শৈশবের অংশ হয়ে উঠছে সোশ্যাল মিডিয়া, বাড়ছে উদ্বেগ

সুস্মিতা মুন্সী
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪২ আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪২

কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগ রয়েছে, টিকটক ভিডিও বানানোর কথা বলে তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় শিশু-কিশোরদের অনলাইন যোগাযোগ এবং বাস্তব জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।

পুলিশ অপ্রতিমের সঙ্গে কয়েকজন বয়সে বড় তরুণের যোগাযোগ, একটি আইফোন, ৫ হাজার টাকার দেনা এবং টিকটক ভিডিও তৈরির কথা বলে তাকে ডেকে নেওয়ার অভিযোগসহ বেশ কয়েকটি বিষয় তদন্ত করছে। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে এখনো কোনো একক উদ্দেশ্য নিশ্চিত করতে পারেননি তদন্তকারীরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘিরে উদ্বেগ নতুন নয়

অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে ফেনীতে ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে হয়রানির ঘটনা ভিডিও ধারণ করে টিকটকে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে ২০ বছর বয়সী এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, আরও দুজন ওই শিশুকে হয়রানি করছিলেন। তাঁদের একজন ঘটনাটি ভিডিও ধারণ করে পরে টিকটকে আপলোড করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সেপ্টেম্বরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত এক তরুণের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ঢাকার এক কিশোরী কুমিল্লায় ধর্ষণের শিকার হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পুলিশ জানায়, ফেসবুক ও টিকটকের মাধ্যমে ওই তরুণের সঙ্গে তার পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে তার সঙ্গে দেখা করতে কুমিল্লায় গেলে একটি নির্জন স্থানে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব ঘটনাকে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে সংঘটিত অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করা যায় না। তবে এগুলো দেখায়, শিশু-কিশোরদের অনলাইন যোগাযোগ এখন সরাসরি তাদের বাস্তব জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা আরোপ করছে। অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া ইতিমধ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ চালু করেছে। যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশেও এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছে বা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের নির্দিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলা বা চালু রাখার ওপর বিধিনিষেধ ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর কার্যকর হয়।

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, কিক, রেডিট, স্ন্যাপচ্যাট, থ্রেডস, টিকটক, টুইচ, এক্স ও ইউটিউবসহ নির্ধারিত প্ল্যাটফর্মগুলোকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার ঠেকাতে ‘যৌক্তিক পদক্ষেপ’ নিতে বলা হয়েছে। তবে এ বিধিনিষেধ লঙ্ঘনের জন্য শিশু বা তাদের অভিভাবকদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে না। মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর।

অস্ট্রেলিয়ার অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাষ্য, এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা নয়। বরং অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের জন্য একটি বয়সসীমা নির্ধারণ করা, যাতে নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানো পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করতে পারে।

২০২৬ সালের মার্চে ইন্দোনেশিয়াও ১৬ বছরের কম বয়সীদের কয়েকটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট রাখার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। দেশটির সরকারের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত উচ্চ ঝুঁকির প্ল্যাটফর্মগুলোতে ১৬ বছরের কম বয়সীরা অ্যাকাউন্ট চালু রাখতে পারবে না।

মালয়েশিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে বয়স যাচাইয়ের নিয়ম ২০২৬ সালের ১ জুন কার্যকর হয়। দেশটির নিয়ম অনুযায়ী, ১৬ বছরের কম বয়সীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে না এবং প্ল্যাটফর্মগুলোকে বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

বাংলাদেশে শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তার বিধান

বাংলাদেশে শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে কোনো বিধান নেই, বিষয়টি এমন নয়। ২০২৬ সালের বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) আইনে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের সুরক্ষা এবং হয়রানি প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বয়সভিত্তিক যাচাইয়ের বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রক্রিয়া বিধিমালার মাধ্যমে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

তবে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য বাংলাদেশে এখনো নির্দিষ্টভাবে ১৬ বছর ন্যূনতম বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

