গাইবান্ধা-১-আসনের সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম লিটন হত্যাকাণ্ডের মোটিভ পরিষ্কার হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ইতোমধ্যে ধরা পড়েছেন চার খুনি। খুনের পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতা সাবেক এমপি কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খাঁনও গ্রেফতার হয়ে এখন জেল-হাজতে। পরিকল্পনাকারী ও খুনিরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। এরপরও চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার চার্জশিট দিতে কিছুটা সময় নিচ্ছে পুলিশ। কারণ, কাদের খাঁন ও চার খুনির জবানবন্দিতে কিছুটা গরমিল থাকায় সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কাদের খাঁন কাউকে রক্ষার জন্য তথ্য গোপন করছেন কিনা, তাও খতিয়ে দেখছেন তদন্তে সংশ্লিষ্টরা।
এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী একই আসনের সাবেক এমপি আবদুল কাদের খাঁনের অবৈধ অস্ত্রের উৎস ও তথ্য লুকানোর বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ হত্যাকাণ্ডের মোটিভ পরিষ্কার। পরিকল্পনাকারী ও খুনিরাও ধরা পড়েছেন। তবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত তিনটি অস্ত্রের একটি এখনও উদ্ধার করা যায়নি। সেটা উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এছাড়া কাদের খানের অবৈধ অস্ত্র সম্পর্কেও খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। সেসব বিষয়ে আরও সুস্পষ্ট তথ্য নিয়েই তারা চার্জশিট দিতে চান তারা। এজন্য কিছুটা সময় নেওয়া হচ্ছে। তবে শিগগিরই এ মামলার চার্জশিট তারা দিয়ে দেবেন বলেও জানান এসপি খালেদ।
তদন্তে সংশ্লিষ্টরা জানান, এমপি লিটনকে গুলি করে হত্যার সময় তিনটি অস্ত্র ব্যবহার করে চার কিলার। দীর্ঘ এক বছর সময় প্রস্তুতি নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় এমপি লিটনের হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করান কাদের খাঁন। হত্যার মিশন সফল করতে কাদের খাঁনের লাইসেন্স করা একটি অস্ত্র ছাড়াও আরও দু’টি অস্ত্র ব্যবহার করে খুনিরা। যেগুলো ছিল অবৈধ। এ দু’টি অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি তারা। কাদের খাঁন এসব অস্ত্র কোত্থকে সংগ্রহ করেছেন, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
গাইবান্ধা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কাদের খাঁনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী শটি অবৈধ অস্ত্র তার বাড়ির উঠানের মাটির নিচ থেকে থেকে উদ্ধার করা হয়। অন্য অস্ত্রটিও একইস্থানে ছিল বলে তার দাবি। কিন্তু পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে বাকি অস্ত্রটির কোনও খোঁজ পায়নি। সেটিও পুলিশকে বিভ্রান্ত করার জন্য কাদের খাঁন মিথ্যা তথ্য দিয়ে কোনও আস্থাভাজন কিংবা আপনজনকে রক্ষার চেষ্টা করছেন কিনা, সেই ব্যাপারেও তদন্ত অব্যাহত রেখেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। কারণ, খুনিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও আর কাদের খাঁনের জবানবন্দির মধ্যে বেশ কিছু গরমিল রয়েছে। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে এমপি লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিষয়ে জবানবন্দি দিলেও খুনিদের অস্ত্রের প্রশিক্ষণ ও অবৈধ অস্ত্রের বিষয়টি এড়িয়ে যান কাদের খাঁন।
গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্কেল) মো. রবিউল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লিটন হত্যার পরিকল্পনাকারী কাদের খাঁন কোথায়, কিভাবে অস্ত্র পেয়েছে তা স্বীকার করেননি। রিমান্ড ও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতেও তিনি অনেকগুলো বিষয় এড়িয়ে গেছেন। এখন সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া বাকি অস্ত্রটি কার কাছে আছে এবং তার অস্ত্র ভাণ্ডারে আর কোনও অস্ত্র রয়েছে কিনা, সেগুলো কার কার হেফাজতে রয়েছে, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
গত ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নে শাহবাজ (মাস্টাপাড়া) এলাকায় নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটন। এ ঘটনায় লিটনের বোন ফাহমিদা বুলবুল কাকলী বাদী হয়ে অজ্ঞাত ৪-৫ জনকে আসামি করে সুন্দরগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
প্রথমে একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় কয়েকজনকে ধরার পর এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডের ক্লু বের হতে থাকে। গ্রেফতারকৃতদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ ২১ ফেব্রুয়ারি বগুড়া থেকে কাদের খাঁনকে গ্রেফতার করে। পরে ১০ দিনের রিমান্ডে থাকা অবস্থার চতুর্থ দিনে শনিবার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে লিটন হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দেন।
আরও পড়ুন: কাদের খাঁনের অবৈধ অস্ত্র-ভাণ্ডারের সন্ধানে পুলিশ
/এমএনএইচ/








