ধর্ষক ওঁৎ পেতে ছিল ফুটপাতে

Send
আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ০৩:৫৩, জানুয়ারি ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৩, জানুয়ারি ০৭, ২০২০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস থেকে নামার পরই ফুটপাতে ধর্ষণের শিকার হন এক শিক্ষার্থী। ফুটপাত ধরে হাঁটা শিক্ষার্থী কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে টেনে হিঁচড়ে ঝোঁপের আড়ালে নিয়ে যায় ধর্ষক। চিৎকার চেঁচামেচি এবং ধস্তাধস্তি করেও ওই শিক্ষার্থী নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। সোমবার (৬ জানুয়ারি) বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে এই তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ভিকটিমের বর্ণনা থেকে জানা গেছে ধর্ষক ফুটপাতে ওঁৎ পেতে ছিল।

সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় কুর্মিটোলা বাস স্ট্যান্ডে নেমে ফুটপাত ধরে হাঁটছিল ঢাবি শিক্ষার্থী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সামনে থেকে বিআরটিসির ক্ষণিকা বাসটি রবিবার (৫ জানুয়ারি) বিকাল ৫টা ৪০ মিনিটে গাজীপুরের উদ্দেশে শিক্ষার্থীদের নিয়ে রওয়ানা হয়। বাসটি পথে মহাখালী, বনানীসহ বিভিন্ন বাস স্ট্যান্ডে শিক্ষার্থীদের নামিয়ে দেয়। কুর্মিটোলা বাস স্ট্যান্ডে সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিট থেকে ৭টার মধ্যে আসে। সেখানে চার-পাঁচ জন শিক্ষার্থী নামেন। এদের মধ্যে ওই শিক্ষার্থীও (ভিকটিম) ছিলেন। ক্ষণিকা বাসটির চালক জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যেখানে নামবেন, তারা নিজেরাই বলে থকেন। কুর্মিটোলা আসার পর সেখানে শিক্ষার্থীরা গাড়িতে থাপড়িয়ে নামার ইঙ্গিত দিলে, আমি বাস স্ট্যান্ডে ব্রেক করি। সেখানে ৪-৫ জন শিক্ষার্থী নেমেছেন বলে আমি পরে শুনছি। তবে নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। কারণ, পেছনের দিকে ওইভাবে আমি খেয়াল করিনি। শিক্ষার্থীদের নামা শেষ হওয়ার পর আমি ফের গাড়িটি চালিয়ে গাজীপুরের দিকে রওয়ানা দেই।’

পেছন থেকে আক্রমণ

শেওড়া বাস স্ট্যান্ড আসার আগেই কুর্মিটোলায় নেমে পড়েন শিক্ষার্থী। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পাশের ফুটপাত ধরে শেওড়ার দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের প্রধান ফটক থেকে একশ’ গজ সামনে এগোনোর পরই হঠাৎ তাকে পেছন থেকে মুখ চেপে ধরে দুর্বৃত্ত, টেনে হিঁচড়ে ঝোঁপের ভেতরে নিয়ে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় শিক্ষার্থী কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুর্বৃত্তের থাবা। শিক্ষক ও পুলিশের কাছে ঘটনার নৃশংসতার প্রাথমিক বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। নিজেকে রক্ষা করতে শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। তিনি এক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তিন ঘণ্টা পর তার জ্ঞান ফিরলে ঘটনাস্থল থেকে বান্ধবীর বাসায় যান। কীভাবে তিনি বান্ধবীর বাসায় পৌঁছালেন, সে বিষয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, ধর্ষণের কোনও একসময় মেয়েটি জ্ঞান হারান। এরপর যখন তার জ্ঞান ফেরে তখনও তিনি ঘটনাস্থলে ধর্ষককে দেখতে পান। ধর্ষক পেছন ফিরে ভিকটিমের ব্যাগ থেকে কিছু বের করার চেষ্টা করছিল। এই সুযোগে শিক্ষার্থী ওই স্থান থেকে ফিরে আসেন।

সহপাঠীদের মুখে ঘটনার নৃশংসতা

পেছন থেকে আকস্মিক শিক্ষার্থীর মুখ চেপে ধরে তাকে ঝোঁপের মধ্যে নিয়ে যায় ওই ব্যক্তি। গায়ে ছোটখাটো শিক্ষার্থী কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে মারধর করে দুর্বৃত্ত। এরপর তাকে তিন দফায় নির্যাতন করা হয় বলে জানিয়েছেন আরেক শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীর ব্যাগে থাকা কাপড় পরিবর্তন করায় ধর্ষক। ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘‘ওকে ধরে মারধর করা হয়। এসময় ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল।  ঘণ্টাতিনেক পর তার জ্ঞান ফেরে। এরপর সে সুযোগ পেয়ে সবকিছু রেখে পালিয়ে আসে। প্রথমে পায়ে হেঁটে ফুটওভার ব্রিজ পার হয়। এরপর রিকশা নিয়ে সে বান্ধবীর বাসায় যায়। সেখানে যাওয়ার পর বিষয়টি সিনিয়র এক শিক্ষার্থীকে জানায়। তিনি তার শারীরিক অবস্থা জানতে চান। এসময় মোটামুটি স্থতিশীল ছিল নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থী। কিছুক্ষণ পর তার শ্বাসকষ্ট হয়। তখন সিনিয়র এক শিক্ষার্থী বাসা থেকে শেওড়ার দিকে রওয়ানা হন। তিনি বাংলামোটরে যাওয়ার পর ফোনে শুনতে পান শিক্ষার্থীর প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তখন সিনিয়র আপু তাকে দ্রুত উবারে করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসতে বলেন। এরপর সহপাঠীরা উবার ডেকে হাসপাতালে রওয়ানা হয়ে আসেন। ইতোমধ্যে সিনিয়র আপা ডিএমপির বিমানবন্দর থানায় ফোন করে পুলিশকে খবর দেন। তখন বিষয়টি পুলিশ জানতে পারে। শাহবাগ ও বিমানবন্দর থানা পুলিশ হাসপাতালে আসে।’’

শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন ও পার্স পাওয়া যাচ্ছে না

শিক্ষার্থীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও পার্স পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশের ধারণা, এগুলো ধর্ষক নিয়ে গেছে। তাকে গ্রেফতারে ইতোমধ্যে পুলিশ ও র‌্যাব সর্বোচ্চ শক্তি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে তদন্ত করছে।

ক্ষণিকা বাস চালককে জিজ্ঞাসাবাদ

ওই শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলে থাকলেও গ্রুপ স্টাডি করার জন্য ক্ষণিকা বাসে করে শেওড়া যাচ্ছিলেন। বাসটির চালক জাহাঙ্গীর আলমকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। সকাল ১০টার দিকে শাহবাগ থানায় বাসচালক জাহাঙ্গীরকে ডেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রাব্বানীর সামনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এসময় আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

হতভম্ব  মা-বাবা

ঘটনার পর ভিকটিম শিক্ষার্থীর মা-বাবাকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করে বিষয়টি জানায়। এরপর বাবা ছুটে আসেন। তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করছে বিশ্ববিদ্যালয়। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব বাবা মা। মেয়ের এই অবস্থায় তারাও ভেঙে পড়েছেন।

ঢাবি শিক্ষকদের চাপা ক্ষোভ, ফুঁসছেন শিক্ষার্থীরা

এই ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।  শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনায় সর্বোচ্চ বিচারের দাবি জানিয়েছেন ঢাবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ধর্ষণের শিকার শিক্ষার্থীর সঙ্গে রাতে হাসপাতালে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাদেকা হালিম। তিনি এই ঘটনার বিচার দাবি করেছেন।

১৫ ধরনের আলামত সংগ্রহ

ঘটনাস্থল থেকে ১৫ ধরনের আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এর ক্রাইম সিন ইউনিট। আলামতের মধ্যে রয়েছে, শিক্ষার্থীর ইনহেলার, ওষুধ, একজোড়া পায়ের স্যান্ডেল, দুটি চাবির রিং, একটি ফাইল, হাতঘড়ি, বই, কাগজপপত্র, জিন্সের প্যান্ট ও পরিধেয় পোশাক ইত্যাদি। সিআইডির পরিদর্শক সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল থেকে ১৫ ধরনের আলামত সংগ্রহ করে থানা পুলিশকে হস্তান্তর করেছি। এসব আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা করলেই ঘটনা সম্পর্কে জানা যাবে। তার আগে কোনও মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’

কুর্মিটোলা হাসপাতাল থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত অনিরাপদ ফুটপাত

কুর্মিটোলা হাসপাতালের প্রধান ফটক থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কের পাশে সৌন্দর্য্য বর্ধনকারী বিভিন্ন ফুল ও গাছের কারণে ঝোপঝাড় হয়ে আছে। রাতে এই এলাকায় ভাসমান ছিন্নমূল মানুষের আড্ডা বসে। অসামাজিক কার্যক্রমের বিভিন্ন আলামত দেখা গেছে ঝোপের ভেতরে। এই এলাকায় প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। এই এলাকাটি রাতে বেলা হিজড়া ও ভাসমান নারী পুরুষের দখলে চলে যায়।

পরিবারের বক্তব্য

ধর্ষণের শিকার ঢাবি শিক্ষার্থীর শরীরে বেশকিছু জখম রয়েছে। তবে তিনি এখন মানসিকভাবে ভীষণ ট্রমাটাইজড বলে উল্লেখ করেছেন তার মামা। সোমবার (৬ জানুয়ারি) দুপুরে বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানান তিনি। রবিবার রাতে হাসপাতালে দীর্ঘসময় ভাগ্নির পাশে থাকলেও তাকে দেখেননি উল্লেখ করে বলেন, ‘এ ভার বহন করা কঠিন। সে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে আছে। তার শারীরিক অবস্থা সহনীয় থাকলেও এখনও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রাব্বানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একটি ঘটনা ঘটেছে। আমরা হয়তো এই ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারবো না। কিন্তু, এই অমানুষদের বিচার হোক সেটা আমরা চাই। এই বিচারের মুখোমুখি করতে যা প্রয়োজন, আমরা তা করবো। পুলিশকে আমরা সহযোগিতা করছি। সবার উচিত পুলিশকে সহযোগিতা করা। আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও কথা বলছি।’

পুলিশের বক্তব্য

ঘটনার পর পুলিশ নড়েচড়ে বসেছে। একযোগে তদন্ত শুরু করেছে থানা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ ও র‌্যাব। ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) সুদীপ চক্রবর্তী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  ‘আমরা ভিকটিমের সঙ্গে কথা বলেছি। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলা তদন্ত করা হচ্ছে। আমরা প্রযুক্তির সহায়তার পাশাপাশি সোর্স নিয়োগ করেও তদন্ত শুরু করেছি।’
আরও পড়ুন:

কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ

সে আমাদের মেয়ে, তার মনোবল শক্ত থাকবে: ঢাবি ভিসি

ধর্ষণের বিচার দাবিতে ছাত্রলীগের বিক্ষোভ

শাহবাগে সড়ক অবরোধ করে ধর্ষণের বিচার দাবি

ঢাবি শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনায় মামলা

 

/এনআই/এপিএইচ/

লাইভ

টপ