দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করলেও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বলেছে, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিএসটিআইয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এ বিষয়ে বিএসটিআইয়ের দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) পরিচালিত এক গবেষণায় দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনার মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএসটিআই নিজ উদ্যোগে বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্টের নমুনা সংগ্রহ করে স্বতন্ত্র পরীক্ষাগারে পরীক্ষা শুরু করেছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, পরীক্ষায় যদি কোনো টুথপেস্টে মাইক্রোবিডের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএসটিআই জানায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো প্লাস্টিক বা অন্যান্য অজৈব পদার্থের অতি ক্ষুদ্র কণা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদীয়মান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর ব্যবহার সীমিত বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে বিডিএস ১২১৬:২০১২ (Specification for Toothpaste) অনুযায়ী টুথপেস্টে ক্ষতিকর উপাদান, জীবাণু এবং বিষাক্ততার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
এর আগে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিএসটিআই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, ইএসডিওর গবেষণায় প্রকাশিত তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। গবেষণার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন, পরীক্ষাপদ্ধতি ও কাঁচা তথ্য চাওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের কাছ থেকে কাঁচামাল, পণ্যের উপাদান এবং সিনথেটিক পলিমার ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বাজার ও উৎপাদন কারখানা থেকে নতুন করে নমুনা সংগ্রহ করে দেশি অথবা বিদেশে স্বীকৃত পরীক্ষাগারে স্বাধীনভাবে পুনঃপরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সেদিনের বিজ্ঞপ্তিতে বিএসটিআই আরও জানিয়েছিল, দেশে টুথপেস্ট তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য ৮১টি উপাদানের তালিকায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো উল্লেখ নেই। ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের সুযোগ নেই বলেই সংস্থাটির ধারণা। একই সঙ্গে কণার ধরন, উৎস, পরিমাণ ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণ ছাড়া কোনো ব্র্যান্ড বা পণ্যকে অনিরাপদ বা নিম্নমানের বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সমীচীন নয় বলেও উল্লেখ করা হয়।
এদিকে গত ২৬ জুলাই প্রকাশিত ইএসডিওর গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি (ইএইচই)’ ল্যাবরেটরিতে ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। স্টিরিওমাইক্রোস্কোপি ও ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি (এফটিআইআর) প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত পরীক্ষায় ২৬টি নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়।
গবেষণায় বলা হয়, প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। পরীক্ষায় বাংলাদেশের ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে, ভারতের পাঁচটির মধ্যে একটিতে, থাইল্যান্ডের দুইটির মধ্যে একটিতে এবং ভিয়েতনামের দুইটির দুটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। শিশুদের জন্য বিক্রি হওয়া ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
তবে ইএসডিও বলেছে, গবেষণার উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা নয়। বরং টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক বিষয়ে জাতীয় মানদণ্ড, গ্রহণযোগ্য সীমা, পরীক্ষার নির্দেশিকা ও লেবেলে তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরাই ছিল গবেষণার মূল লক্ষ্য।
ভোক্তাদের উদ্দেশে বিএসটিআই পরামর্শ দিয়েছে, টুথপেস্ট কেনার সময় উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং বিএসটিআইয়ের সিএম লাইসেন্স নম্বর যাচাই করতে হবে। অজানা বা অনুমোদনহীন ব্র্যান্ডের পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত মুখের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, টুথপেস্ট না গেলা এবং গুজব বা অযথা আতঙ্কে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া আমদানিকৃত টুথপেস্টের ক্ষেত্রেও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমদানি ও বাজারজাতকরণে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে বিএসটিআই।

বাজারের ৩৪টি টুথপেস্টের ২৬টিতেই মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক
আলোচনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক: টুথপেস্ট না গেলার পরামর্শ বিএসটিআই’র
টুথপেস্টের মাইক্রোপ্লাস্টিক কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, কী করবেন






