রাজধানীর পুরাতন ঢাকার চকবাজারের মুনসুর খান প্লাজার আগুন প্রায় ২২ ঘণ্টা পেরিয়েছে। তবে এখনও আগুন নির্বাপণ ঘোষণা করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর।
ক্ষতিগ্রস্ত ভবনসহ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে ধোয়া। আগুন লাগা ভবনের ৬ ও ৭ তলা রয়েছে প্রচণ্ড ‘হিট’ অবস্থায়। ফলে দুটি ফ্লোর থেক ভেঙে পড়ছে জানালার ভাঙা কাঁচের টুকরো।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা যায়, ভবনজুড়ে দোকান, গোডাউন ও সরু রাস্তা। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনসহ আশপাশের কয়েকটি ভবনে নেই কোনও আবাসন। যা আছে সবই দোকান ও গোডাউন। তবে চক মোগটুলী সড়কে প্রবেশমুখে রয়েছে একটি বহুতল আবাসিক ভবন। ভবনটি অগ্নিকাণ্ডস্থল থেকে বেশ খানিকটা দূরে। নিরাপত্তার স্বার্থে সড়কের দুই পাশ বন্ধ করে দিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সীমিত করা হয়েছে সাধারণ মানুষের চলাচলও।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চক মোগলটুলী সড়কে দুই পাশজুড়ে শুধু মার্কেট। এসব মার্কেটে রয়েছে নানা দোকান ও গোডাউন। আগুনের পর থেকে সবই বন্ধ।
চক মোগলটুলীর প্রায় মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে মুনসুর খাঁন মাকেট। যেটি ৭ তলা বিশিষ্ট। মার্কেটজুড়ে রয়েছে ব্যাগ, কসমেটিকস ও ছাতার দোকান এবং গোডাউন। এই মার্কেটের ৬ তলায় সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকাল ৫টার দিকে আগুন লাগে। দুপুরের দিকেও ভবনের ওপর থেকে ধোয়া বের হতে দেখা গেছে।
ঘটনাস্থলে মঙ্গলবার দুপুরেও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের কাজ করতে দেখা যায়। ভবনের নিচে অবস্থান করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় দোকান বা গোডাউনে যাচ্ছেন। মালামাল নিচে নামিয়ে আনছেন।
ভবনের নিচে আশরাফুল নামের একজন ব্যবসায়ী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ভবনের ৬ তলায় তার ব্যাগের দোকান রয়েছে। আগুনে না পুড়লেও ধোয়ায় সব কালো হয়ে গেছে। ফলে এগুলো আর বিক্রয়যোগ্য নয় বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, তার পাশের গোডাউনটি কেয়া কসমেটিকসের। দুদিন আগে প্রায় ৭ কোটি টাকার মালামাল তুলেছেন তিনি। আগুনে সব পুড়ে গেছে।
খোরশেদ নামের আরেকজন ব্যবসায়ী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ভবনের ৭ তলায় তার এসএম লেদার নামের একটি গোডাউন রয়েছে। একটি কসমেটিকসের দোকান থেকে বিকালে ভবনে আগুন লাগে। এরপর ধীর ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে অন্য গোডাউনগুলোতে। গভীর রাত সাড়ে ৪টার দিকে তার গোডাউনে আগুন লাগে। গোডাউনে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাাকার মালামাল ছিল। যার সবই শেষ।
তাদের মতো আরও অনেককে দেখা গেছে ভবনের নিচে দাড়িয় থাকতে। তাদের চোখে-মুখে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার ছাপ। ভেতরে লাখ লাখ টাকার মালামাল, অথচ তা বের করতে না পারার আক্ষেপ।
তারা বলছেন, ভবনের ৬ ও ৭ তলায় যাদের দোকান বা গোডাউন রয়েছে, তাদের অধিকাংশ মালামালই পুড়ে গেছে। তবে পঞ্চম থেকে নিচ তলা পর্যন্ত দোকান ও গোডাউন অক্ষত রয়েছে। তবে ফায়ার সার্ভিস ভেতরে ঢুকতে না দেওয়ায় মালামাল বের করতে পারছেন না তারা।
দুপুর দেড়টার দিকে কলা-রুটি কিনে এনে ব্যবসায়ীদের নিজেদের মধ্যে ভাগ করে খেতেও দেখা যায়।
