ওয়াসার কাজ কী?

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ০৯:০০, আগস্ট ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:০০, আগস্ট ০৯, ২০২০

 

ওয়াসারাজধানীর পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য গড়ে তোলা হয় ঢাকা ওয়াসা। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য নগরীর খাল ও ড্রেনগুলোর দায়িত্ব দেওয়া হয় এই সংস্থাকে। কিন্তু নগরবাসীর অভিযোগ, ওয়াসা মূল দায়িত্ব থেকে সরে গেছে। খাল ও জলাশয় পরিষ্কার না করে শত কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের দিকে ঝুঁকে পড়েছে সংস্থাটি। এ কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় শহরে। এমন পরিস্থিতিতে ওয়াসাকে ব্যর্থ সংস্থা দাবি করে নগরীর খাল ও ড্রেনের দায়িত্ব নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দুই সিটি করপোরেশন।
সূত্র জানিয়েছে, মূল কাজগুলোর মধ্যে নগরীর বাসাবাড়িতে পানি সরবরাহ করে যাচ্ছে ওয়াসা। তবে পয়ঃনিষ্কাশনের দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করছে না। যদিও নগরবাসীর পয়বর্জ্য শোধন করে নদীতে অপসারণ করার কথা এই সংস্থার। এজন্য পাগলায় রয়েছে একমাত্র শোধনাগার। কিন্তু রাজধানীর বেশিরভাগ পয়োনালা ভেঙে অকেজো হয়ে পড়েছে। এ কারণে শোধনাগারে বর্জ্য যায় না। তাতে মাত্র দুই ভাগ বর্জ্য শোধন হয়। বাকি ৯৮ ভাগ কোনও না কোনোভাবে নদী বা পুকুর ও ডোবায় চলে যাচ্ছে।
সংস্থাটির হিসাব বলছে, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি লিটার পয়োবর্জ্য উৎপন্ন হয়। বিভিন্ন স্থানের বর্জ্য কম আসছে বলে নারিন্দা কেন্দ্রীয় পাম্প স্টেশনের একটি পাম্প ছয় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। এর বাইরে জলাবদ্ধতা নিরসনের যে দায়িত্ব রয়েছে তা যেন বেমালুম ভুলে বসেছে ওয়াসা! বর্ষা মৌসুমে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিলে মুখোমুখি অবস্থান নেয় সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসা। জলাবদ্ধতার মূল দায়িত্ব ওয়াসার দাবি করে সিটি করপোরেশন সেই দায়িত্ব নিতে চায় না। ওয়াসারও দাবি, এই দায়িত্ব তাদের একার নয়।