এ কারণে প্রশ্ন উঠছে, বিদ্যমান অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ও সম্ভাব্য বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট কি না, নাকি বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নির্দিষ্ট ন্যূনতম বয়সসীমা প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এম রেজাউল ইসলাম বলেন, শুধু বয়সসীমা নির্ধারণ করলেই শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। তবে নির্দিষ্ট বয়সের নিচে শিশুদের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করলে কিছু অনলাইন ঝুঁকি থেকে তাদের সুরক্ষা দেওয়া যেতে পারে।

তিনি বলেন, একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সচেতনতা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদেরও প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও জ্ঞান দিতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে তরুণদের উদ্বেগ

বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের ২০২৫ সালের ইউ-রিপোর্ট জরিপে প্রায় ২৯ হাজার শিশু ও তরুণ অংশ নেয়। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের দুই-তৃতীয়াংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ভুয়া খবর ও ভুল তথ্যকে মানসিক চাপের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রায় প্রতি সাতজনে একজন হয়রানি ও নেতিবাচক মন্তব্যের কথা জানিয়েছে। একই হারে অংশগ্রহণকারী ক্ষতিকর বা মন খারাপ করা কনটেন্টকে বড় উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

জরিপে ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, হয়রানি ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের মতো ক্ষতিকর আচরণ ঠেকাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর নিয়ম থাকা জরুরি। ৭৯ শতাংশ মনে করেন, এসব নিয়ম শিথিল করা হলে তাঁদের সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী আরও বেশি বিপদের মুখে পড়তে পারে।

ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তার বাড়ছে

বাংলাদেশের ডিজিটাল বাস্তবতার আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভেতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৭২ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। অর্থাৎ শিশু-কিশোরদের বড় একটি অংশ ইন্টারনেট সংযুক্ত পরিবেশে বেড়ে উঠছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘আইসিটি অ্যাকসেস অ্যান্ড ইউজ বাই হাউসহোল্ডস অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়ালস সার্ভে ২০২৪-২৫’ অনুযায়ী, দেশের ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। তবে এ পরিসংখ্যানটি বিশেষভাবে শিশুদের চিত্র তুলে ধরে না। জরিপে শহরাঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ পাওয়া গেছে।

শিশু-কিশোরদের বয়সভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় ২০২৫ সালে বিএমজে ওপেন সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা থেকে। বাংলাদেশের শহর ও গ্রামের চারটি বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির ৪৫৬ শিক্ষার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয় ওই গবেষণায়। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১৩ থেকে ১৮ বছর।

গবেষণায় প্রায় ৮৮ শতাংশ শিক্ষার্থী ইন্টারনেট ব্যবহারের কথা জানিয়েছে। মেয়েদের মধ্যে এ হার ৮৬ শতাংশ এবং ছেলেদের মধ্যে ৯১ শতাংশ। ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রধান মাধ্যম মোবাইল ফোন। তবে এটি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিত্বশীল জরিপ নয়। তাই এর ফলাফল বাংলাদেশের সব শিশু-কিশোরের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা যাবে না।

আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের ৮২ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এ বয়সসীমার বাইরের মানুষের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৭২ শতাংশ।

কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ঝুঁকি বাড়ছে

বিশ্বজুড়েও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ধরন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপীয় অঞ্চলের ‘হেলথ বিহেভিয়ার ইন স্কুল-এজড চিলড্রেন’ গবেষণায় ৪৪টি দেশ ও অঞ্চলের ১১, ১৩ ও ১৫ বছর বয়সী প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কিশোরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, সমস্যাজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের হার ২০১৮ সালের ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ১১ শতাংশ হয়েছে। মেয়েদের মধ্যে এ হার ১৩ শতাংশ এবং ছেলেদের মধ্যে ৯ শতাংশ।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বুলবুল আহমেদ খান বলেন, কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের ঝুঁকি মূল্যায়ন, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশ এখনো বিকাশমান। ফলে অনলাইনে অপরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জে অংশ নেওয়া কিংবা ক্ষতিকর কনটেন্টের সংস্পর্শে আসার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তারা সব সময় প্রাপ্তবয়স্কদের মতো বুঝতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত শিশুদের অনলাইন অভিজ্ঞতায় বয়স উপযোগী সুরক্ষা ও প্রাপ্তবয়স্কদের দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। তবে শুধু বিধিনিষেধ আরোপ বা বয়সসীমা নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবারের মধ্যে খোলামেলা যোগাযোগ, ডিজিটাল সাক্ষরতা, অনলাইন ঝুঁকি চিহ্নিত করার সক্ষমতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

