অবাধ, সুষ্ঠু ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনেকটাই ‘ব্যর্থ’ নির্বাচন কমিশন (ইসি) শেষ সময়ে এসে তৎপর হয়ে উঠেছে। ছয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের শেষ দুই ধাপকে সহিংসতামুক্ত রাখতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ইসি। কমিশন মনে করছে, সামনের দুই ধাপে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে পারলে ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও রক্ষা হবে। তবে, বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমানে পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পূর্ণটাই কমিশনের হাত ছাড়া হয়ে গেছে। এখন চাইলেও তাদের পক্ষে সহিংসতামুক্ত ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগ কম।
দেশের নির্বাচন উপযোগী ৪ হাজার ২৭৫টি ইউনিয়ন পরিষদে ছয়টি পৃথক ধাপে নির্বাচনের উদ্যোগ নেয় ইসি। গত ১১ ফেব্রুয়ারি প্রথম ধাপের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরু করে কমিশন। ইতোমধ্যে ৪টি ধাপে ২ হাজার ৬৬৯টি ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া আগামী ২৮ মে পঞ্চম ধাপে ৭২৯টি এবং ৪ জুন ষষ্ঠ ধাপে আরও ৭২৪টি ইউপিতে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
ইউপি নির্বাচনের শুরুতে কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে বহুমুখী পদক্ষেপ নিলেও নির্বাচনের সময় তা খুব একটা কার্যকর হয়নি। বরং ধাপ যত বেড়েছে নির্বাচনে সহিংসতা হানাহানি ততই বেড়েছে। ধাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতের হার, বেড়েছে সংসদের বাইরে থাকা দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রার্থীহীনতার সংখ্যা। এই দুই ঘটনার পেছনে নানা ধরনের হুমকি ধামকি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। প্রথম ৫ ধাপের তথ্যমতে, আওয়ামী লীগের ১৯৭ জন বিনাভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে, ৪৮৫টি ইউপিতে বিএনপির কোনও প্রার্থী নেই। ৬ষ্ঠ ধাপ যুক্ত হলে এই সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে। এদিকে, নির্বাচনের ধাপ বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে প্রাণহানি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও। নির্বাচনি সহিংসতায় গত সাড়ে তিন মাসে একশ’র মতো প্রাণ ঝরেছে বলে জানা গেছে। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গেল চার ধাপের খারাপ অভিজ্ঞতায় কমিশন সামনের দুই ধাপের নির্বাচন নির্বিঘ্ন করতে পদক্ষেপ নেয়। এর অংশ হিসেবে চতুর্থ ধাপের ভোটের দুই দিনের মাথায় গত ৯ মে চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আগামী দুই ধাপে এটা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জরুরি চিঠি দেয় ইসি। ওই চিঠিতে শেষ দুই ধাপের নির্বাচনে ঘটা সহিংসতার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
নির্বাচনের পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ওই চিঠিতে বলা হয়, ছয় ধাপে ইউপি নির্বাচনের ইতোমধ্যে চার ধাপে ভোটগ্রহণ হয়েছে। বাকি দুই ধাপের ভোট আগামী ২৮ মে ও ৪ জুন অনুষ্ঠিত হবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং মাঠপর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে দিন দিন নির্বাচনি সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ঘটনাও ঘটছে।
চিঠিতে যেকোনও সহিংসতা কঠোর হাতে দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের দ্রুত গ্রেফতার এবং নির্বাচনি এলাকায় পুলিশি টহল বৃদ্ধিসহ তাদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকির মাধ্যমে নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির করার কথা বলা হয়।
এছাড়া মাঠ পর্যায়েও ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাসহ নির্বাচনি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পৃথক চিঠি দিয়েছে কমিশন। চিঠিতে নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়।
এদিকে, সামনের দুই ধাপের নির্বাচন সহিংসতামুক্ত অনুষ্ঠানে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দিক নির্দেশনা দিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ ও নির্বাচন কমিশন সচিব বর্তমানে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল সফরে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার তারা বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। শনিবার রাঙ্গামাটির ডিসি, এসপিসহ নির্বাচনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে সচিব সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সিইসি এই প্রথম ঢাকার বাইরে সফরে গেলেন বলে কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সিইসি সাংবাদিকদের বলেন, ইতোমধ্যে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য শুনে আশাবাদী যে, আগের চেয়েও সামনের নির্বাচন আরও ভালো ও সুষ্ঠুভাবে করতে পারব। আগামী দুই ধাপের নির্বাচনের আগের রাতে কিংবা নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্র দখলের ঘটনা যেন না ঘটতে পারে, সে ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে। যদিও আগের নির্বাচনে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু ভবিষ্যতে যেন আর না ঘটে, সেদিকে আমরা সচেষ্ট।
সুষ্ঠু নির্বাচনে ইসির নতুন তৎপরতা প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নির্বাচন কমিশন প্রথমেই তো তাদের অবস্থান দুর্বল করে ফেলেছে। তাদের কার্যক্রমে মনে হয়নি যে, তারা সত্যিকার অর্থে ভালো নির্বাচন করতে চায়। কাজেই এখন শেষ সময় এসে চাইলেও কতটা সফল হবে সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ তাদের কথা তো কেউই শোনে না। তবে, সত্যিই যদি শেষ সময়ে এসে সক্রিয় হয় তাহলে ব্যর্থ হলেও জনগণকে অন্তত বলতে পারবে তাদের আন্তরিকতা ছিল।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, পরিস্থিতি যেখানটায় গিয়ে পৌঁছছে, তার থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ খুবই ক্ষীণ। নির্বাচনের যে ট্রেন্ড ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে, তাতে কমিশনের কোনও পদক্ষেপ কাজে আসবে বলে মনে হয় না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিব সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা শুরু থেকেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। তারপরও আগের ধাপগুলোতে সেখানে কিছু বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম আমাদের নজরে এসেছে। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা সামনের দুই ধাপে আরও ভালো করতে চাই।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের সব তৎপরতার লক্ষ্যই সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করেছি। তাদের চিঠি দিয়েও ব্যবস্থা নিতে বলেছি। সিইসি বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে বৈঠক করেছেন। শনিবার রঙ্গামাটিতেও বৈঠক করবেন। আমরা চাই শেষ দুই ধাপে আরও ভালো নির্বাচন যেন উপহার দিতে পারি।
আরও পড়তে পারেন: আমার অবস্থাও সাত খুনের মতো হতে পারে: শ্যামল কান্তি ভক্ত
আরও পড়তে পারেন: উপকূলে ধেয়ে আসছে জলোচ্ছ্বাস, ৭ নম্বর বিপদ সংকেত
/এমএনএইচ/







