‘যুদ্ধটা চালিয়ে গেলেই বিজয়ী সেনাপতি’

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ০৯:০০, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৫, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

সাত বছরের শিশু মোহাম্মদ ঘাতক ব্যাধি ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত ছিল।  চলতি সপ্তাহেই  চিকিৎসা শেষ হয়েছে তার, সে এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। আরেক শিশু সাড়ে ছয় বছরের জান্নাত, সেও ব্লাড ক্যানসারের রোগী, একইসঙ্গে করোনা পজিটিভ। জান্নাত বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ  হাসপাতালে  চিকিৎসাধীন।

তথ্য বলছে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। যদিও বাংলাদেশে ক্যানসারে  আক্রান্ত শিশুদের সঠিক কোনও পরিসংখ্যান নেই। তবে সংশ্লিষ্ট তথ্য মতে, বছরে প্রায় ৯ হাজার শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। 

এছাড়া বাংলাদেশে বর্তমানে ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ১৩ থেকে ১৫ লাখ বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। আবার আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে লিউকোমিয়া ও লিম্ফোমার হার বেশি। কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র, মস্তিষ্ক ও হাড়ের ক্যানসরে  আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাও কম নয়। আর শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই শিশুদের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার কারণ শনাক্ত হয় না, বলছেন চিকিৎসকরা।

তবে আশার কথা হচ্ছে, এখন মানুষ বুঝতে পারছে যে, শিশু ক্যানসার একটা রোগ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা হলে সেটি ভালো হয়। একইসঙ্গে দেশে ক্যানসার আক্রান্ত শিশু রোগীর ডায়াগনসিস হচ্ছে, ডায়াগনসিস ফ্যাসিলিটিস বেড়েছে—যার কারণে এখন এসব রোগী প্রত্যন্ত এলাকা থেকে রেফারড হয়ে বড় হাসপাতালে আসছে। চিকিৎসা হচ্ছে এবং শিশুরা সুস্থ হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি এই যুদ্ধটা চালিয়ে যেতে পারলেই সে জয়ী হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মোট এক হাজার ৪৫৯ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ব্লাড ক্যানসার আক্রান্ত ৭৪২ শিশু, লিম্ফোমাতে আক্রান্ত হয়েছে ২০৯ জন, কিডনির ক্যানসার ১১৯, মাসেল ক্যানসার ৯৩, নিউরোব্লাস্টোমা আক্রান্ত ৭৭টি শিশু। এছাড়া রয়েছে জার্ম সেল টিউমার, লিভার ক্যানসার, বোন ক্যানসারসহ আরও কিছু ক্যানসারের ধরন।

ঢামেক হাসপাতালের শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিরুল মোরশেদ খসরু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত রোগী ছিল ৭৩৭ জন। আর ২০১৭ সালের মার্চ থেকে ২০২০ সালে জুন পর্যন্ত রোগী সংখ্যা হচ্ছে ৭৪২ জন। গত তিন বছরে রোগী সংখ্যা ছিল গত পাঁচ বছরের সমান।’

তিনি বলেন, ‘শিশু ক্যানসার সরসারি কোনও কারণের সঙ্গে রিলেটেড নয়। শতকরা ৯০ শতাংশেরই কারণ অজানা। এখনও পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এটা বের করতে পারেনি, যেমনটা- বড়দের ধূমপান, হেপাটাইটিস বি বা সি’তে আক্রান্ত হলে তার ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।’

তবে বাকি ১০ শতাংশের কারণ হিসেবে ছোটদের ক্যানসার মূলত নির্ভর করে বাবা-মায়ের ওপর, জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আর বংশগত কারণ ছাড়াও খাদ্যাভ্যাস, কীটনাশক, খাবারে রাসায়নিক, রেডিয়েশন, পরিবেশ দূষণ, জীবনযাত্রার ধরন, মানের কারণে বড়দের ক্যানসার বেড়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় শিশু ক্যানসারও বেড়েছে। তবে শিশু ক্যানসার রোগীদের এখন পাওয়া যাচ্ছে বেশি। কারণ, মানুষের ভেতরে সচেতনতা বেড়েছে।’

তিনি বলেন, ‘শিশু ক্যানসার নিরাময়যোগ্য, প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে, সঠিক চিকিৎসা পেলে ক্যানসার থেকে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের বয়সসীমা নির্ধারণ করেছে ১৮ বছর পর্যন্ত। কিন্তু একেক ক্যানসারের প্রবণতা একেক বয়সে বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সবকিছুর মধ্যেও আবার ব্লাড ক্যানসারের হার বেশি। দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের মধ্যে ব্লাড ক্যানসার বেশি হয়। আবার নিউরোব্লাস্টোমা হয় আরও কম বয়সে। লিভার এবং কিডনি ক্যানসার হয় এক থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের।

শিশুদের ক্যানসার প্রাথমিক অবস্থাতে চিকিৎসার আওতায় আনতে পারলে ভালো হয়, জানিয়ে অধ্যাপক আমিরুল মোরশেদ বলেন, ‘এজন্য দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে হবে। বর্তমানে সরকারিভাবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (মিটফোর্ড হাসপাতাল), শিশু হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিশুদের ক্যানসারের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। তাই সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করতে পারলে ক্যানসার ভালো হয়।’

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শিশু অনকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মমতাজ বেগম বলেন, ‘‘শিশু ক্যানসারের সবচাইতে বেশি হয় ব্ল্যাড ক্যানসার। এছাড়া ক্যানসার হাসপাতালে বোন ক্যানসার ও চোখের ক্যানসারের  রোগী অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া, ব্রেন টিউমার অনেক রোগী পাচ্ছি যেগুলো ‘রেয়ার কেস’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।’’

গত কয়েক বছরে রোগী অনেক বেড়ে গেছে জানিয়ে অধ্যাপক মমতাজ বেগম বলেন, ‘এই হাসপাতালে ২০০৮ সালে যে হারে রোগী পেতাম, তার কয়েকগুণ রোগী বেড়েছে সাম্প্রাতিক সময়ে। তবে যদি প্রাথমিক অবস্থাতে চিকিৎসা শুরু করা যায়, তাহলে কিছু কিছু ক্যানসার শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি ভালো হয়ে যায়।’

‘ফাইভ ইয়ার্স সার্ভাইবল’ বলে একে আমরা অ্যাখ্যায়িত করে থাকি মন্তব্য করে অধ্যাপক মমতাজ বেগম বলেন, ‘পাঁচ বছর পর্যন্ত যদি এই যুদ্ধটা চালিয়ে যাওয়া যায়—তাহলেই আমরা তাকে সুস্থ বলে ধরে নেই। প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হওয়ার পর ঠিকমতো চিকিৎসা নিয়ে ফলোআপে থাকতে পারাটাই প্রধান যুদ্ধ। এই যুদ্ধটা চালিয়ে যেতে পারলেই সে বিজয়ী সেনাপতি।’

‘আমাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে—বেশিরভাগই দেরিতে আসে। একইসঙ্গে ক্যানসারের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি, বারবার ফলোআপে আসতে হয়। এই বারবার আসাটাই অনেকে করতে পারেন না। যার কারণে রোগীদের বড় একটা অংশ ড্রপ আউট হয়ে যায়। হারিয়ে ফেলি আমরা রোগীদের’, বলেন অধ্যাপক মমতাজ বেগম।

/এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