বিএনপির কূটনীতিতে উপেক্ষিত মধ্যপ্রাচ্য!

সালমান তারেক শাকিল
০৩ মে ২০১৮, ১৪:৪৪আপডেট : ০৩ মে ২০১৮, ২৩:৩১

বিএনপির বিদেশনীতি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির কূটনীতিতে উপেক্ষা করা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যকে। এ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের দেখভালের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনও দায়িত্বশীল ব্যক্তিও নেই দলটিতে। দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার শাসনামলে মধ্যপ্রাচ্যকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হলেও এখন এ অঞ্চলের ১৬টি দেশের জন্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কোনও কৌশলও নির্ধারণ করেনি বিএনপি। দলটির কূটনৈতিক উইংয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে এ বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’-এ পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক ধারায় জোর দিয়েই বলা হয়েছে, ‘বিএনপি মুসলিম উম্মাহ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলবে।’ যদিও দুই বছরেও এই অঙ্গীকারের কোনও ইঙ্গিত মিলছে না দলটির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে। তবে কূটনৈতিক উইংয়ের সদস্য ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য সাবিহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমার তা মনে হয় না। যারা আগে কাজ করেছেন, তারা এখনও কাজ করে যাচ্ছেন।’
জানা গেছে, বিএনপির আন্তর্জাতিক উইংয়ে ৩০ জনের বেশি দায়িত্বশীল থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নে কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করছেন না কেউ। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ড. ইনামুল হক চৌধুরী মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে কাজ করলেও বর্তমানে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সম্পর্কের অবনতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে ২০১৫ সালে। ওই বছর দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ওমরা পালন করতে গেলেও সৌদি সরকারের উচ্চপর্যায়ের কারও সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়নি। ২০১৬ সালে কাতারের প্রধানমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন নাসের বিন খলিফা আল থানি বাংলাদেশে এলেও বিএনপি প্রধানের সঙ্গে দেখা হয়নি। এরপর ওই বছরই ভারতে ইসরায়েলের লিকুদ পার্টির একজন নেতার সঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর সাক্ষাৎ নিয়ে ফিলিস্তিন রুষ্ট হয় বিএনপির ওপর। যদিও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকাস্থ ফিলিস্তিন দূতাবাসে গিয়ে জানিয়ে আসেন, তার দল ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের সঙ্গেই আছে।

বিএনপির মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার কথা উল্লেখ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারেক শামসুর রহমান তার ‘চার দশকের পররাষ্ট্রনীতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘খালেদা জিয়ার (১৯৯১-৯৬, ২০০১-২০০৬) বৈদেশিক নীতির উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সৌদি আরব-বাংলাদেশ সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া।’ তিনি এও উল্লেখ করেন, ‘১৯৭৫ সালের আগস্ট-পরবর্তী ঘটনার মধ্য দিয়ে জেনারেল জিয়া রাষ্ট্র ক্ষমতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। জিয়া মনে করতেন, বাংলাদেশ হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে ইসলামের সেতুস্বরূপ। জিয়ার শাসনামলেই বাংলাদেশ ইসলামিক সলিডারিটি ফান্ডের স্থায়ী কাউন্সিলের সদস্যপদ লাভ করে। আল কুদস কমিটি ও ১৯৮১ সালের ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে ইরান-ইরাক যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী কমিটিরও সদস্য ছিল বাংলাদেশ। জিয়ার আমলেই বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী পরিষদের সদস্যপদের একটিতে নির্বাচিত হয়েছিল।’

বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের একজন প্রভাবশালী সদস্য বলেন, ‘বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির অন্য কোনও দেশের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাদা কোনও সম্পর্ক নেই। এটা সম্ভবও না। এটার চেষ্টাও চালানো হয় না কখনও। শুধু চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছে দল হিসেবে। গত ১০-১২ বছরে আমি বিএনপিকে আলাদা কোনও সম্পর্ক গড়ে তুলতে দেখিনি। আলাদা সম্পর্ক রাখার কোনও সুযোগ নেই।’

এই সদস্য আরও বলেন, ‘বিএনপির বিদেশনীতির সঙ্গে বিদেশিদের দেখা সাক্ষাতের কোনও সম্পর্ক নেই। এটা শুধু তাদের টাইম টু টাইম জানানোই হয়। এর বাইরে তো কিছু করতে দেখি না।’

দলটির কূটনৈতিক উইংয়ের একটি সূত্র জানায়, বিএনপির মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে সর্বাধিক গুরুত্ব পায় সৌদি আরব। প্রচারিত আছে, দেশটির সঙ্গে দলীয় চেয়ারপারসনের সুসম্পর্ক রয়েছে। তবে গত নভেম্বরে দেশটিতে ক্রাউন প্রিন্স পদে মোহাম্মদ বিন সালমান নির্বাচিত হওয়ার নতুন সমীকরণ-কৌশল সামনে এনেছে সৌদি আরব। এমনকি ওয়াহাবি মতবাদ নিয়ে তার অবস্থানও নতুন ভাবনা এনেছে মুসলিম দুনিয়ায়। এদিক থেকে বিএনপির সঙ্গে সৌদি আরবের ‘স্থায়ী সম্পর্কে’ নতুন চিন্তা সঞ্চার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। নতুন করে দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশকে কোন অবস্থানে রাখা হয়েছে বা হবে—এ নিয়ে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত চায় বিএনপি। এছাড়া সৌদি আরবের সঙ্গে কাতারের বিরোধপূর্ণ সম্পর্কটিও আমলে নিয়েছে দলটির হাইকমান্ড।

মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিকই আছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে এখন রোহিঙ্গা বিষয়টি তাদের কাছে সবচেয়ে বড়। তারা এটাকে গুরুত্ব দিয়েছে। সৌদিতে নতুন যুবরাজ এসেছেন, তার মনোভাব এখনও পরিষ্কার নয়। এরপরও প্রত্যেক দেশেই নতুন-নতুন লোক আসছে। কিন্তু আমার মনে হয় সম্পর্ক ভালো আছে।’

(শুক্রবার প্রকাশিত হবে এ সিরিজের পরবর্তী প্রতিবেদন) 

আরও পড়ুন- 

আমেরিকা-ইউরোপের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক বজায় রাখবে বিএনপি

বিএনপির বিদেশনীতিতে অগ্রাধিকার পাচ্ছে চীন

বদলে যাচ্ছে ভারতবিরোধী অবস্থান

/এমএনএইচ/আপ-এফএস/চেক-এমওএফ/
সম্পর্কিত
‘মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনও ঘটনার তুলনা হয় না’
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
থানার ভেতরে আটকে বিএনপি নেতাকে মারলো কারা?
সর্বশেষ খবর
উচ্চ ক্ষমতার কার্বন ফাইবারের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু চীনে
উচ্চ ক্ষমতার কার্বন ফাইবারের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু চীনে
অলসতা মনে হলেও যে অভ্যাসগুলো হতে পারে বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ
অলসতা মনে হলেও যে অভ্যাসগুলো হতে পারে বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ
হঠাৎ রেমিট্যান্স আসা কমে গেলো
হঠাৎ রেমিট্যান্স আসা কমে গেলো
টেইটের জায়গায় তালহা জুবায়ের, প্রশংসায় ভাসালেন হান্নান সরকার 
টেইটের জায়গায় তালহা জুবায়ের, প্রশংসায় ভাসালেন হান্নান সরকার 
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের