করোনার আকাল: যারা আগে কখনও পথে নামেনি

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৬:১৯, মে ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৬, মে ২৯, ২০২০

সাহয্যের জন প্রাইভেটের পেছন পেছন শিশুরারাস্তার মোড়টা ঘুরতে গাড়ি একটু স্লো হয়েছে। কোথা থেকে সাত আটজন একই বয়সের শিশু এসে গাড়ির আশেপাশে হাত পাতলো। গাড়ির গ্লাস না নামানোর সতর্কতায় আরেকটু দুরে গিয়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায়ও রক্ষা নাই। পিছে পিছে এসে আবারও গ্লাস ঘেষে হাত পেতে দাড়ালো ওরা। ওদের চোখ মুখ বলছে তারা পথশিশু না। তাদের টাকা চাওয়ার ধরণ বলছে তারা চাইতে শিখেছে নতুন। হাত দেখিয়ে গাড়ি দূরে দাড় করিয়ে কথা হয় এই শিশুদের সঙ্গে। প্রায় সবার বাবা মা কাজ করতো, এখন বেকার। যা চেয়ে পাওয়া যায় তাই দিয়ে বাজার হয়। বড় নোট একজনের হাতে দিলে ভাগাভাগি করে নিবে এই নীতিতে তারা বিশ্বাসী। তবে ছোট নোট হলে একাই নিবে। সহদোরও আছে অনেক এই জটলাতে।

রাজধানীতে একটু সাহায্যের জন্য বের হয়েছেন দু'জনবিজয় স্মরণী ধরে সারি বেধে জটলা করে আছে বয়স্ক পুরুষ। করোনা কালের শুরু থেকে পথের ত্রাণ সংগ্রহের নারীদের উপস্থিতি বেশি দেখা গেলেও ঈদ পরবর্তী সময়ে বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষের সংখ্যা বেড়েছে। এক জায়গায় কিছুটা দুরত্বে বসে কথা বলছিলেন দুইজন। একজনের মাস্ক পড়া আরেকজনের নেই। কেন এই ভরদুপুরে রাস্তায় বসে আছেন প্রশ্নে বলেন, ছেলের ঘাড়ে বসে খাই। এখন ছেলের কাজ নাই। এসময়ও ঘাড়ে বসে খাওয়া যায় না। শরীরে বল নাই তাই বসে আছি। যদি কেউ কিছু দেয়। এতোদিন ছেলে ছেলের বউ সারাদিন রাস্তায় চেয়ে রাতে ফিরতো। এখন একদিন বাদে বাদে আমিও বের হই। বয়স্কদের দেখে একটু যদি মায়া বেশি হয়। পাশে বসা অপেক্ষাকৃত কম বয়সের আরেক পুরুষ বলেন, ‘এখন মায়া করলে মায়া, নাইলে নাই। মানুষতো সত্যি শুরু থেকেই অনেক দিতেসে। আমি শুরুতে হাত পাতবো কীভাবে তাই ভাবতাম। কিন্তু উপায়তো নাই। চাচার শরীরে বল নাই কিন্তু আমার শরীরে বল থেকে কী লাভ? কাজ তো নাই।’

রাজধানীর রোকেয়া স্মরণী, বিজয় স্মরণী, মিরপুর রোড, হাইকোর্ট মাজার ঘুরে দেখা যায়, সাধারণ ছুটি শেষ হতে চললেও রাস্তায় হাত পেতে থাকা মানুষের সংখ্যা কমেনি। বরং আগে একটু দুরে দুরে থাকলেও এখন একসাথে কোন নিয়ম না মেনে রাস্তায় নামছেন সাহায্যের আশায়।

একটি প্রাইভেট কারকে সাহায্যের জন্য ঘিরে ধরেছে শিশুরাতবে শুরু থেকে পর্যবেক্ষণ বলে, রাস্তায় সাহায্য চেয়ে অপেক্ষমান নারীদের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। কেন নারীদের সংখ্যা কম জানতে চাইলে সাহায্যের জন্য অপেক্ষমান নারী পুরুষের একধরনের বিতর্কই শুরু হয়ে যায়। শুরু থেকেই পথে সাহায্য চেয়ে নেমেছেন রমেনা বেগম। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘হ্যারা কীভাবে নামবে? ব্যাটা লোকতো হাত পাতে না। তারপর তিনি বলেন, শুরুতে বাসার মাইয়াদের রাস্তায় নামাইসে। তারা মনে করসে করোনা যাইবোগা। তারা ত্রাণের লাইনে খাড়াইসে আর রাস্তার সাহায্য আমরা যোগাড় করসি। এখন যখন দেখা যায়, কিছু ঠিক হয় না, কাজে কমে নিবে তার কোন ঠিক নাই, এখন তারা রাস্তার কামে নামছে।’

সাহায্যের জন্য রাস্তা নেমেছেন কয়েকজনশিশু অধিকার বিশ্লেষক আবদুল্লাহ আল মামুনের মতে, এই সময়ে যেসব শিশুদের পথে ভিক্ষাবৃত্তিতে দেখা যাচ্ছে তাদের অনেকেই পথশিশু বা নিয়মিতভাবে ভিক্ষা করত না। মূলত নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর অনেক শিশু লকডাউনে বাবা-মায়ের রোজগার কমে আসাতে এখন কিছু রোজগারের আশায় পথে নেমেছে। পাশাপাশি ঈদ ও রোজার সময় যাকাত ও দানের অর্থ সরবরাহ বেশি থাকায় অনেকে তা দ্বারাও আকৃষ্ট হয়েছে। এই শিশুদের অনেকেই আগে থেকেই স্কুলে ভর্তি আছে, যা এখন বন্ধ আছে। কিন্তু সামনের দিনগুলোতে এই শিশুরা যেন ঝরে গিয়ে শ্রমে বা ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়মিতভাবে নিয়োজিত না হয় সেজন্য এখন থেকেই স্কুলগুলোকে বিশেষ ব্যবস্থার পরিকল্পনা করতে হবে। স্কুল খোলার পরপরই অনুপস্থিত শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবক ও শিশুদের বুঝিয়ে তাদের স্কুলে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনের তার জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে বাড়তি জনবল নিয়োগ করতে হবে। তা নাহলে সামনের দিনগুলোতে স্কুল থেকে ঝরে পড়া ও শিশুশ্রমে শিশুর আগমণ বাড়তে পারে। পাশাপাশি, আগামী বাজেটে এই শিশুদের কথা মাথায় রেখে স্কুলকেন্দ্রিক এই শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ভাতা বা আর্থিক প্রনোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

ছবি: নাসিরুল ইসলাম।

 

/ইউআই/এফএএন/

লাইভ

টপ