নতুনভাবে ১৯ খাতে কর ধরেছে ডিএসসিসি

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ১৯:০০, জুলাই ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৫৫, জুলাই ১১, ২০২০

ডিএসসিসি

২০২০-২১ অর্থবছরে ১৯টি খাতে নতুনভাবে কর ধার্য করতে যাচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সিটি করপোরেশন আইনে এগুলোতে ৯৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে।

তবে বিগত সময়ে এসব খাত থেকে রাজস্ব আয় ধরা হয়নি। এবার নতুন অর্থবছর থেকে কর ধার্য করতে যাচ্ছে ডিএসসিসি। তবে এভাবে কর নির্ধারণকে তুঘলকি কাণ্ড মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মন্তব্য, ‘উন্নত বিশ্বে এসব হতে পারে। তাছাড়া আমাদের সিটি করপোরেশনের এখনও সেই অর্থে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা হয়নি। সরকার ও জনগণের মতামত নিয়ে ভালোভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

ডিএসসিসি’র দ্বিতীয় পরিষদের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম বাজেট প্রস্তুত করেছেন ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে গত অর্থবছরের চেয়ে ৬৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ বাড়িয়ে ৬ হাজার ১১৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন করেছেন তিনি; যা গত অর্থবছরের চেয়ে ২ হাজার ৪৮৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা বেশি। তবে বাজেটের প্রায় ৭৬ শতাংশই সরকারি ও বৈদেশিক উৎস থেকে ধরা হয়েছে।

গত ৭ জুলাই ডিএসসিসি’র দ্বিতীয় মেয়াদের দ্বিতীয় বোর্ড সভায় নতুন বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে এটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। গত অর্থবছরে বাজেট ছিল ৩ হাজার ৬৩১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৫২৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা।

যেসব খাতকে নতুনভাবে করের আওতায় আনা হচ্ছে

নতুন অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের জন্য ১৯টি খাতকে করের আওতায় আনা হচ্ছে। এগুলো থেকে রাজস্ব আসবে ৯৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

১. রিকশা লাইসেন্স ফি: ২৪ কোটি টাকা

২. ইমারত নির্মাণ ও পুনঃনির্মাণের জন্য আবেদনের ওপর কর: ৫ কোটি টাকা

৩. নগরীতে ভোগ, ব্যবহার বা বিক্রয়ের জন্য পণ্য আমদানির ওপর কর: ১ কোটি টাকা

৪. নগর থেকে পণ্য রফতানির ওপর কর: ১ কোটি টাকা

৫. টোল জাতীয় কর: ১২ কোটি টাকা

৬. পেশা বা বৃত্তির ওপর কর: ১ কোটি টাকা

৭. বিবাহ, তালাক, দত্তক গ্রহণ ও যিয়াফত বা ভোজের ওপর কর: ৬০ লাখ টাকা

৮. পশুর ওপর কর: ৬ লাখ টাকা

৯. জনসেবামূলক কার্যসম্পাদনের ওপর কর: ১০ লাখ টাকা

১০. সরকার কর্তৃক আরোপিত করের ওপর কর: ১২ লাখ টাকা

১১. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ট্রেনিং সেন্টার প্রভৃতির ওপর কর: ১ কোটি টাকা

১২. মেলা, কৃষি প্রদর্শনী, শিল্প প্রদর্শনী, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও অন্যান্য জনসমাবেশের ওপর কর: ২০ লাখ টাকা

১৩. বাজারের ওপর ফি (ইজারা): ১ কোটি টাকা

১৪. টিউটোরিয়াল স্কুল, কোচিং সেন্টার ইত্যাদি নিবন্ধিকরণ ফি: ৫ কোটি টাকা

১৫. প্রাইভেট হাসপাতাল, প্যারামেডিক্যাল ইনস্টিটিউট, ক্লিনিক, ডায়াগনোস্টিক সেন্টার ইত্যাদির নিবন্ধিকরণ ফি: ১০ কোটি টাকা

১৬. করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত হোটেলে অবস্থানকারীর ওপর নগর কর: ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা

১৭. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাজে নিযুক্ত প্রাইমারি কালেকশন সার্ভিস প্রোভাইডার (পিসিএসপি) নিবন্ধন ও বাৎসরিক ফি: ৯ কোটি টাকা

১৮. ইউটিলিটি সার্ভিস প্রদানে রাস্তা ব্যবহারের ফি: ১২ কোটি টাকা

১৯. অন্যান্য (ব্যাংক সুদ, মেট্রো রেল, পদ্মা সেতু): ১২ কোটি টাকা

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতামত

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমদ বাংলা ট্রিবিউনেক বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, এটা একটা তুঘলকি কাণ্ড। কারণ এই বাজেট নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলে প্রণয়ন করা হয়নি। এখানে যেসব খাত নতুনভাবে ধরা হয়েছে তাতে দেখা গেছে, এসবের জন্য কিন্তু সিটি করপোরেশনকে ইতোমধ্যে কর দেওয়া হচ্ছে। যেমন– করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত হোটেলে অবস্থানকারীর ওপর কর আরোপ করা হয়েছে। হোটেল মালিক তো ট্রেড লাইসেন্স বাবদ ট্যাক্স দিচ্ছেন। বাসাবাড়ির বর্জ্য সাব-কন্ট্রাকে দেওয়া হয়েছে। এজন্য করও ধরা হয়েছে। এখানে বাড়ি মালিকরা তো হোল্ডিং করের সঙ্গে ময়লার করও দিচ্ছেন। এক সেবার জন্য তো দুই বার কর ধরা যায় না।’

বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে নগর ব্যবস্থাপনা হয়ে থাকে। তারা অনেকভাবে অনেক সেবা দেন। তবে ঢাকার মেয়রদের তেমন কোনও সেবা নেই। তাদের টাকার পরিমাণও কম। এসব তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডিএসসিসি যেসব উদ্যোগ নিয়েছে সেগুলো উন্নত ও ধনী দেশের জন্য। সেসব দেশে এমন মডেল আছে। সেখানকার নাগরিকরা সিটি করপোরেশন থেকে পূর্ণাঙ্গ সেবা পেয়ে থাকে।’

অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের মন্তব্য, ‘দক্ষিণ সিটিতে যে পরিমাণ জিডিপি অর্জন হয় তা পায় কেন্দ্রীয় সরকার। তারা সিটি করপোরেশনকে টাকা দেয়। তাই ডিএসসিসির আয় নেই। কেন্দ্রীয় সরকার যেহেতু টাকা দিচ্ছে না, তাই এখন জনগণের ওপর কর বসিয়ে দিচ্ছে এই সংস্থা। আয় না থাকায় তারা এখন সব জায়গায় টাকা খুঁজছেন।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক মনে করেন, ‘এটি বড় একটি পলিসি প্রয়োগের বিষয়। আমাদের দেখতে হবে দেশের মানুষের এরকম কর দেওয়ার সক্ষমতা আছে কিনা। এখনই এসব সিদ্ধান্তকে পুনঃমূল্যায়ন করে দেখতে হবে। সিটি করপোরেশন চাইলে আরও বিভিন্নভাবে রাজস্ব আয় করতে পারে। জনগণের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে দিলে তারা সেসব বিষয়ের দিকে নজর দিতে পারে।’

যা বলছে ডিএসসিসি

ডিএসসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. এমদাদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা আইন অনুযায়ী স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য আমরা এরই মধ্যে কয়েকটি খাতকে নতুনভাবে যুক্ত করেছি। এগুলো থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার মতো রাজস্ব আসবে।’

 

 

/জেএইচ/

লাইভ

টপ