‘বাপের রাস্তা’: ঢাকার সড়ক বিশৃঙ্খলার এক ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি

সুস্মিতা মুন্সী
০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:০০ আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:০০

ঢাকার ব্যস্ত সড়ক। উল্টো পথে দ্রুতগতিতে ছুটে চলছে ব্যাটারিচালিত একটি অটোরিকশা। সামনে পথচারী, দুই পাশে বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি। চালক একটানা হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছে। কখনও অন্য গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগছে, কখনও পথচারীদের চলার পথ আটকে দিচ্ছে। প্রতিটি সংঘর্ষের সঙ্গে বাড়ছে ‘জাতীয় ক্ষতি’র স্কোর। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ জনতা চালককে ধাওয়া করে ধরে ফেলে, তারপর বেধরক পিটুনি। সেখানেই শেষ হয় খেলা।

এটি ঢাকার সড়কের বাস্তব কোনো দৃশ্য নয়। ‘বাপের রাস্তা’ নামের একটি অনলাইন গেমের অংশ। এতে খেলোয়াড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকের ভূমিকায় নামতে হয়। ট্রাফিক আইন ভেঙে গাড়ি চালানো, যানবাহন ও পথচারীদের ধাক্কা দেওয়া, অকারণে হর্ন বাজানো—সবই করতে হয় খেলোয়াড়কে। শেষ পর্যন্ত ক্ষুব্ধ জনতার হাতে চালকের মার খাওয়ার মধ্য দিয়ে খেলার সমাপ্তি ঘটে।

ঢাকার সড়কের চেনা বিশৃঙ্খলাকে হাস্যরসের মোড়কে তুলে ধরায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে গেমটি। ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবরের গুগল অ্যানালিটিকসের তথ্য অনুযায়ী, প্রকাশের পর শুক্র ও শনিবার—এই দুই দিনে গেমটি এক লাখের বেশি বার খেলা হয়েছে।

গেমটির জনপ্রিয়তা কেবল বিনোদনের প্রতি মানুষের আগ্রহের প্রতিফলন নয়। ঢাকার যাত্রীরা বছরের পর বছর ধরে যে হতাশা, নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের মধ্য দিয়ে চলাচল করছেন, তারই একটি ডিজিটাল প্রকাশ যেন এই খেলা।

কিন্তু গেমে উঠে আসা এই বিশৃঙ্খলার পেছনে থাকা মানুষগুলোর কথা কী? সড়কে নিয়ম ভাঙার জন্য চালকদের আচরণ কতটা দায়ী, আর কতটা দায় রয়েছে পরিবহনব্যবস্থার সংকট, কর্মসংস্থানের সুযোগ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতার? ট্রাফিক আইন ভাঙার পরিণতি হিসেবে গণপিটুনির দৃশ্য দেখানো কি এমন সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে?

এসব প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ালে ‘বাপের রাস্তা’ আর নিছক ভাইরাল গেম থাকে না। এর ভেতর দিয়ে সামনে আসে ঢাকার পরিবহনব্যবস্থা, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার, নগরজীবনের জমে থাকা ক্ষোভ এবং ডিজিটাল সংস্কৃতির নানা দিক।

গেমটির নির্মাতা সফটওয়্যার প্রকৌশলী ওমর ফারুক রিয়াদ। তিনি থাকেন মহাখালীতে, কাজ করেন মিরপুরে। প্রতিদিন যাতায়াতের পথে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে উল্টো পথে চলতে, একটানা হর্ন বাজাতে এবং অন্য যানবাহন ও পথচারীদের ঝুঁকিতে ফেলতে দেখেছেন তিনি। এসব অভিজ্ঞতাই তাঁকে গেমটি তৈরির ভাবনা দেয়।

২২ অক্টোবর নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে গেমটি প্রকাশ করেন রিয়াদ। শুরুতে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের জন্য তৈরি করা হলেও পরদিন থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

এক সাক্ষাৎকারে রিয়াদ বলেন, প্রতিদিনের বিরক্তিকর অভিজ্ঞতাগুলোকে এমন একটি খেলায় রূপ দিতে চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষ খেলতে খেলতেই হাস্যরসের মধ্য দিয়ে সমস্যাগুলো চিনতে পারবে। অটোরিকশাচালকদের প্রতি তার ব্যক্তিগত কোনো বিদ্বেষ নেই। তার চাওয়া, এসব যানবাহনের চলাচলে সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকুক এবং নিয়ম ভাঙলে জবাবদিহি নিশ্চিত হোক।

