বৈশাখ এলেই বর্ষবরণের আনন্দে মেতে ওঠে পুরো জাতি। বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখে প্রতিবছর নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। এবারও বাংলা নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে মঙ্গল শোভাযাত্রা, হালখাতা, বৈশাখী গ্রামীণ মেলা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের পানি খেলা, ফুলবিজু, পাজনের আয়োজন করা হয়।
পুরনো জীর্ণতাকে পেছনে ফেলে ব্যক্তিগত, ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক, শ্রেণিগত অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালির শত শত বছরের ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনার লালন ও বার্তা সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার মূলমন্ত্র নিয়ে বরণ করা হলো বাংলা নববর্ষকে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পহেলা বৈশাখ পালন করে সংস্কৃতির তীর্থস্থান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
শুক্রবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ১০টায় সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় শিল্পকলা একাডেমির আয়োজন। ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’–সমবেত সংগীতের পর নজরুল সংগীত পরিবেশন করেন সুজিত মোস্তফা। রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন লাইসা আহমেদ লিসা। বাউল গান করেন শরীফ সাধু ও জনপ্রিয় গায়িকা পুতুল।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির শিশু সংগীত দলের পরিবেশনায় ছিল ‘দাও ধৈয্য দাও সৌর্য’ এবং ‘সত্য বল সুপথে চল’ সমবেত সংগীত। পুঁথিপাঠে ছিলেন পরিমল মজুমদার। একক লোকসংগীতে পরিবেশন করেন সুরবালা রায় (টেপরী মাতাজী)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বৈশাখী’ আবৃত্তি করেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, এছাড়াও ছিল রুপা চক্রবর্তীর আবৃত্তি। পূজা ও পলাশ ভাওয়াইয়া এবং বিউটি ও সন্দীপন শোনান বাউল গান।
একাডেমির শিল্পী সোহানুর রহমান সোহান, রাফি তালুকদার, সরদার হীরক রাজা, রোকসানা আক্তার রুপসা, আবিদা রহমান সেতু ও সানজিদা মীম লোক সংগীতের মেডলি পরিবেশন করেন।
বাংলা বর্ষবরণকে ঘিরে পার্বত্য জেলাগুলোতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যবাহী উৎসব ‘বৈসাবি’ আনন্দমুখর পরিবেশে পালিত হয়। বর্ষবরণের এই উৎসবকে চাকমা সম্প্রদায় বিজু, মারমা সম্প্রদায় সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘বৈসুক’ নামে উদযাপন করে থাকে।
ফিফা চাকমা পরিচালিত ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায় পরিবেশন করে নৃত্য-‘বৈশাবী’। একাডেমির নৃত্যশিল্পীরা পরিবেশন করে সমবেত নৃত্য ‘সহজ মানুষ’। এছাড়াও ছিল তামান্না রহমানের পরিচালনায় নৃত্য ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’, একাডেমির রেপার্টরি যাত্রাদল পরিবেশন করে যাত্রা ‘নিঃসঙ্গ লড়াই’ এর অংশ বিশেষ।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পর শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের দেশে চলছে নানা ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার। এ সকল ষড়যন্ত্র ও অপ্রপচার প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ২০৪১ এ পৌঁছাতে যে উদ্যোগ, অগ্রযাত্রা এবং সংগ্রাম আমরা করছি তা বিধ্বস্ত করার জন্য। সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে আমাদের শিল্পীরা সকল সংকট, ষড়যন্ত্র ধূলিসাৎ করে দেবে।’
আলোচনার পর শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে চারুকলা বিভাগের ব্যবস্থাপনায় বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ৫ দিনব্যাপী আলপনা অংকন কর্মশালার সমাপনী ও সনদপত্র প্রদানের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। লিয়াকত আলী লাকী অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে সনদপত্র তুলে দেন।
শেষে বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে চারুকলা বিভাগের ব্যবস্থাপনায় দেশ বরেণ্য চারুশিল্পীদের অংশগ্রহণে বাংলাদেশের অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও আলপনা বিষয়ক আর্টক্যাম্প থেকে সৃজিত চিত্রকর্ম, আলপনা ও পটচিত্র নিয়ে ৫ দিনব্যাপী প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন একাডেমির মহাপরিচালক। জাতীয় চিত্রশালা গ্যালারিতে ১ থেকে ৫ বৈশাখ পর্যন্ত চলবে এ প্রদর্শনী।








