যেভাবে লকডাউন হবে ওয়ারী

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ২৩:২৫, জুলাই ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১৫, জুলাই ১৫, ২০২০

রেড জোন হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ওয়ারী এলাকাকে লকডাউন করা হচ্ছে। শনিবার (৪ জুলাই) ভোর সাড়ে ৬টার পর লকডাউন কার্যকর করা হবে। কীভাবে লকডাউন এলাকা ব্যবস্থাপনা করা হবে সেই বিষয়ে এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, এই জন্য ২০টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওয়ারী এলাকাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করে লকাডাউন কার্যকর করার জন্য গত ৩০ জুন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ডিএসসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ১ জুলাই এই নিয়ে সভা করেন ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। ওই দিন ৪ জুলাই (শনিবার) সকাল ৬টা থেকে ওয়ারী এলাকায় লকডাউন কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়। স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) এর ওপর ভিত্তি করেই এই লকডাউন বাস্তবায়ন করা হবে। সভাসূত্র বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছে।

রেড জোন চিহ্নিত ও ম্যাপ

ওয়ারীর আউটার রোড-টিপু সুলতান রোড, যোগীনগর রোড ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক (জয়কালী মন্দির থেকে বলধা গার্ডেন) এবং ইনার রোডগুলোর মধ্যে-লারমিনি স্ট্রিট, হেয়ার স্ট্রিট, ওয়্যার স্ট্রিট, র‌্যাংকিং স্ট্রিট ও নবাব স্ট্রিট লকডাউনের আওতায় থাকবে।

রোড জোন বাস্তবায়ন
৪ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত ২১ দিন ওয়ারী এলাকায় লকডাউন থাকবে।

বাস্তবায়ন কমিটি ও কট্রোল রুম স্থাপন
এসওপি অনুযায়ী নগর ভবনে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি ও ওয়ার্ড পযায়ে ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা কমিটি কাজ করবে। প্রধান কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টা কট্রোল রুম চালু থাকবে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের টেলিফোন নাম্বার হচ্ছে ৯৫৫৬০১৪। একই ভাবে ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা কমিটির নিয়ন্ত্রণ কক্ষের টেলিফোন নাম্বার ও স্থানীয় কাউন্সিলর মনোনিত স্বেচ্ছাসেবীদের নাম ও টেলিফোন লকডাউন এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে লিফলেট আকারে বিতরণ করতে হবে।

ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা কমিটি
বলধা গার্ডেনে ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা কমিটির নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হবে। সেখান থেকে সমন্বয়ের কাজ করা হবে।

লকডাউন এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ
লকডাউন এলাকার চারদিকের রাস্তাগুলো কার্যকরীভাবে বন্ধ রাখতে হবে। কেবল মাত্র দুটি রাস্তা নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য খোলা থাকবে। প্রথমটি টিপু সুলতান রোড ও দ্বিতীয়টি সুমি’স কেক এর সামনের রাস্তা।

প্রচারণা
স্থানীয় বাসিন্দাদের অবগতির জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য এবং অনুসরণীয় বার্তা প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করতে হবে। এছাড়া এলাকায় মাইকিং ও দৃশ্যমান স্থানে ব্যানার লাগিয়ে দিতে হবে।

হোম কোয়ারেন্টিন
লকডাউন এলাকায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের হোক কোয়ারেন্টিন নিশ্চিতসহ সব বাসিন্দাদের ঘরের বাইরে না আসার বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কঠোর ভূমিকা পালন করবে। আইন অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টা নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ টহলের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া উপযুক্ত এলাকায় সশ্রস্ত্র বাহিনীর টহলও অব্যাহত থাকবে। সরকারি নির্দেশনা অমান্যকারীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।

নমুনা সংগ্রহ
রেড জোন এলাকায় র‌্যাংকিং স্ট্রিটে অবস্থিত ওয়ারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নমুনা সংগ্রহের বুথ স্থাপন করা হবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই বুথ খোলা থাকবে। বুথে সরকার নির্ধারিত ইউজার ফি প্রদানের মাধ্যমে উপসর্গযুক্ত ব্যক্তিদের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে ফলাফল জানানো হবে।

আইসোলেশন সেন্টার
লকডাউন এলাকার করোনা রোগীদের জন্য ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতালে আইসোলেশন সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। প্রয়োজনে মুগদা ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো যাবে।

টেলিমেডিসিন সার্ভিস
কোভিড ও নন কোভিড রোগীরা যাতে টেলিফোনের মাধ্যমে চিকিৎসা পারামর্শ নিতে পারেন সেই জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরকে রেড জোনের জন্য একটি ডক্টরস পুল প্রস্তুত করতে হবে। টেলিমেডিসিন সার্ভিস পেতে স্বাস্থ্য বাতায়ন, স্বাস্থ্য অধিদফতর ১৬২৬৩, আইইডিসিআর ১০৬৫৫, ০১৯৪৪৩৩৩২২২, ওভাই সলিউশন লিমিটেড- ১৬৬৩৩ নম্বরে যোগাযোগ করা যেতে পারে। রেড জোন এলাকায় স্বাস্থ্য অধিদফতর রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য ডেডিকেটেড ডাক্তার নিয়োগ করতে হবে। নিয়োজিত ডাক্তার নিয়মিত রোগীদের খোঁজ খবর নিবেন এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যগত পরামর্শ দেবেন।