জাভাস্ক্রিপ্ট, এইচটিএমএল ও সিএসএস ব্যবহার করে গেমটি তৈরি করতে তার প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগেছে। ত্রিমাত্রিক দৃশ্য তৈরিতে তিনি ব্যবহার করেছেন থ্রি.জেএস। কোনো তৈরি গেম ইঞ্জিনের ওপর নির্ভর করেননি।

গেমটিতে ঢাকার পরিচিত নানা দৃশ্য ও স্থাপনার ছাপ রয়েছে। রিকশাচিত্র, উড়ালসড়ক, মেট্রোরেলের পিলারে আঁকা ছবি, শহীদ মিনার, শাহবাগের ফুলের দোকান এবং আনন্দ সিনেমা হলের মতো পরিচিত জায়গা উঠে এসেছে সেখানে।

এতে ‘সাউন্ড বোম্ব’ নামে একটি সুবিধাও আছে। এটি চালু করলে ‘খাইছি তোরে’ কিংবা ‘সানডে মানডে বন্ধ কইরা দিমু’র মতো সংলাপ শোনা যায়। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগে গাড়ি চার্জ দেওয়া এবং পুলিশকে ‘চা-পানি’ দিয়ে সমস্যা মিটিয়ে ফেলার মতো বিষয়ও হাস্যরসের ভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়েছে। খেলার শেষে ‘দৈনিক যানজট’ নামে একটি কাল্পনিক পত্রিকায় খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স নিয়ে শিরোনাম প্রকাশিত হয়।

অনেকের কাছে গেমটির জনপ্রিয়তা ঢাকার সড়কে প্রতিদিনের অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন। ব্যাটারিচালিত রিকশার বেপরোয়া গতি, হঠাৎ মোড় নেওয়া, উল্টো পথে চলা কিংবা অকারণে হর্ন বাজানো—এসব দৃশ্য নগরবাসীর কাছে পরিচিত। বাস, মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পথচারীদের সঙ্গে একই সীমিত সড়ক ব্যবহার করতে গিয়ে এমন আচরণ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।

প্রতিদিন ফার্মগেট থেকে মতিঝিলে যাতায়াত করেন ইমন সিকদার। তিনি বলেন, ‘কাজে যাওয়ার পথে এমন অনেক ঘটনা দেখি। কখনও হঠাৎ উল্টো দিক থেকে রিকশা চলে আসে, কখনও বাসের সামনে দিয়ে কেটে যায় আরেকটি রিকশা। গেমটি খেলতে গিয়ে অনেক চেনা দৃশ্য মনে পড়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব ঘটনা মোটেও হাসির নয়। তখন নিজের নিরাপত্তা নিয়েই দুশ্চিন্তা হয়।’

এক নারী যাত্রী বলেন, ‘গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছাতে কখনও কখনও আমাদের এসব রিকশায় উঠতে হয়। এগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে অনেকের যাতায়াতে সমস্যা হবে। কিন্তু চালকেরা যখন দ্রুতগতিতে চালান, হঠাৎ মোড় নেন কিংবা উল্টো পথে যান, তখন ভয় লাগে। চালকদের কিছু বললেও তারা অনেক সময় শোনেন না। এসব যানবাহন কোথায় চলবে, কত গতিতে চলবে এবং সেগুলোর চলাচলের উপযোগিতা কে পরীক্ষা করবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকা দরকার। চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে, নিয়ন্ত্রণ করতে হবে গতিও।’

অনেক যাত্রীর কাছে ব্যাটারিচালিত রিকশা একই সঙ্গে সুবিধাজনক বাহন এবং নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণ। স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য তাঁরা এসব যানবাহনের ওপর নির্ভর করেন, কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন চলাচলের ঝুঁকিও তাদের নিতে হয়।

ইনোভেশন কনসালটিংয়ের ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘আরবান মোবিলিটি স্টাডি: রিকশাস ইন ট্রানজিশন’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাটারিচালিত রিকশার ৪৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ চালক গুরুতর থেকে অতি গুরুতর দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। প্যাডেলচালিত রিকশার চালকদের ক্ষেত্রে এ হার ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ।

গবেষণার এই তথ্য বলছে, যাতায়াতের সুবিধার পাশাপাশি সড়কনিরাপত্তার উদ্বেগও রয়েছে। তাই সমস্যাটিকে শুধু চালকদের আচরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। যাত্রীদের চাহিদা, সড়কের অবকাঠামো এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও এর সঙ্গে জড়িত।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিস্তারের পেছনে কর্মসংস্থান ও জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তুলনামূলক কম বিনিয়োগে এসব যান চালিয়ে আয় করার সুযোগ পান অনেক মানুষ। প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্থানান্তর এবং অন্যান্য পেশায় আয় কমে যাওয়াও অনেককে এই পেশায় আসতে উৎসাহিত করেছে।

ইনোভেশন কনসালটিংয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রায় ৭৫ শতাংশ চালক আগে এই পেশায় ছিলেন না। তাঁদের প্রায় ৬০ শতাংশের অভিজ্ঞতা দুই বছরেরও কম। অর্থাৎ, নতুন চালকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

প্রায় ৮০ শতাংশ চালক ভাড়ায় রিকশা চালান। নিজেদের রিকশা রয়েছে প্রায় ২১ শতাংশের। রিকশার মালিকানা আয়ের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। নিজস্ব রিকশার চালকেরা দৈনিক গড়ে প্রায় ৯৭০ টাকা আয় করেন। অন্যদিকে, ভাড়ায় চালানো রিকশার চালকদের গড় আয় ৪১৮ টাকা। দৈনিক গড় ভাড়া দিতে হয় প্রায় ৪১৪ টাকা। আবার ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশ চালক জানিয়েছেন, এই পেশায় আসার পর তাঁদের আয় বেড়েছে।

পেশাটি আয়ের সুযোগ তৈরি করলেও রিকশার ভাড়া ও অন্যান্য খরচের কারণে অনেক চালকের হাতে শেষ পর্যন্ত খুব বেশি অর্থ থাকে না।

আজিমপুরে ভাড়ায় রিকশা চালান মো. কামরুল। তিনি বলেন, “রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামার আগেই প্রতিদিনের ভাড়া পরিশোধ করতে হয়। দিন শেষে ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মেটানোর পর যা থাকে, তা দিয়েই পরিবার চালাতে হয়। রিকশার ব্রেক কিংবা অন্য কোনো যন্ত্রাংশে সমস্যা হলে নিজেরা সব সময় মেরামতের খরচ জোগাতে পারি না। ট্রাফিক আইন মেনে চলতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।”

নিজের রিকশা চালান আক্কাস। তিনি বলেন, “এই গাড়ি চালিয়েই আমার সংসার চলে। রাস্তায় অনেক চালক নিয়ম মানেন না। কিন্তু সবাইকে একভাবে বিচার করা ঠিক নয়। নির্দিষ্ট রুট করে দিলে আমরাও নিয়ম মেনে চলতে পারব।”

চালকদের এই বক্তব্য তাঁদের কাজের পরিবেশ ও যানবাহনের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। যিনি রিকশা চালান, তিনি সব সময় সেটির মালিক নন। গাড়ির ব্রেক, ব্যাটারি, কাঠামো ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অনেক সময় মালিক কিংবা গ্যারেজের ওপর নির্ভর করে। ট্রাফিক আইন ভাঙলে চালককে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপদ যানবাহন সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার, সেটিও স্পষ্ট করতে হবে।

গবেষণাটিতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার ৩৪৮ জন চালক, ৩১২ জন যাত্রী এবং ৬৩ জন গ্যারেজ মালিকের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ঢাকার এই খাত সম্পর্কে গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিলেও একে সারা দেশের পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

‘বাপের রাস্তা’র সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্যগুলোর একটি হলো, চালককে ধাওয়া করে ধরে গণপিটুনি দেওয়ার অংশটি। ট্রাফিক আইন ভাঙার ঘটনায় জনক্ষোভকে হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরেছে গেমটি। কিন্তু আইন ভাঙার পরিণতি হিসেবে আইনি ব্যবস্থার বদলে গণপিটুনির দৃশ্য দেখানো কী বার্তা দেয়, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তাহসিনা আক্তার বলেন, সামাজিক ব্যঙ্গ দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোকে জনআলোচনায় আনতে সাহায্য করতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট পেশার মানুষকে একটি সমস্যার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরলে তাঁদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবও তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, “কেউ আইন ভাঙলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নিতে হবে। শাস্তির বিকল্প হিসেবে গণপিটুনিকে দেখানো বিপজ্জনক। এতে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়াকে স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, ট্রাফিক আইন ভাঙার দায় নির্ধারণ করতে হলে ব্যক্তির আচরণের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

তাঁর ভাষ্য, “যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের হঠাৎ করে জীবিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত হবে না। বরং তাঁদের যথাযথ নিয়মের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে।”

