্রতিদিন গাড়ি গ্যারেজ থেকে বের করলেই ১২০০ টাকা মহাজনকে জমা দিতে হয়। পাম্পে বসে সারাদিন পার হয়ে গেলে কীভাবে জমা দেবো, আর কীভাবে নিজের পরিবার চালাবো? আমাদের তো উপার্জনের অন্য কোনও পথ নেই!”
তারা আরও বলেন, “দাম বাড়ানো যদি সরকারের লক্ষ্য হয়, তবে বাড়াক। কিন্তু আমাদের এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে কষ্ট দেওয়ার কোনও মানে হয় না। এই হয়রানি আমাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।”
উপায়হীন চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের দাবি, সরকার যেন অবিলম্বে এই গ্যাস সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেয় এবং পাম্পগুলোতে স্বাভাবিক প্রেশার নিশ্চিত করে।