রোগী পরিবহন
করোনা রোগীর পরিবহণের জন্য ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতাল একটি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখবে। সাধারণ রোগীদের চিকিৎসার জন্য সিভিল সার্জন চালকসহ একটি অ্যাম্বুলেন্স ওয়ার্ড নিয়ন্ত্রণ কক্ষে প্রস্তুত রাখবে। এছাড়াও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৯৯৯ নম্বরে কল করে এ্যাম্বুলেন্স সুবিধা নেওয়া যাবে।

মৃতদেহ দাফন
লকডাউন এলাকায় (কোভিড বা নন কোভিড) ব্যক্তির মৃতদের সৎকার ‘আল-মারকাজুল ইসলাম, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম বা মৃতদেহ সৎকার কাজে নিয়োজিত বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী সৎকার করা হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আর্থিক বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, রেস্তোরাঁ, শপিং মল ব্যবস্থাপনা
লকডাউন এলাকায় ওষুধের দোকান ছাড়া সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, দোকান, রেস্তোরাঁ, শপিং মল ইত্যাদি বন্ধ থাকবে। ওষুধের দোকানগুলো কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধসহ অন্যান্য ওষুধপত্র যথেষ্ট পরিমাণে মজুদ রাখতে হবে।

জনসাধারণ, গণপরিবহন ও যান চলাচল
রেড জোন এলাকায় সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। শুধুমাত্র জরুরি পরিষেবায় নিয়োজিত ব্যক্তি ও তাদের বহনকারী যানবাহন চলবে। মানুষের অবাধ যাতয়াত ও বিচরণ বন্ধ রাখতে হবে। এই জন্য সড়ক, গলি ও গলির মুখ কার্যকরীভাবে বন্ধ রাখতে হবে এবং সার্বক্ষণিক পুলিশ টহল নিশ্চিত করতে হবে।

মসজিদ ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রার্থনা
সীমিত পরিসরে সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ জন পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে মসজিদ ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে যেতে পারবেন।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ
জনগণের বাড়িতে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য, ওষুধপত্র নির্বিঘ্নে সরবরাহের জন্য ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক হোম ডেলিভারি সার্ভিস চালু রাখা হবে। উল্লেখ্য, বাসায় চিকিৎসারত রোগীদের চাহিদার প্রেক্ষিতে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এই বিষয়ে ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা কমিটিকে সার্বিক সহযোগিতা করতে হবে।

বস্তিবাসী-কর্মহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি খাদ্য ব্যবস্থাপনা
বস্তিবাসী ও কর্মহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হবে। এই বিষয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, সমাজ সেবা অধিদফতর এনজিও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হবে।

স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ
ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা কমিটি স্থানীয় উদ্যমী, পরিশ্রমী ছাত্র, এনজিওকর্মী, স্কাউট, যুব সংগঠন, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি হতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ করবেন। নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবক দল স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিফটিং ডিউটির মাধ্যমে কাজ করবে।

বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা
রেড জোনে উৎপাদিত গৃহস্থালির বর্জ্য প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রতিদিন সংগ্রহ করা হবে। তবে কোভিড-১৯ রোগীর ব্যবহৃত মাস্ক, গ্লাভস, পিপিই ইত্যাদি সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য বিশেষ ধরনের ব্যাগ ডিএসসিসি কর্তৃক সরবরাহ করা হবে। মাস্ক, গ্লাভস ও পিপিই ব্যবহৃত সামগ্রী ব্যবহারকারী কর্তৃক কেটে দিতে হবে। সপ্তাহে দুই দিন এই ব্যাগসমূহ সংগ্রহ করা হবে। এই ধরনের বর্জ্য চিকিৎসা বর্জ্যের মতো যথাযথ পদ্ধতিতে ডিসপোজাল করতে হবে। গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গে মাস্ক, গ্লাভস, পিপিই বা কোনও চিকিৎসা সরঞ্জামের মিশ্রণ করা যাবে না।

বিবিধ
কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি ও ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা কমিটি তাৎক্ষণিক কোনও সমস্যা মোকাবিলার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে জনস্বার্থে যে কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করতে পারবে।

এই বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. এমদাদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ওয়ারীতে লকডাউন বাস্তবায়নের জন্য ১ জুলাইয়ের সভায় বিস্তারিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লকডাউন বাস্তবায়িত হবে।

ছবি: নাসিরুল ইসলাম

আরও পড়ুন:

শনিবার সকাল থেকে ২১ দিনের লকডাউনে যাচ্ছে ওয়ারী

রাজাবাজারের অভিজ্ঞতা প্রয়োগ হবে ওয়ারীতে



/এনএস/

লাইভ

টপ