ঘটনাস্থলে ফায়ার ফায়ার ফাইটাররা বলছেন, ভবনের ভেতরে আর আগুন নেই। তবে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মালামাল গোডাউনভর্তি থাকায় সেগুলো সরানো হচ্ছে এবং পানি দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে মাঝে মাঝে ধোঁয়া বের হচ্ছে। আগুন নির্বাপণের কার্যক্রম এখনও চলছে।
তারা বলেন, বিভিন্ন গোডাউন পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। মালামাল সরানো না হলে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করা সম্ভব হবে না। কারণ মালামালের নিচে থাকা তাপ ও ধোঁয়া থেকে আবার আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছেন।
সিগারেটের উচ্ছিষ্ট থেকে আগুনের সূত্রপাত
মুনসুর খাঁন মার্কেটটিতে বিড়ি বা সিগারেটের উচ্ছিষ্ট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, মার্কেটটিতে অনেক দোকান ও গোডাউন রয়েছে। কোনও একটি দোকানের কর্মী হয়তো ভবনের ওপরে বিড়ি বা সিগারেট খেয়ে উচ্ছিষ্টটুকু ফেলেছিলেন। সেখান থেকেই আগুন লেগেছে।
জামাল হোসেন নামের একজন ব্যবসায়ী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ভবনের দ্বিতীয় তলায় তার ছাতার ব্যবসা রয়েছে। আগুনে তার কোনও ক্ষতি হয়নি।
তিনি বলেন, ‘ভবনের ওপরে গোডাউন রয়েছে। হয়তো কোনও দোকানের কর্মচারী ওপরে ওউঠে বিড়ি-সিগারেট খেয়েছিলেন। তার উচ্ছিষ্ট ফেলা হলে সেখান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে তার ধারণা। আগুন বৈদ্যুতিক শটসার্কিট বা অন্য কোনও কারণে লাগেনি বলে দাবি তার।
সোমবার বিকাল ৫টা ৪ মিনিটে চকবাজারের মুনসুর খান প্লাজায় অগ্নিকাণ্ডের খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। পরে লালবাগ থেকে দুটি ইউনিট, সদর দফতর সিদ্দিকবাজার থেকে দুটি ইউনিট এবং পলাশী থেকে আরও দুটি ইউনিটসহ মোট ছয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে। এরপর যোগ দেয় আরও চারটি ইউনিট। প্রায় ১২ ঘণ্টার চেষ্টায় মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কথা জানায় ফায়ার সার্ভিস।
তবে মঙ্গলবার বেলা তিনটা পর্যন্ত আগুন নির্বাপণ বা সম্পূর্ণ নেভাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। সংস্থাটি বলছে, আগুন নেভাতে গিয়ে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান বলেন, ‘চকবাজারের মুনসুর খান প্লাজার আগুন বর্তমানে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে গুদামে থাকা মালামাল সরানো এবং আগুন পুরোপুরি নির্বাপণের কার্যক্রম চলছে। আগুনে ছয়তলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাততলায় সামান্য ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের চার সদস্য আহত হয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখেন, ছয় ও সাততলায় প্রচণ্ড ধোঁয়া ও তাপ। এর মধ্যেই ফায়ার সার্ভিসের কৌশল প্রয়োগ করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ছয়তলায় থাকা গোডাউনগুলোতে শাটার ও তালা লাগানো ছিল। প্রতিটি গোডাউনে চার-পাঁচটি তালা ছিল। ভেতরে ক্রসফায়ার গেটেও তালা লাগানো ছিল। প্রচণ্ড ধোঁয়া ও তাপের মধ্যে এসব তালা কেটে আগুন নেভানোর কাজ করতে হয়েছে। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ ছিল। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল যানজট। চকবাজারের রাস্তা অত্যন্ত সরু হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে। বিশেষ করে, তখন পিক আওয়ার থাকায় যানজট বেশি ছিল। দ্বিতীয়ত, চ্যালেঞ্জ ছিল ভবনের ভেতরে জমে থাকা ধোঁয়া বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা। ছয় ও সাততলার ধোঁয়া বের হওয়ার পথ না থাকায় প্রচণ্ড তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে ফায়ারফাইটারদের কাজ করতে হয়েছে। শাটারের তালা কেটে আগুন নেভানোর কার্যক্রম চালাতে হয়েছে।’
