স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে ‘আহ্লাদি প্রতিষ্ঠান’ ছিল জেকেজি

Send
আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ০২:০৬, জুলাই ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:০৬, জুলাই ১৪, ২০২০

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে আহ্লাদি প্রতিষ্ঠান ছিল জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ার (জেকেজি)। এই প্রতিষ্ঠানটি করোনাভাইরাসের নমুনা টেস্টের অনুমোদন যেমন অলৌকিকভাবে পেয়েছে, ঠিক তেমনই জেকেজি’র সব দাবি-দাওয়াও বেশ গুরুত্ব দিয়েই পূরণ করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। অথচ কোভিড ডেডিকেডেট সরকারি হাসপাতালগুলো শুরুর দিকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী পায়নি সুরক্ষা সামগ্রী। সেই সংকটকালীন সময়ে এ নিয়ে সরকারি চিকিৎসকদের মধ্যে কেউ কেউ কথা বলে বদলি ও বরখাস্তের শিকার হয়েছেন। এসবই হয়েছে মূলত স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের নির্দেশে।
জানা গেছে, ওভাল গ্রুপের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরমধ্যে বুটিক হাউজ, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ার (জেকেজি) বেশি আলোচনায় এসেছে। এই গ্রুপের প্রধান আরিফুল হক চৌধুরী। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ করার মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে তার। এ কাজের মাধ্যমেই স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সম্পৃক্ততা। এভাবেই জেকেজির বিষয়ে কোনও যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাদের করোনাভাইরাস টেস্টের নমুনা সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়।

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে ভালো করায় নমুনা সংগ্রহের কাজ পায় জেকেজি!

বিতর্কিত জেকেজির করোনা পরীক্ষার কাজ পাওয়া নিয়ে যখন স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনাসহ তোলপাড় চলছে, তখন ১১ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। জেকেজি কীভাবে কাজ পেয়েছে সে বিষয়ে অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (সমন্বয়) ডা. জাহাঙ্গীর কবির স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘জেকেজির প্রধান সমন্বয়ক আরিফুল চৌধুরী ওভাল গ্রুপ লিমিটেড নামে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট গ্রুপেরও স্বত্বাধিকারী। ওভাল গ্রুপ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত স্বাস্থ্যসেবা সপ্তাহ ২০১৮-এর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পালন করে। তারা চিকিৎসা পেশাজীবীদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনেরও একাধিক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পালন করে। কোভিড সংকট শুরু হওয়ার পর এই আরিফুল চৌধুরী স্বাস্থ্য অধিদফতরে আসেন। জানান, তিনি জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ার (জেকেজি) নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের প্রধান সমন্বয়ক। জেকেজি গ্রুপ দক্ষিণ কোরিয়ার মডেলে বাংলাদেশে কিছু বুথ স্থাপন করতে চায়। এসব বুথের মাধ্যমে পিসিআর পরীক্ষা করার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পিসিআর ল্যাবরেটরিগুলোকে সরবরাহ করা হবে। এ জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর বা সরকারকে কোনও অর্থ দিতে হবে না। ধারণাটি ভালো এবং কোভিড পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ বাড়ানো প্রয়োজন—এই বিবেচনা থেকে ওভাল গ্রুপের সঙ্গে কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় জেকেজি গ্রুপকে অনুমতি দেওয়া যায় বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদফতরের মনে হয়।’

‘কোভিড স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের মূল লক্ষ্য ও সদিচ্ছা নিয়ে জেকেজিকে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি প্রতারণা করতে পারে, এমন ধারণা অধিদফতরের আদৌ ছিল না।’

তবে অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ এবং নমুনা সংগ্রহের কাজ আরিফ তার চিকিৎসক স্ত্রী সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর প্রচেষ্টায় পেয়েছেন।

জেকেজি: স্বাস্থ্য অধিদফতরের আহ্লাদি প্রতিষ্ঠান!

করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনুমতি পাওয়ার পর জেকেজি  বেপরোয়া হয়ে ওঠে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে তাদের চাহিদা বাড়তে থাকে। এমনকি এই চাহিদা পূরণ না হলে আরিফ চৌধুরী কর্মকর্তাদের বিভিন্ন  হুমকিও দিতেন। গত মার্চ ও এপ্রিলের দিকে যখন সরকারি সুরক্ষা সামগ্রীর সাময়িক সংকট ছিল, তখন চাহিদাপত্র দিয়েও অনেক কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষা সামগ্রী পায়নি। তবে জেকেজি এ সময় শত শত সুরক্ষা সামগ্রী নিয়েছে। গত ৩১ মার্চ রংপুর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ  ডা. একেএম নুরুন্নবী একটি চিঠিতে পিসিআর ল্যাবে কর্মরতদের জন্য সুরক্ষা সামগ্রী চান। এই মেডিক্যাল কলেজটিকে তখন মাত্র ১০০ পিস মাস্ক ও ১০০ পিস পিপিই দেওয়া হয়। গত ১২ এপ্রিল মুগদা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. শাহ গোলাম নবী স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে ১০০টি মাস্ক ও ২০০টি গগলস চেয়ে চিঠি পাঠান। এই প্রতিষ্ঠানকে মাত্র ২৫টি মাস্ক ও ২৫টি গগলস দেওয়া হয় স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে। অপরদিকে, একই দিনে জেকেজি হেলথ কেয়ারের  প্রধান নির্বাহী আরিফুল চৌধুরী ১২০০ পিপিই, ১২০০ গগলস, ১২০০ জুতার কাভার, ৩ হাজার সার্জিক্যাল মাস্ক ও ৩ হাজার সার্জিক্যাল গ্লাভস চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরে চিঠি লেখেন। তার সব চাহিদাই অনুমোদন দেওয়া হয়। তারা তাদের চাহিদা অনুযায়ী সব সুরক্ষা সামগ্রী পায়। উল্লিখিত তিনটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সুরক্ষা সামগ্রীর অনুমোদন দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ। বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানে জেকেজি হেলথ কেয়ার স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রতারণার করোনা টেস্ট: নার্সকে টাকার ভাগ না দেওয়ায় বিপত্তি

গত ২৩ জুন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জেকেজি হেলথ কেয়ারের নার্স তানজিনা পাটোয়ারী ও তার স্বামী হুমায়ূন কবিরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশের কাছে তথ্য ছিল, তারা করোনার ভুয়া রিপোর্ট দেয়। তাদের গ্রেফতারের পর জানা যায়, জেকেজি হেলথ কেয়ারে তানজিনার বেতন ছিল ৩০ হাজার টাকা। ভুয়া করোনা পরীক্ষা করে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করতে দেখে তানজিনা প্রতিষ্ঠানটির কাছে আরও বেশি বেতন দাবি করে। জেকেজির কর্ণধার আরিফ চৌধুরী বিষয়টি  জানতে পেরে তানজিনা ও তার স্বামীকে চাকরিচ্যুত করে। পরে তানজিনা ও তার স্বামী হুমায়ূন বাসায় বসে নিজেরাই করোনার ভুয়া টেস্ট করে মানুষকে রিপোর্ট দেওয়া শুরু করে। তানজিনা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করতো, আর ঘরে বসে তার স্বামী রিপোর্ট তৈরি করতো।

নার্সের দেওয়া তথ্যেই গ্রেফতার হয় আরিফুল

গত ২৩ জুন রাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তানজিনা ও তার স্বামী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে সব বলে দেয়। এরপর ২৪ জুন জেকেজির গুলশান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে প্রতারক আরিফসহ ছয় জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের দুদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। এদের মধ্যে দুজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। জেকেজির কার্যালয় থেকে ল্যাপটপসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি জব্দ করে পুলিশ। এ ঘটনায় তেজগাঁও থানায় চারটি মামলা হয়েছে। ওই দিনই প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মী আরিফকে ছাড়িয়ে নিতে তেজগাঁও থানায় জড়ো হয়। তারা থানার বাইরে হট্টগোল করতে থাকে। এ ঘটনায় পৃথক একটি মামলা হয়েছে। ওই মামলায় ১৮ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

সাবরিনার সংশ্লিষ্টতার কথা পুলিশকে জানিয়েছেন আরিফুলসহ অন্যরা

জেকেজি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার বিষয়টি অনেকবার অস্বীকার করেছেন আরিফুল হকের স্ত্রী ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের  চিকিৎসক সাবরিনা আরিফ চৌধুরী। তবে এরআগে গ্রেফতার আরিফুল হকসহ ছয় জন সাবরিনার জড়িত থাকার কথা পুলিশকে জানিয়েছেন। এরপরই তাকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছেন ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুন অর রশীদ।

তিনি বলেন, ‘আরিফসহ গ্রেফতার ছয় জনই আমাদের কাছে চিকিৎসক সাবরিনার জড়িত থাকার কথা আমাদের জানিয়েছেন।’