বাস্তবে সড়কে আইন ভাঙার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। গণপিটুনি দিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়; বরং এতে আরও সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই কোনো একটি নির্দিষ্ট ধরনের যানবাহন কিংবা তার চালকদের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু দুর্ঘটনার কারণ বুঝতে হলে ব্যক্তির আচরণের বাইরেও তাকাতে হয়। যানবাহনের অবস্থা, সড়কের নকশা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, গতিসীমা, পথচারীদের নিরাপত্তা এবং আইন প্রয়োগের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হয়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ৪ হাজার ৯১০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ২৫৭ জন নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনাপ্রতি মৃত্যুর হার ছিল ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ। ব্যাটারিচালিত রিকশা-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এ হার ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

ঢাকার সড়কে বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্যাডেলচালিত রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও পথচারী—সবাইকে চলাচল করতে হয় সীমিত জায়গার মধ্যে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দখল হয়ে থাকা ফুটপাত, অবৈধ পার্কিং, দুর্বল লেন ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের গতির পার্থক্য এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতার অভাব।

লালবাগ থানার ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘অযথা ভোগান্তি সৃষ্টি না করে আমরা যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করি। তবে ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনায় শুধু যানবাহনের সংখ্যা দেখলে হবে না, সড়কের জায়গা কীভাবে বণ্টন করা হচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে। বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা ও পথচারী—সবাই একই সীমিত জায়গা ব্যবহার করছে। নিরাপদ ফুটপাত, কার্যকর গণপরিবহন, নির্ধারিত লেন এবং স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের পরিকল্পনা ছাড়া শুধু একটি ধরনের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া যাবে না।’

ব্যাটারিচালিত রিকশার নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের মধ্যে ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর সরকার সরকারি গেজেটে ‘থ্রি-হুইলার লো-স্পিড ব্যাটারি-অপারেটেড রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ প্রকাশ করে। এসআরও নম্বর ৩৮৪-আইন/২০২৬-এর অধীনে বিধিমালাটি জারি করা হয়।

বিধিমালা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। প্রতিটি গাড়িতে কিউআর কোডযুক্ত নিবন্ধন নম্বর ও নম্বরপ্লেট থাকতে হবে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। জাতীয় পরিচয়পত্রধারী একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচটি যানবাহন নিবন্ধন করতে পারবেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত কারিগরি ও নিরাপত্তামান পূরণ করতে হবে যানবাহনগুলোকে। নিবন্ধন ও নবায়নের জন্য ফিটনেস সনদ এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের অনুমোদন লাগবে। পুরোনো যানবাহনও প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তন ও ফিটনেস পরীক্ষার পর নিবন্ধনের সুযোগ পাবে।

দুই আসনের গাড়ির এককালীন নিবন্ধন ফি ৮ হাজার টাকা। চার আসনের গাড়ির ক্ষেত্রে তা ১০ হাজার টাকা। বার্ষিক নবায়ন ফি যথাক্রমে ৪ হাজার ও ৫ হাজার টাকা। এর বাইরে ফিটনেস সনদের জন্য দিতে হবে ১ হাজার টাকা।

নিবন্ধনের মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও গাড়ির অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছে নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছর। অর্থাৎ, নিবন্ধনের মেয়াদ ও গাড়ির সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল আলাদা বিষয়।

গাড়িগুলোর সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমপূর্ণ স্থানের আশপাশে গতিসীমা ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার। গাড়ির নকশা অনুযায়ী চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই বা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে।

জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, উড়াল এক্সপ্রেসওয়ে, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) করিডর, প্রধান বাস রুট এবং কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে—এমন সড়কে এসব যান চলতে পারবে না। ফুটপাত দিয়ে চালানো, অবৈধভাবে ওভারটেক করা, অনিয়মিতভাবে লেন পরিবর্তন এবং গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোন ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হর্নের সর্বোচ্চ শব্দমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ ডেসিবেল।

বিধিমালায় চার্জিং, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা, গ্যারেজ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনার পর করণীয় বিষয়েও নির্দেশনা রয়েছে। সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত নির্ধারিত স্থান কিংবা গ্যারেজে ব্যাটারি চার্জ করতে হবে। ব্যবহৃত ব্যাটারি খোলা জায়গায়, মাটিতে, জলাশয়ে কিংবা সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে ফেলে দেওয়া যাবে না। পোড়ানোও নিষিদ্ধ। পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ করে অনুমোদিত পুনর্ব্যবহারকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