ফোন ব্যবহার নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ

রাজধানীর আজিমপুরের বাসিন্দা বেলায়েত হোসেন বলেন, তাঁর অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তানও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। তিনি সব সময় সন্তানকে ফোন দিতে চান না। তবে পড়াশোনা ও যোগাযোগের প্রয়োজনে ফোন ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, ‘সন্তান ফোনে কী করছে, কার সঙ্গে কথা বলছে, তা নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা হয়। শুধু ফোন কেড়ে নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাঝেমধ্যে সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলি, যাতে কোনো অপরিচিত ব্যক্তি যোগাযোগ করলে বা কোনো সমস্যায় পড়লে সে ভয় না পেয়ে আমাদের জানাতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোরও শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।’

বয়স যাচাইয়ে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা

বয়সসীমা বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন। এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. এম রেজাউল ইসলাম বলেন, বয়স যাচাইয়ের জন্য শিশুদের যদি প্রতিটি প্ল্যাটফর্মে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন বা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য জমা দিতে হয়, তাহলে নতুন করে গোপনীয়তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তাই বয়সসীমার পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ সীমিত রাখা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষা এবং স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অস্ট্রেলিয়ার ব্যবস্থাতেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। দেশটির ই-সেফটি কমিশনারের ভাষ্য, বয়স যাচাইয়ের পদ্ধতিগুলোকে গোপনীয়তা সুরক্ষার নিয়ম মেনে চলতে হবে এবং ব্যবহারকারীদের সরকারি পরিচয়পত্র ব্যবহার করতে বাধ্য করা যাবে না।

প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্ব কতটুকু

বিশ্বজুড়ে নতুন নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, শিশু বা অভিভাবকদের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপরও দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রধান দায়িত্ব প্ল্যাটফর্মগুলোর। বিধিনিষেধ লঙ্ঘনের জন্য শিশু বা তাদের অভিভাবকদের শাস্তি দেওয়া হয় না।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠছে, শিশুদের বয়স যাচাই, ক্ষতিকর কনটেন্ট ছেঁকে দেওয়া, অনলাইনে শিশুদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা প্রতিরোধ এবং তাদের অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্ব কতটা হওয়া উচিত।

ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর অধিকতর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরকারও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম আগস্টে জানিয়েছিলেন, ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং তরুণদের ডিজিটাল ঝুঁকি থেকে সুরক্ষায় সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কাজ করছে। টিকটক ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে ক্ষতিকর ও অশ্লীল কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষা দিতে এবং যথাযথ নজরদারি প্রতিষ্ঠায় আইসিটি মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কাজ করছে।’

এর আগে জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ক্ষতিকর কনটেন্ট সরানোর বিষয়ে ইউটিউব ও টিকটকের মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদারে সরকার কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে এ ধরনের কনটেন্ট অপসারণের প্রক্রিয়া উন্নত করতে সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের অর্গানাইজেশন-৩ শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা চায়না আক্তার বলেন, শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করছে। বয়স উপযোগী অনলাইন সুরক্ষা, অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ এবং বয়স যাচাইয়ের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, শুধু নির্দিষ্ট বয়সসীমা নির্ধারণ করলেই অনলাইন ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়। কার্যকর বয়স যাচাই, ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্বশীল আচরণও প্রয়োজন।

শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে আরও সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি তাদের জন্য নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