পানির সংকটের কথা উল্লেখ করে কাজী নজমুজ্জামান বলেন, ‘আশপাশে থাকা পানির রিজার্ভগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছিল। এ কারণে পাম্প ও রিজার্ভার পরিবর্তন করে অন্য রিজার্ভার থেকে পানি নিয়ে আগুন নেভানোর কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হয়েছে।’
কাজী নজমুজ্জামান বলেন, ‘মুনসুর খান প্লাজার ছয়তলায় ১২ থেকে ১৪টি বড় গোডাউন রয়েছে। এর মধ্যে সাত থেকে আটটি গোডাউনে আগুন লেগেছিল। এসব গোডাউনে ছাতা, কসমেটিকস, আতরের বোতল, আতরসহ বিভিন্ন ধরনের মালামাল ছিল। গোডাউনগুলো মালামালে পূর্ণ থাকায় সেগুলো সরিয়ে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করতে সময় লাগছে।’
ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কত টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষ বলতে পারবে। এটি নির্ধারণ করতে কিছুটা সময় লাগবে।’
অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে কাজী নজমুজ্জামান বলেন, ‘আগুন নির্বাপণের কার্যক্রম চলমান থাকায় এখনই এর কারণ বলা সম্ভব হচ্ছে না। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তের পর আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’
তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তারা কেউই আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। ভবনে বিদ্যুতের লাইন থাকায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে তদন্তের পরই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। মুনসুর খান প্লাজার সঙ্গে আরও তিন থেকে চারটি মার্কেট যুক্ত রয়েছে। আগুন আশপাশের ভবন ও দোকানে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। বিভিন্ন সময় আগুন বাইরে ছড়িয়ে পড়ছিল। তবে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন, যাতে আগুন অন্য ভবন ও দোকানে ছড়িয়ে না পড়ে।’
মানুষের আশঙ্কা অনুযায়ী পুরো মার্কেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মূলত ছয়তলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাততলায় সামান্য ক্ষতি হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে আশপাশের মার্কেটগুলোকে বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। আগুন নেভানোর সময় প্রচণ্ড তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে ফায়ারফাইটাররা কাজ করেছেন। একজন সদস্য ১৫ থেকে ২০ মিনিট কাজ করার পর তাকে সরিয়ে অন্য সদস্যকে পাঠানো হয়েছে। এভাবে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জনবল নিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ করা হয়েছে।’
কাজী নজমুজ্জামান বলেন, ‘আগুনের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী এটি সলিড ফায়ার। এ ধরনের আগুন নির্বাপণের উত্তম মাধ্যম হলো পানি। কোনও পেট্রোল পাম্পে বা অন্য কোনও জ্বালানিতে আগুন লাগলে ফোম ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এটি সলিড ফায়ার হওয়ায় আগুন নেভাতে পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রচণ্ড ধোঁয়া ও তাপের মধ্যে কাজ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। ফায়ার সার্ভিসের নির্ধারিত কৌশল প্রয়োগ করে কমসংখ্যক সদস্যকে আহত করে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণের চেষ্টা করা হয়েছে।’