এক কাপড়ে ২৯ দিন!

Send
সাদ্দিফ অভি
প্রকাশিত : ০১:৫১, আগস্ট ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:১৩, আগস্ট ২৩, ২০২০

রায়হান কবিরকরোনা পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়ায় লকডাউন চলাকালে প্রবাসীদের ওপর দেশটির সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে কথা বলায় গ্রেফতার হন নারায়ণগঞ্জের রায়হান কবির। সত্যি কথা তুলে ধরায় তাকে রিমান্ড ও লকআপে থাকার মতো দুরবস্থা মেনে নিতে হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় লকআপের ২৯ দিন রায়হানকে থাকতে হয়েছিল এক কাপড়ে। সব শেষে তার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ গঠন করতে পারেনি দেশটির পুলিশ। শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাতে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে অপরাধ না করলেও বিমানবন্দরে রায়হানের হাতে দেখা গেছে হাতকড়া। আর কষ্টের কথা তুলে ধরে রায়হান এখন প্রবাসীদের কাছে হিরো। বিমানবন্দরে বোর্ডিং ও ইমিগ্রেশন লাইনে প্রবাসীরা তাকে পেয়ে জড়িয়ে ধরেছেন। নিজেদের জায়গা ছেড়ে দিয়ে রায়হানকে এগিয়ে দিয়েছেন সামনের দিকে। অনেকে কাছে এসে নিয়েছেন সেলফি। জানিয়েছেন তার প্রতি সমর্থন ও শুভ কামনা।

মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট এমএইচ ১৯৬ আসার অপেক্ষায় শুক্রবার গভীর রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন রায়হানের বাবা শাহ আলম। মালয়েশিয়ার স্থানীয় সময় রাত ১১টায় ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। ঢাকায় যখন ফ্লাইটটি নামে রাত প্রায় ১টা। বিমানবন্দরের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে যখন বেরিয়ে আসেন রায়হান তাকে বুকে জড়িয়ে নেন তার বাবা।

রায়হানের ফেরার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, রায়হান যখন কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে পৌঁছান, তখন তিনি মাস্ক পরে প্রবেশ করেছিলেন। তার হাতে ছিল হাতকড়া। বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের পর বোর্ডিংয়ের আগে কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করায় তিনি মাস্ক খুলে ফেলেন। তখন সেখানে অবস্থানরত অন্যান্য বাংলাদেশি তাকে দেখে এগিয়ে আসেন। বোর্ডিংয়ের জন্য তাকে লাইনের সামনে জায়গা করে দেন প্রবাসীরা। কেউ কেউ সেখানে তাকে জড়িয়ে ধরেন। প্রবাসে নির্যাতনের কথা তুলে ধরার জন্য তাকে সেখানেই বাহবা জানান।

বিমানবন্দরে রায়হানবিমানবন্দরে রায়হানের বাবার সঙ্গে অপেক্ষমাণ ছিলেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান। তিনি বলেন, ইমিগ্রেশনের সময় অন্য যে প্রবাসীরা অপেক্ষমাণ ছিলেন তারা রায়হানকে দেখে লাইনের আগে জায়গা ছেড়ে দেন। যাতে দ্রুত রায়হানের ইমিগ্রেশন শেষ করতে পারেন। সেখানে কেউ কেউ তার সঙ্গে সেলফিও তুলেছেন। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে রায়হান তার বাবাসহ যান এয়ারপোর্টের কাছেই আশকোনা ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে। সেখানে মায়ের হাতের রান্না করা ইলিশ ও চিংড়ি মাছের তরকারি দিয়ে রাতের খাবার খান রায়হান।

২৯ দিন এক পোশাকে থাকা ও খাবারের কষ্টের কথা চিন্তা করে তার মা এসব খাবার রান্না করে পাঠান বলে জানান রায়হানের বাবা শাহ আলম। তিনি বলেন, আমাদের এবার কোনও ঈদ ছিল না। রায়হান আমাদের মধ্যে ফিরে আসায় ঈদের মতো খুশি লাগছে।

শরিফুল হাসান বলেন, রাতের খাবার খেয়ে রায়হান নিজ বাড়ির উদ্দেশে নারায়ণগঞ্জ রওনা হন। রায়হানকে দেখার জন্য সেখানে মানুষের ভিড় ছিল। ছেলেকে কাছে পেয়ে বুকে জড়িয়ে নেন মা।

পরদিন রায়হানের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। রায়হান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পরিবারের কাছে ফিরে আমি খুব আনন্দিত। দেশের মানুষ আমাকে যেভাবে সাপোর্ট দিয়েছে আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন রায়হানরায়হান জানান, মালয়েশিয়ায় আটকের পর তিনি এক কাপড়েই লকআপে ছিলেন ২৯ দিন। রিমান্ডে নেওয়া হলেও তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি। তবে মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন। তিনি বলেন, ইনভেস্টিগেশনের জন্য আমাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। তারা বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করেছে।