শিশুদের নিরাপত্তায় প্ল্যাটফর্মের দায়

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী সদস্য ইমতিয়াজ বিন হাফিজ বলেন, শিশুদের শুধু নির্দিষ্ট অ্যাপ ব্যবহার না করতে বললেই অনলাইন ঝুঁকি থেকে তাদের সুরক্ষা দেওয়া যাবে না। শিশুরা যেসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে, সেগুলো তাদের অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ততা থেকে বাণিজ্যিকভাবেও লাভবান হয়।

তাই শিশুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু শিশু ও তাদের পরিবারের ওপর বর্তানো উচিত নয়। প্ল্যাটফর্মগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে। শিশুদের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং শুরু থেকেই শিশু সুরক্ষাকে নকশার অংশ করতে হবে।

সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কি সমাধান?

শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সীমিত করার পক্ষে যুক্তি থাকলেও সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশু-কিশোরদের শিক্ষা, যোগাযোগ, তথ্যপ্রাপ্তি, সৃজনশীলতা ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। ইউনিসেফও বলেছে, ডিজিটাল প্রযুক্তি শিশুদের শেখা, খেলাধুলা ও যোগাযোগের সুযোগ দেয়। একই সঙ্গে ডিজিটাল জগতে নিরাপদে চলাফেরার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করাও জরুরি।

কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যোগাযোগের একটি মাধ্যম হিসেবে সামনে এসেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত কারণ এখনো তদন্তাধীন।

/আইএএম/
সম্পর্কিত
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রয়ে বাধা নিয়ে মধ্যরাতে আসিফ নজরুলের পোস্ট
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসায় অনলাইন পরিচয় যাচাই বাড়ছে, বাংলাদেশিদের যা জানা জরুরি
ক্যালিফোর্নিয়ায় শিশুদের সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারে নতুন বিধিনিষেধ
সর্বশেষ খবর
নতুন কুড়ি প্রতিযোগিতায় আবেদন শুরু ১ অক্টোবর, যেসব বিষয়ে অংশ নিতে পারবে শিশুরা
নতুন কুড়ি প্রতিযোগিতায় আবেদন শুরু ১ অক্টোবর, যেসব বিষয়ে অংশ নিতে পারবে শিশুরা
৪২ দিনের শুনানির পর সিটির বিরুদ্ধে রায়, এখন শাস্তির অপেক্ষা
৪২ দিনের শুনানির পর সিটির বিরুদ্ধে রায়, এখন শাস্তির অপেক্ষা
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রয়ে বাধা নিয়ে মধ্যরাতে আসিফ নজরুলের পোস্ট
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রয়ে বাধা নিয়ে মধ্যরাতে আসিফ নজরুলের পোস্ট
রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের ৫ নেতাকর্মী গ্রেফতার 
রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের ৫ নেতাকর্মী গ্রেফতার 
সর্বাধিক পঠিত
বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম আনতে আকাশসীমার অনুমতি কেন দিচ্ছে না, জানালো পাকিস্তান
বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম আনতে আকাশসীমার অনুমতি কেন দিচ্ছে না, জানালো পাকিস্তান
চাঁদপুর-বরিশালের ইলিশের নামে কোথাকার মাছ খাচ্ছেন জানেন?
চাঁদপুর-বরিশালের ইলিশের নামে কোথাকার মাছ খাচ্ছেন জানেন?
শহীদ আবু সাঈদের ঘর ও কবরস্থান উন্নয়নে এক কোটি টাকা দেওয়ার ঘোষণা
শহীদ আবু সাঈদের ঘর ও কবরস্থান উন্নয়নে এক কোটি টাকা দেওয়ার ঘোষণা
প্রায় দেড় কোটি রুপি জরিমানা দিয়ে দায়মুক্তি পেলো আদানি গ্রুপ
প্রায় দেড় কোটি রুপি জরিমানা দিয়ে দায়মুক্তি পেলো আদানি গ্রুপ
ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে বিএনপির দুই নেতারই মনোনয়নপত্র বৈধ
ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে বিএনপির দুই নেতারই মনোনয়নপত্র বৈধ