সাবরিনাকে বিয়ের পর স্বাস্থ্য খাতের ব্যবসায় নামেন আরিফুল

২০১৫ সালে সাবরিনাকে বিয়ে করার পর আরিফুল স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন ব্যবসায় আসেন। তবে তার মূল ব্যবসা ছিল ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট। স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ করতো ওভাল গ্রুপ। এই কাজ ভাগিয়ে নিতেও তার স্ত্রী সাবরিনা সহযোগিতা করতেন আরিফুলকে।

ডেকোরেটরদের টাকাও পরিশোধ করেনি জেকেজি

করোনার নমুনা সংগ্রহের জন্য ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় যে বুথ তৈরি করা হয়, সেজন্য ভাড়ায় নেওয়া ডেকোরেটরদের জিনিসপত্রের ভাড়া পরিশোধ করেনি জেকেজি। মোহাম্মদপুরের তোতা মিয়া নামে এক ব্যক্তি রবিবার বিকালে  ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি অফিসে এ বিষয়ে জেকেজির বিরুদ্ধে  অভিযোগ করেছেন। জানা গেছে, তোতা মিয়ার নাফিস কমিউনিকেশন্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তিনি জেকেজিকে ১২টি ল্যাপটপ ভাড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু তাকে কোনও টাকা পরিশোধ করেনি জেকেজি। তিনি গত ২৫ জুন আরিফুল চৌধুরীকে আসামি করে তেজগাঁও থানায় মামলা করেছেন।

মেহেদী হাসান নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে আর্চওয়েসহ বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট ভাড়া নেওয়া হলেও তাদেরও পাওনা পরিশোধ করেননি আরিফুল।

পুলিশ কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ বলেন, ‘ডেকোরেটরসহ বিভিন্নজন এই গ্রুপের কাছে টাকা পাবে। তারা আইনি আশ্রয় নিতে পারেন।’

মামলা ও আসামি

জেকেজির কেলেঙ্কারির ঘটনায় এখনও পর্যন্ত চারটি মামলা হয়েছে। এরমধ্যে একটি প্রতারণার ও বাকিগুলো ভাঙচুরের। আরিফুল হক চৌধুরীকে গ্রেফতারের পর থানায় ভাঙচুর চালিয়েছে তার স্বেচ্ছাসেবীরা। এই ঘটনায় একটি এবং আরিফুল নিজেও হাজতখানায় ভাঙচুর চালিয়েছেন, সেই ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। এছাড়াও আরিফের বিরুদ্ধে ল্যাপটপ ভাড়া নিয়ে তা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে এক পাওনাদার মামলা করেছেন। করোনার নমুনা পরীক্ষার জালিয়াতির মামলায় আদালতের অনুমতি নিয়ে জেকেজির সিইও আরিফুলসহ চার জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।

ডিসি হারুন অর রশীদ বলেন, ‘ভাঙচুর মামলায় আমরা ১৮ জনকে গ্রেফতার করেছি। তারা থানায় ঢুকে পুলিশকে মারধর করেছে, ভাঙচুর করেছে।’

ডা. সাবরিনার নাম এজাহারে না থাকলেও তদন্তে তার নাম এসেছে। অভিযোগ পত্রে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।

আরিফুলের নামে অতীতেও প্রতারণার মামলা আছে

করোনার নমুনা পরীক্ষায় জালিয়াতি ছাড়াও জেকেজি হেলথ কেয়ারের প্রধান নির্বাহী আরিফুল চৌধুরীর নামে ২০১২ সালে রমনা থানায় একটি প্রতারণা মামলা হয়।

কে এই সাবরিনা

সাবেক এক সচিবের মেয়ে সাবরিনা। তারা দুই বোন। তার শৈশব কেটেছে দেশের বাইরে। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে তারা পরিবারসহ নেদারল্যান্ডসে ছিলেন। সেখানে বসেই দূতাবাসের মাধ্যমে এসএসসি পরীক্ষা দেন। এরপর তারা যুক্তরাষ্ট্রে যান। পুরো পরিবার সেখানে  থাকা শুরু করে। তবে এইচএসসি পাসের পর দেশে মেডিক্যালে পড়ার সুযোগ পান সাবরিনা। ভর্তি হন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজে। সেখান থেকে পাস করে চিকিৎসা পেশায় যুক্ত হন। তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিভিন্ন তথ্য জানা গেলেও সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা যায়নি। তবে ২০১৫ সালে ভালোবেসে আরিফুলের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