মালয়েশিয়া থেকে ফিরে এসে এখন কী করবেন, জানতে চাইলে রায়হান বলেন, আমি এখনও মানসিকভাবে প্রস্তুত না। তবে আমার ইচ্ছা আমি প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করবো। আমরা দেখেছি প্রবাসীদের নিয়ে কথা বলার মানুষ খুব কম। তাদের দুঃখ-কষ্টের জায়গাগুলো নিয়ে আমি কাজ করতে চাই। হতে পারে আমি প্রফেশনাল বা কূটনৈতিক কেউ নই। তবে আমার যে অভিজ্ঞতা, তা থেকে বলতে পারি, লক্ষ্য সৎ হলে একাই ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ হওয়া সম্ভব।

সব শেষে রায়হান জানান, আমি তাদের দেশে থেকে যা বলেছি, সত্য বলেছি। আমি কোনও ভুল করিনি।

রায়হানকে সমর্থন করে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, রায়হান যে কথাটি বারবার বলেছে, তার সঙ্গে আমি একমত। এই কথাটি গত ১২-১৪ বছর ধরে আমি বলেছি। কেন শুধু বাংলাদেশিদের হাতে পায়ে শেকল পরিয়ে রাখা হয়। এটা তো কোনও মানবিক কাজ না। এটা এক ধরনের বৈষম্য, কোনও আইনই এর অনুমতি দেয় না। সেই কষ্ট থেকে রায়হান কথাগুলো বলেছে। প্রবাসীরা যে নানাধরনের নিপীড়নের শিকার হয়, সেটা বন্ধ করার জন্য আমরা যেন একটু কথা বলি। অন্তত আমরা যেন আমাদের নাগরিকদের মর্যাদা দেই।

তিনি আরও বলেন, রায়হানের ঘটনায় এটি প্রমাণ হয়েছে যে–ন্যায়ের পথে থেকে সবাই মিলে যদি একসঙ্গে প্রবাসীদের অধিকারের কথা বলা যায়, তাহলে দিন শেষে জয়ী হওয়া যাবে। আমরা যেন এই ঘটনা থেকেই শিক্ষা নেই। কারণ প্রায় প্রতিটি দেশেই আমাদের প্রবাসীরা নানা ধরনের সংকটে আছে। যত দেশ আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ব্যবহার করা হয় বাংলাদেশিদের সঙ্গে। অন্য দেশের নাগরিকের সঙ্গে তো এরকম ব্যবহার করা হয় না। রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের এই জায়গায় জোর দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

মায়ের পাশে রায়হান কবিরপ্রসঙ্গত, গত ৩ জুলাই ‘লকডআপ ইন মালয়েশিয়ান লকডাউন-১০১ ইস্ট’ শীর্ষক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আল-জাজিরা টেলিভিশনে সম্প্রচার হয়। এতে দেখানো হয়—মালয়েশিয়া সরকার মুভমেন্ট কন্ট্রোল অর্ডার (এমসিও)-এর মাধ্যমে মহামারির সময়ে অভিবাসীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। সেখানে রায়হান কবিরের একটি ইন্টারভিউ সম্প্রচারিত হলে, দেশের অভিবাসন বিভাগ তার খোঁজ শুরু করে। তার ছবি প্রকাশ করে তারা রায়হানের বিষয়ে তথ্য জানানোর অনুরোধ করে। বাতিল করা হয় তার ওয়ার্ক পারমিট। এছাড়া প্রতিবেদনের সঙ্গে আল-জাজিরার সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর ২৪ জুলাই রায়হান কবিরকে গ্রেফতার করে সে দেশের পুলিশ। গ্রেফতারের পর সে দেশের দুই জন আইনজীবী তার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চান পুলিশের কাছে। কিন্তু প্রথমে অনুমতি না পেলেও পরে অনুমতি পান তারা। রায়হান আইনজীবীদের জানান, তিনি যা দেখেছেন তা-ই বলেছেন। এতে যদি সে দেশের সরকার বা কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তাহলে তিনি তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। এ সময় রায়হান কবির ওই আইনজীবীদের কাছে দ্রুত দেশের ফেরার আগ্রহও প্রকাশ করেন। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পরও দেশটির পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ গঠন করতে পারেনি। তাই তাকে দ্রুত দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেয় সে দেশের অভিবাসন বিভাগ।


আরও পড়ুন:
মায়ের কাছে ফিরলেন রায়হান কবির

/টিটি/এমএমজে/

লাইভ

টপ
X