সরকারের পূর্বানুমোদন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক বিভাগ এসব যানবাহনের সংখ্যা, চলাচলের এলাকা, রুট ও রং নির্ধারণ করবে। একটি সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত গাড়ি অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চলতে পারবে না। নির্ধারিত এলাকার বাইরে চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হোসনেয়ারা ইয়াসমিন বলেন, ‘বিধিমালা প্রকাশ করা প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ। তবে শুধু নিবন্ধন করলেই সড়ক নিরাপদ হবে না। গাড়ির নকশা ও ফিটনেস পরীক্ষা, চালকদের প্রশিক্ষণ, রুট নির্ধারণ এবং নিয়ম ভাঙলে কার্যকর ব্যবস্থা—সবকিছু একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে যারা জীবিকার জন্য এই পেশার ওপর নির্ভরশীল, তাদের পরিবর্তনের জন্য বাস্তবসম্মত সুযোগ দিতে হবে। এসব বিষয়ে যত দ্রুত সম্ভব কাজ করার চেষ্টা করছি।’

২ নভেম্বর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে এসব যানবাহনের নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যাত্রী, চালক ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ঢাকার ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ঘিরে থাকা পরস্পরবিরোধী বাস্তবতাগুলো সামনে আসে। যাত্রীদের কাছে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের সুবিধা, চালকদের কাছে জীবিকার অবলম্বন। একই সঙ্গে অনিরাপদ চালনা, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও যানবাহনের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।

সরকারের নতুন বিধিমালায় নিবন্ধন, ফিটনেস পরীক্ষা, গতিসীমা, নির্ধারিত রুট ও চার্জিং ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এসব নিয়ম কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। কোন এলাকায় কতগুলো রিকশা চলবে, চালকদের প্রশিক্ষণ ও নজরদারির দায়িত্ব কীভাবে ভাগ হবে—এসব বিষয়ও এর প্রভাব নির্ধারণ করবে।

‘বাপের রাস্তা’ সড়কে নিয়ম ভাঙা নিয়ে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভকে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে ঢাকার ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর নির্ভরশীলতা এবং এই খাতের মানুষের জীবিকার বাস্তবতাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
আজ সারা দেশে আকাশ আংশিক মেঘলা থাকতে পারে, তাপমাত্রা কমার পূর্বাভাস
সকালে আবার আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে হলে ফিরলেন হোম ইকোনমিকসের শিক্ষার্থীরা
মধ্যরাতে সড়কে হোম ইকোনমিকসের ছাত্রীরা
সর্বশেষ খবর
লোকচক্ষুর আড়াল থেকে পর্যটকদের নজরে লাল কাঁকড়ার নির্জন সৈকত
লোকচক্ষুর আড়াল থেকে পর্যটকদের নজরে লাল কাঁকড়ার নির্জন সৈকত
স্বাদবদলে পেঁয়াজ-রসুন ছাড়াই বানিয়ে ফেলুন নিরামিষ ফুলকপির ভাপা
স্বাদবদলে পেঁয়াজ-রসুন ছাড়াই বানিয়ে ফেলুন নিরামিষ ফুলকপির ভাপা
স্পোর্টিং থেকে আল নাসর, যেভাবে কিংবদন্তি হয়ে উঠলেন রোনালদো
স্পোর্টিং থেকে আল নাসর, যেভাবে কিংবদন্তি হয়ে উঠলেন রোনালদো
প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি সহকর্মী, একসঙ্গে কয়টি সিনেমা করেছেন মৌসুমী-শাবনূর
প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি সহকর্মী, একসঙ্গে কয়টি সিনেমা করেছেন মৌসুমী-শাবনূর
সর্বাধিক পঠিত
ভারতীয় ভিসা আবেদনে নতুন নির্দেশনা
ভারতীয় ভিসা আবেদনে নতুন নির্দেশনা
‘ভিআইপি’ সেবায় সন্ত্রাসীর আস্তানায় গিয়ে ৭৪ জমির দলিল রেজিস্ট্রি করলেন সাব-রেজিস্ট্রার
‘ভিআইপি’ সেবায় সন্ত্রাসীর আস্তানায় গিয়ে ৭৪ জমির দলিল রেজিস্ট্রি করলেন সাব-রেজিস্ট্রার
আত্মসমর্পণ করতে আদালতে পরীমণি, ঘিরে রেখেছেন নিরাপত্তারক্ষীরা
আত্মসমর্পণ করতে আদালতে পরীমণি, ঘিরে রেখেছেন নিরাপত্তারক্ষীরা
১০ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া সিমে তিন দিনে ২ কোটি লেনদেন, যুবক গ্রেফতার
১০ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া সিমে তিন দিনে ২ কোটি লেনদেন, যুবক গ্রেফতার
শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিচ্ছেন গাজীপুরের গার্মেন্টস শ্রমিকরা
শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিচ্ছেন গাজীপুরের গার্মেন্টস শ্রমিকরা