“চেয়ারে বসে অনিশ্চয়তার মধ্যে আমরা ৩০-৪০ ঘণ্টা পার করেছি। একেবারে উদ্বাস্তুদের মতো জীবন হয়ে গেছে আমাদের। কারও পক্ষ থেকে কোনও আশ্বাস নেই। কখন দেশে ফিরব, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। আমরা উদ্বিগ্ন—এভাবে নির্ঘুম আরও কত ঘণ্টা বসে থাকতে হবে।”
এভাবেই নিজের ভোগান্তির কথা বলছিলেন কানাডা থেকে ছেড়ে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের যাত্রী সাইম রানা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সহযোগী অধ্যাপক কানাডায় একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণ শেষে দেশে ফিরছিলেন।
তিনি ইতালির রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টরন্টো-রোম-ঢাকা রুটের যে ফ্লাইট আসছিলেন সেটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গতকাল থেকে আটকে আছে। নিরাপত্তার স্বার্থে উড়োজাহাজটির প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও ত্রুটি নিরসনের কাজ চলছে। একই উড়োজাহাজে পরিচালিত ঢাকা-রোম-টরন্টো রুটের পরবর্তী ফ্লাইটটিও বিলম্বিত হবে বলে জানিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানায়, রোমে অবতরণের পর উড়োজাহাজটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি শনাক্ত হয়। প্রাথমিক পরিদর্শনের পর সেটিকে গ্রাউন্ডেড ঘোষণা করা হয় এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা শুরু হয়।
পরে রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে বিমান জানায়, ফ্লাইট বিজি-৩০৬ (টরন্টো–রোম–ঢাকা) পরিচালনাকালে রোম ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে উড়োজাহাজটিতে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। যাত্রীদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার স্বার্থে উড়োজাহাজটির প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও ত্রুটি নিরসনের কাজ চলছে। আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য হোটেলে আবাসন, খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানায় কর্তৃপক্ষ।
তবে যাত্রীদের অভিযোগ, খাবারের ব্যবস্থা করা হলেও তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়নি। জানা গেছে, ইতালির স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এসব যাত্রীকে ট্রানজিট ভিসা না দেওয়ায় বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের বিমানবন্দরের বাইরে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কানাডার পাসপোর্ট থাকায় কয়েকজন যাত্রী বিমানবন্দর থেকে বের হতে পারলেও বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যাত্রীদের বেশিরভাগই বিমানবন্দরের ভেতরে অপেক্ষা করছেন।
ফ্লাইটটিতে ছিলেন সাবেক ক্রিকেটার সৈয়দ হালিম শাহ ও তার ছেলে জাতীয় দলের ফুটবলার সৈয়দ কাজেম শাহসহ পুরো পরিবার। দীর্ঘ সময় রোম বিমানবন্দরে আটকে পড়ায় তারাও ভোগান্তিতে পড়েছেন।
রোম থেকে সৈয়দ হালিম শাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ফ্লাইটটি রোমে অবতরণের পর দীর্ঘ সময় যাত্রীদের উড়োজাহাজের ভেতরেই অপেক্ষা করতে হয়। প্রায় আট ঘণ্টা তাদের বিমানের ভেতরে থাকতে হয়েছে। একপর্যায়ে গরমও অনুভূত হয়।
তিনি বলেন, “রোমে তাপমাত্রা ছিল ৩৮ ডিগ্রি। বিমানের গেটও খোলা রাখতে হয়েছে। এসি অল্প কাজ করেছে। অনেকটাই দুর্বিষহ সময় কাটাতে হয়েছে। একপর্যায়ে কেউ কিছু ঠিকমতো জানাতে পারছিল না। পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হতে পারে, সেটাও জানানো হচ্ছিল না। সাধারণত এমন কিছু হলে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে জানানোর কথা।”
উড়োজাহাজটিকে গ্রাউন্ডেড ঘোষণা করা হলে আড়াইশর বেশি যাত্রীর সঙ্গে বিপাকে পড়েন হালিম শাহর পরিবারও। পরে তিনি বলেন, “আমাদের কানাডার নাগরিকত্ব থাকায় রোমের হোটেলে উঠতে পেরেছি। যাদের নেই, তারা এয়ারপোর্টেই আছে বলে শুনেছি। তবে পরবর্তী ফ্লাইট কখন, তা এখনও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স থেকে জানতে পারিনি। এ নিয়ে টেনশনে আছি।”
এদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, কারিগরি ত্রুটি নিরসন সাপেক্ষে ফ্লাইটটি শনিবার (৮ আগস্ট) দিবাগত রাত ৩টায় বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবে। এরপর ৯ আগস্ট বিকাল সাড়ে ৫টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে।
ফ্লাইটটি সচল করতে বিমানের প্রকৌশল বিভাগের একটি দল ইতোমধ্যে রোমের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ১৭ মিনিটে দলটির রোমে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বিমান কর্তৃপক্ষ বলছে, ভিসা জটিলতার কারণে বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের স্থানীয় ইমিগ্রেশন আইন মেনে টার্মিনালের ভেতরেই প্রয়োজনীয় খাবার, পানি ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য হোটেলে আবাসন, খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে দাবি তাদের।
শনিবার বিকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র ও মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম জানান, যান্ত্রিক ত্রুটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা হলেও যাত্রীদের নিরাপত্তাই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, “টরন্টো থেকে ঢাকাগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩০৬ ফ্লাইটটি রোম বিমানবন্দরে আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটির সম্মুখীন হয়। শতভাগ আকাশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ফ্লাইটটি জরুরি অবতরণ করানো হয়।’
বোসরা ইসলাম বলেন, “এই পরিস্থিতিতে যাত্রীদের সাময়িক কষ্ট ও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, যার জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে।”
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী, ট্রানজিট ভিসা ছাড়া কোনও বিদেশি নাগরিককে বিমানবন্দরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া স্থানীয় কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার। ইতালির কঠোর শেনজেন ভিসা নীতির কারণে বাংলাদেশি ও নেপালি পাসপোর্টধারী যাত্রীদের বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেয়নি স্থানীয় ইমিগ্রেশন পুলিশ।
বিমানের পক্ষ থেকে সব যাত্রীর জন্য হোটেলের ব্যবস্থা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি। আইনি বাধা না থাকায় কানাডিয়ান ও ইউরোপীয় পাসপোর্টধারী যাত্রীদের দ্রুত হোটেলে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়েছে।
তবে শনিবার রাতে বাংলা ট্রিবিউনকে সাইম রানা বলেন, “আমাদের দুর্ভাবনার মূল কারণ হলো, যেই বিমানে আমরা এসেছি, সেই বিমানটি এখনো বিকল অবস্থায় পড়ে আছে। এখনো পর্যন্ত ইঞ্জিনিয়ার আসেননি। তিনি আসার পর বিমানটি সারাবেন। মেরামতের কাজ সঠিকভাবে শেষ হলে তখনই আমরা অগ্রগতি দেখতে পাব।”
তিনি বলেন, “এক-দুই ঘণ্টার মধ্যে ছেড়ে যেতে পারব—এমন একটি আশ্বাস তারা দিয়েছে। কিন্তু তার আগে কোনও ধরনের অগ্রগতি সম্পর্কে তারা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না।”
খাবারের ব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্টি জানিয়ে সাইম রানা বলেন, “আমাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেটা ঠিকই আছে। কিন্তু আমরা প্রায় ৩০-৪০ ঘণ্টা ঘুমহীনভাবে কাটাচ্ছি। কোনো বিছানা নেই। বসার জায়গা বলতে শুধু বিভিন্ন জোনের চেয়ার। সবাই চেয়ারে বসে বা সেখানেই ঘুমিয়ে এতটা সময় পার করছি।”
তিনি আরও বলেন, “এটা অনেকটা উদ্বাস্তু জীবনের মতো হয়ে গেছে। বিষয়টি একপর্যায়ে হাস্যকর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বিমান কর্তৃপক্ষ, এমনকি এখানে থাকা দূতাবাস বা সরকারি প্রতিষ্ঠান—কেউই আমাদের এমন কোনো আশ্বাস দিতে পারেনি যে আমরা কখন এবং কীভাবে বাংলাদেশে ফিরতে পারব। ফলে দেশে আদৌ কবে পৌঁছাতে পারব, তা নিয়ে আমাদের উদ্বেগ এখনো কাটেনি।”

‘আটকে পড়া যাত্রীরা ঘুমিয়েছেন চেয়ারে-মেঝেতে, বিমানের কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না’