আইন অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীতে প্রধান ড্রেন লাইনগুলো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ওয়াসার এবং শাখা লাইনগুলোর দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের ওপর ন্যস্ত। শহরের মোট ড্রেনেজ লাইনের মধ্যে ৩৮৫ কিলোমিটার বড় আকারের ড্রেন ঢাকা ওয়াসার অধীন। আর প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার ছোট ড্রেন সিটি করপোরেশনের অধীনে। এর বাইরে ৭৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ২৬টি খাল ও ১০ কিলোমিটার বক্স কালভার্টের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ওয়াসার।
কিন্তু নগরবাসীর অভিযোগ, খাল ও ড্রেন নিয়ে কোনও কাজই করছে না ঢাকা ওয়াসা। সংস্থাটি শুধু পানি সরবরাহের নামে শত কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত। এগুলোর ঋণের বোঝা বিভিন্ন সময় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে নগরবাসীর ওপর। এর অংশ হিসেবে আইন ভেঙে দফায় দফায় পানির দাম বেড়েছে। আর প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
পানির দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বাংলা ট্রিবিউনের কাছে যুক্তি তুলে ধরলেন, ‘সেই টাকাও তো আমাদের ব্যয়ের মধ্যে ধরতে হবে। কারণ পানি উৎপাদনের জন্য সেই টাকা নেওয়া হয়েছে। সেটা তো আমাদের ব্যয়ের অংশ। এখন ঋণের যে টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে, সেটা কী ব্যয়ের মধ্যে ধরবো না?’
জানা গেছে, একসময়ের খরস্রোতা খালগুলো বন্ধ করে বক্স কালভার্ট তৈরি হয়েছে। কিন্তু ওয়াসার নিয়ন্ত্রণাধীন এসব বক্স কালভার্ট এখন একেকটি যেন বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে! বর্তমানে সবই প্রায় বন্ধ। এর ভেতরে বিভিন্ন পদার্থ জমে ভর্তি হয়ে আছে। এ কারণে এসব বক্স কালভার্ট দিয়ে এখন আর আগের মতো পানি প্রবাহের সুযোগ নেই। তাই সামান্য বৃষ্টি হলেই নগরজুড়ে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন ১৯৯৬-এর চতুর্থ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ‘বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনসহ নিষ্কাশন সুবিধার জন্য ঢাকা ওয়াসা ময়লা নির্গমন প্রণালী নির্মাণ ও সংরক্ষণ করবে।’ কিন্তু ঢাকা ওয়াসার দাবি, জলাবদ্ধতা নিরসন করা তাদের দায়িত্ব নয়। এটি সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। আর সিটি করপোরেশনের বলছে, বৃষ্টির পানির দায়িত্ব ওয়াসার। জলাবদ্ধতা নিরসনে ওয়াসাকে ব্যর্থ দাবি করে খাল ও ড্রেনের দায়িত্ব নিজেরা নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯-এর ২য় তফসিল ও ৩য় তফসিলের বিভিন্ন বিধি, ধারা ও উপধারায় বলা হয়েছে, ‘সিটি করপোরেশন তার আওতাভুক্ত এলাকায় পানি নিষ্কাশন, জলাধার সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে দায়বদ্ধ।’ কিন্তু ঢাকা ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড জলাধার সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পানি নিষ্কাশনসহ জলাবদ্ধতা নিরসনের সেই দায়িত্ব নিজেদের আওতায় রেখেছে। আইন অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করছে না তারা। তাছাড়া নিজেরা সঠিকভাবে কাজ করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ২২ জুলাই জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণ করতে ওয়েবিনারে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামকে অনুরোধ জানিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর অর্পিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা চরমভাবে ব্যর্থ। আমাদের দায়িত্ব দিন, আমরা দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন করবো।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) দৃষ্টিতে, আইনের মারপ্যাঁচে বর্ষায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে একে অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের দায়িত্ব এড়াতে চায় সংস্থাগুলো। এ কারণে জনগণের ভোগান্তি প্রতি বছর তীব্র হতে থাকে। তাই অবিলম্বে আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে একক প্রতিষ্ঠানের হাতে সম্পূর্ণ ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, পয়ঃনিষ্কাশন খাল ও কালভার্ট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে নাগরিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুই সিটি করপোরেশনকে এই দায়িত্ব প্রদান করা উচিত এবং তাদের হাতেই এক্ষেত্রে ওয়াসার এখতিয়ারভুক্ত কাজের পরিবীক্ষণের দায় থাকা দরকার বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মন্তব্য জলাবদ্ধতা নিরসনে অর্পিত দায়িত্ব পালনে বিগত বছরগুলোতে ঢাকা ওয়াসা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসার একটি প্রতিবেদনে তাদের আওতাধীন ২৬টি খালের মধ্যে ২০টির প্রবাহ পূর্ণ সচল দাবি করা হয়। এর মধ্যে কাটাসুর খালকে সচল উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের গবেষণায় দেখা যায়, উল্লিখিত খালের প্রবাহ সচল নেই। বিভিন্ন কঠিন বা ভারী বর্জ্য ড্রেনের উপরিভাগ ও খালের মুখে জমে রয়েছে, যা চিত্রসহ গবেষণা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, গত অর্থবছরে ঢাকা ওয়াসার ২৬টি খালের মধ্যে অন্তত ১০টিতে কার্যত পুনঃখনন ও পরিষ্কারের কাজ করা হয়নি।’
ড. ইফতেখারুজ্জামানের ভাষ্য, ‘ওয়াসার আওতাধীন খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে নিয়মিত তদারকির ঘাটতি লক্ষণীয়। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রতি মাসে কমপক্ষে দুইবার খাল ও ড্রেন পরিদর্শনের নিয়ম থাকলেও তা করা হয় না। এ কারণে খাল দখল, খালের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণসহ বিভিন্নভাবে খাল ভরাট হয়ে থাকে। তাই ওয়াসার ব্যর্থতা অস্বীকারের কোনও সুযোগ নেই। আবার ওয়াসার ওপর এককভাবে সব দোষ চাপিয়ে ড্রেনেজ অব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য অপসারণে ব্যর্থতার দায় সিটি করপোরেশন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলামের দাবি, ‘আইন অনুযায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল কর্তৃপক্ষ ঢাকা ওয়াসা। আমরা তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছি। বৃষ্টির পানি অপসারণের সব ড্রেন ও খাল ওয়াসার অধীনে। তাদের খাল ও ড্রেনের সঙ্গে আমাদের কিছু সংযোগ লাইন রয়েছে। তাদের খাল ও ড্রেনগুলো ব্লক হয়ে গেলে আমাদের সংযোগ লাইন কাজ করে না। তখন আমাদের করার কিছুই থাকে না।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওয়াসার আইনেই আছে পানি সরবরাহ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা তাদের কাজ। কিন্তু ওয়াসা বলছে, ড্রেনেজ নাকি তাদের দায়িত্ব নয়। তাদের সীমাবদ্ধতা ও গাফিলতি দুটোই থাকতে পারে। এমনটা অনেক প্রতিষ্ঠানেই থাকে। কিন্তু এটাকে অস্বীকার করা ঠিক নয়। এ কারণে ওয়াসার সফলতাগুলো আড়াল হয়ে যাচ্ছে।’

বিআইপি সাধারণ সম্পাদকের মন্তব্য, ‘ওয়াসা গঠনমূলকভাবে জানাতে পারে তাদের দায় ও দায়িত্ব। কিন্তু যেসব কারণে সেগুলো করতে পারছে না সেটাও জানাতে হবে। যতদিন তারা এটি নিশ্চিত করতে পারবে না ততদিন তারা ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হবে।’

ওয়াসা বিরুদ্ধে প্রকল্পনির্ভর উন্নয়নের দিকে ঝোঁকার অভিযোগ তুলেছেন এই পরিকল্পনাবিদ। প্রকল্পভিত্তিক কাজে ওয়াসার এক ধরনের আগ্রহ লক্ষ্য করেছেন তিনি। জনদুর্ভোগসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ে তেমন একটা নজর নেই। তার পরামর্শ, প্রকল্প নির্ভরতা থেকে কমে এসে এই সংস্থাকে মূল দায়িত্বে ফিরতে হবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী তাকসীম এ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইনের বাইরে কাজ করার কোনও সুযোগ আমাদের নেই। আমরা আইন অনুযায়ীই কাজ করছি।’ আর কোনও কিছু জানার থাকলে লিখিত আকারে পাঠাতে বলেন ঢাকা ওয়াসার এমডি। পরে নিজের ব্যস্ততা দেখিয়ে আর কথা বলতে রাজি হননি এই প্রকৌশলী।

/জেএইচ/

লাইভ

টপ