অভিজিৎ হত্যার ঘটনাস্থলেই ছিল সেই জিয়া

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ২২:৫০, নভেম্বর ০৬, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৩, নভেম্বর ০৭, ২০১৭

 

অভিজিৎ ও জিয়াউল হকলেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিল আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সামরিক কমান্ডার মেজর (বহিষ্কৃত) সৈয়দ জিয়াউল হক। তাকে সংগঠনের সবাই ‘বড় ভাই’ হিসেবে সম্বোধন করে থাকে। জিয়া নিজেই অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের পুরো বিষয়টি তদারক করে। তার সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ড অংশ নেয় আরও নয় জন। যাদের মধ্যে চার জনের দায়িত্ব ছিল সরাসরি অভিজিৎকে কুপিয়ে হত্যা করা। আর বাকি চার জনের দায়িত্ব ছিল অভিজিৎকে অনুসরণ করা, যাদের সংগঠনে ‘ইন্টেল গ্রুপ’ বলে অভিহিত করা হয়। সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়াদের বলা হয় ‘আশকারি’ সদস্য। বহিষ্কৃত মেজর জিয়ার সঙ্গে ঘটনাস্থলে থেকে তদারক করে সংগঠনের মধ্যম সারির আরেক নেতা শরিফুল ইসলাম ওরফে মুকুল রানা। সে গত বছর ঢাকার খিলগাঁওয়ে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রবিবার রাতে মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোড থেকে আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে সাহাদ (৩৪) নামে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের এক সদস্যকে গ্রেফতার করে ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। সোমবার তাকে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আহসান হাবীবের আদালতে পাঠানো হলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সে এসব তথ্য জানায়।সিটিটিসির উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানান।

অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত জানানোর পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের সময় তাদের কার কী দায়িত্ব ছিল এবং তারা কোথায় অবস্থান করেছিল, সে বিষয়ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছে সাজিদ। এমনকি মেজর জিয়াও যে ঘটনাস্থলেই অবস্থান করে সবকিছু তদারক করেছে, তাও জানিয়েছে সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ।

সিটিটিসির উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জিয়া অন দ্য স্পটে ছিল। সে নিজেই হত্যাকাণ্ডের পুরো বিষয়টি তদারক করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সে এসব তথ্য বলেছে।’ সিটিটিসির এই উপ-কমিশনার বলেন, ‘২০১৪ সালে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে যোগ দেওয়া সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে সাহাদের সঙ্গে জিয়ার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। প্রথমে একটি ট্রেইনিং সেন্টারে তাদের দেখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আস্তানায় তারা একসঙ্গে অবস্থানও করে। অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের আগে অন্তত চার দিন সে জিয়ার নির্দেশে ও ইন্টেল সদস্য হিসেবে বইমেলায় গিয়ে অভিজিৎকে অনুসরণ করে।’

সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, লালমনিরহাটের আদিতমারির বাসিন্দা সোহেল ওরফে সাজিদ রাজধানীর তিতুমীর কলেজ থেকে বিবিএ পাস করেছে। এরপর সে নিজে ব্যবসা-বাণিজ্য করার চেষ্টা করে। পরবর্তী সময়ে আইটির ওপর কিছু ট্রেইনিং কোর্স করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১৪ সালে সাজিদ মিরপুরে কোরআন শিখতে যেতো। সেখানে রেজাউল নামে এক যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই রেজাউলের মাধ্যমেই সে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে যোগ দেয়। একপর্যায়ে সে কথিত হিজরতের নামে বাড়ি ছেড়ে সংগঠনের বিভিন্ন মার্কাজে (আস্তানা) অবস্থান করে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম তাদের আস্তানাগুলোকে মার্কাজ হিসেবে অভিহিত করে থাকে।

সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, সোহেল ওরফে সাজিদের আইটি বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা থাকায় সংগঠনের আইটি ও ইন্টেল শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ইন্টেল শাখার সদস্য হিসিবে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের আগে তার ব্লগ অনুসরণ করা ও ছবি সংগ্রহ করে শীর্ষ নেতা বিশেষ করে বহিষ্কৃত মেজর জিয়ার কাছে রিপোর্ট করে।

হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় ১০ জন

গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সোহেল ওরফে সাজিদ জানিয়েছে, তাদের সেই ‘বড় ভাই’ মেজর জিয়াসহ মোট দশ জন তারা অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে চার জনের দায়িত্ব ছিল অভিজিতের ওপর সরাসরি আক্রমণ করার। তারা বইমেলার বাইরেই অবস্থান করছিল। সে নিজে তিন সহযোগী নিয়ে বইমেলার ভেতরে গিয়ে অভিজিৎকে অনুসরণ করে। আর টিএসসির আশেপাশেই অবস্থান করে ‘বড় ভাই’ মেজর জিয়া ও শরীফুল ইসলাম ওরফে মুকুল রানা। বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর আসকারি (হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া সদস্য) দলের সদস্যরা টিএসসির একটু উত্তর দিকে ফুটপাতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে হত্যা করে।

সোহেল ওরফে সাজিদের ভাষ্য, হত্যাকাণ্ডের সময় তারা পাশেই অবস্থান করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আসছে কিনা, তা খেয়াল রাখছিল। কয়েক মিনিটের অপারেশন শেষে তারা সবাই ঘটনাস্থল থেকে সটকে পরে। পরবর্তী সময়ে জিয়ার নির্দেশে তারা বিভিন্ন মার্কাজে গিয়ে আত্মগোপন করে ছিল। গত বছরের এপ্রিলে পুরান ঢাকায় নাজিমুদ্দিন সামাদকে হত্যার পর সাংগঠনিকভাবে তাদের চুপচাপ থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ কারণে গত দেড় বছরে তারা আর কোনও হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়নি।

আরও দুই হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল সে

সিটিটিসির কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার হওয়া সোহেল ওরফে সাজিদ জানিয়েছে, ‘বড় ভাই’ মেজর জিয়ার নির্দেশে সে আরও দু’টি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল। এর একটি হলো শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে খুন হওয়া জাগৃতি প্রকাশীনর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপন ও আরেকটি হলো ব্লগার নীলাদ্রি নিলয় হত্যাকাণ্ড। এই দুটি হত্যাকাণ্ডেও সোহেল ওরফে সাজিদের দায়িত্ব ছিল ইন্টেল সদস্য হিসেবে তাদের বিস্তারিত খোঁজ-খবর করা। পরবর্তী সময়ে হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলেই উপস্থিত থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অনুসরণ করা।

সিটিটিসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, অভিজিৎ হত্যা মামলায় সোহেল ওরফে সাজিদকে আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাকে প্রকাশক দীপন ও নীলাদ্রী নিলয় হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