জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রথম সাংগঠনিক সমাবেশ আয়োজন করে অনেকটাই চাপে পড়েছেন গেছেন সিলেটের নেতারা। গতকাল বুধবার (২৬ অক্টোবর) নগরীর রেজিস্ট্রারী মাঠে ফ্রন্টের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশের পর থেকে নগরীর নেতারা কেউ-ই আর নিজেদের বাসায় থাকতে পারছেন না। চলছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর তল্লাশিও।
এদিকে, প্রথম সাংগঠনিক সমাবেশ সফলভাবে আয়োজন করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নজর এখন আন্দোলনে। ফ্রন্টের দেওয়া সাত দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আগামী কয়েকটি সমাবেশ থেকে আলোচনার আহ্বান জানাবে তারা। এরপরই ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা আছে বিএনপি-জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া-জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত ঐক্যফ্রন্টের।
ফ্রন্টের দায়িত্বশীলরা বলছেন, আগামীকাল শুক্রবার (২৬ অক্টোবর) ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটি বৈঠক করবে। এই বৈঠকে সিলেটের সমাবেশের সাফল্য-ব্যর্থতা ও আগামী দিনের কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে।
ঐক্যফ্রন্টের একাধিক নেতা মনে করেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী মানুষের সমাগম হয়নি ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশে। যদিও সমাবেশের দিন বক্তারা অভিযোগ করেছেন, সমাবেশে আসতে নানা ধরনের নাটক ও বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে।
বুধবার (২৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সমাবেশ শেষ হওয়ার পর কেন্দ্রীয় নেতাদের বিদায় দিয়ে সিলেটের স্থানীয় নেতারা কেউ-ই নিজেদের বাসায় যেতে পারেননি। ইতোমধ্যে জেলা সভাপতি আবদুল কাহের শামীমের বাসায় দফায়-দফায় পুলিশ তল্লাশি চালিয়েছে। বুধবার সমাবেশ শেষ হওয়ার পর একটি হোটেলের সামনে থেকে আটক হন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। বৃহস্পতিবার সকালে তাকে একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। একই অবস্থা সুনামগঞ্জ বিএনপিসহ ফ্রন্টের কয়েকটি নেতাদের।
আটক বা গ্রেফতার, পুলিশের তল্লাশি সত্ত্বেও সিলেটের নেতারা বলছেন, ফ্রন্টের সমাবেশের পর সিলেট বিভাগে ঐক্যফ্রন্টের বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে এসেছে। নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়েছেন। আগামী দিনে দাবি আদায়ের যেকোনও কর্মসূচি তারা পালন করবেন। তবে খুব দ্রুত তারা ফ্রন্টের একটি সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করতে চান সিলেটে।
সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাহের শামীম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশের পর সিলেটের নেতাকর্মীরা উৎসাহিত হয়েছে। তারা সরাসরি কেন্দ্র থেকে মেসেজ পেয়ে গেছে, কী করতে হবে। যদিও সরকারের নির্যাতন অব্যাহত আছে। সমাবেশের পর থেকে আমরা কেউ বাড়িতে থাকতে পারছি না।’
সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মুনাজ্জির সুজন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নানা বাধা সত্ত্বেও সমাবেশ সফল হয়েছে। সিলেট বিভাগের অনেক মানুষ গতকাল সমাবেশ দেখেছে। এমনকী সাধারণ মানুষও উৎসুক ছিল সমাবেশ নিয়ে। আমাদের এখন কাজ হচ্ছে, সিলেটে ফ্রন্টের সমন্বয় কমিটি গঠন করা। কমিটি হলেই কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে।’
বুধবার সমাবেশ থেকে প্রধান অতিথি ড. কামাল হোসেনও তার বক্তব্যে সাতদফাকে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়েছেন, গ্রামে-গ্রামে, ইউনিয়নে-ইউনিয়নে, থানায়-থানায়, জেলা-জেলায় এই দাবির কথা প্রচার করতে।
সিলেটের স্থানীয় নেতারাও আগামী কয়েকদিনের মধ্যে চারটি দলের নেতারা বসে আগামী দিনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। এছাড়া ইতোমধ্যে গ্রেফতার হওয়া খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ, স্মারকলিপি প্রদানের চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে।
তবে বিএনপির জেলা সভাপতি আবদুল কাহের বলছেন, ‘কেন্দ্র ঠিক করবে কী কর্মসূচি দেওয়া হবে। আমরা তা বাস্তবায়ন করবো। আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ করতে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচির কোনও বিকল্প নেই।’
ঢাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরবর্তী করণীয় ও সিলেটের সমাবেশের ফলোআপ করতে শুক্রবার (২৬ অক্টোবর) বৈঠক হতে পারে। ওই বৈঠকেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটি বৈঠক করবে।
ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ডা. জাহেদ উর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সমাবেশ অত্যন্ত সফল হয়েছে। মানুষের কাছে বার্তা গেছে ঐক্যফ্রন্ট কী চায়, কী করবে। আর এ বিষয়গুলো নিয়ে আগামীকাল শুক্রবার বৈঠক করতে পারে স্টিয়ারিং কমিটি। এরপরই বিস্তারিত বলা যাবে।’
বিএনপির দায়িত্বশীল একজন ব্যক্তির মূল্যায়ন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেছে। ফ্রন্ট গঠন করার পর সিলেটে কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নেমে আসা, ফ্রন্টের অন্যতম প্রধান সাফল্য। ইতোমধ্যে সরকারের শীর্ষপর্যায়ে ফ্রন্টকে মোকাবিলার কৌশল বের করা হচ্ছে। এই দ্বিতীয় ধাপে ফ্রন্ট কর্মসূচি দেবে এবং সঙ্গে সঙ্গে সরকারের উদ্দেশ্যে আলোচনা করার আহ্বান জানাবে। এরপর চূড়ান্ত আন্দোলন।
বুধবার সমাবেশে ফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন, মির্জা ফখরুল, আসম রব, মাহমুদুর রহমান মান্না তাদের বক্তব্যে এ বিষয়টির ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সূত্রের ভাষ্য, আলোচনার আহ্বান কাজে না লাগলে পরবর্তীতে চূড়ান্ত কর্মসূচি দেওয়া হবে। আর এসবই রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে। যে সাত দফা দাবি ফ্রন্ট নির্ধারণ করেছে, তা পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়া। আর এর একটি মাত্র পথ নির্বাচন। সিলেটে ফ্রন্টের সমাবেশ থেকে সরাসরি নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা না দিলেও নেতারা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে মানুষকে বলার চেষ্টা করেছেন, এই সরকার দেশের মানুষকে অধিকার বঞ্চিত করে রেখেছে। ফ্রন্ট ক্ষমতায় গিয়ে মানুষের অধিকার ও দেশের মালিকানা ফিরিয়ে দেবে। আর এই লক্ষ্যই ফ্রন্টের তৃতীয় লক্ষ্য।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একাধিক নেতা জানান, সিলেটে সমাবেশের আগে ঢাকায় আসম রব সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সিলেট থেকে নতুন কর্মসূচি আসবে। যদিও তা কথার কথা হিসেবেই রয়ে গেলো। ফ্রন্টের দুয়েকজনের মত, এরকম বক্তব্য দিয়ে মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করে পরে কোনও নতুন ঘোষণা না দেওয়াটা রাজনৈতিক কৌশলগত ভুল।
এক্ষেত্রে স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য, প্রবীণ এক নেতা বলেন, ‘পরবর্তী বৈঠকগুলোতে এ বিষয়গুলো আলোচনা হবে।’







