আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারীদের হেনস্তা ও নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নারীদের ওপর হামলা ও হেনস্তার অভিযোগও রয়েছে। প্রশাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যর্থতা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে এবার নির্বাচনি প্রচারণা থেকে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়িয়েছেন স্বতন্ত্র নারী সংসদ সদস্য প্রার্থী।
ক্রমাগত নিরাপত্তাহীনতা, হুমকি ও হয়রানির মুখে শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মেঘনা আলম নির্বাচনি প্রচারণায় সাময়িক বিরতির ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, তার প্রচারণায় পরিকল্পিতভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে। নারী কর্মীদের লক্ষ্য করে লেজার লাইট ব্যবহার করে অপমান ও ভীতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট দফতরের মধ্যে দায় চাপাচাপি করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ তার।
সরকারকে দায়ী করে মেঘনা আলম জানান, তাকে কোনও নিরাপত্তা না দিয়ে কার্যত হিংস্র পরিবেশের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা চেয়ে বারবার আবেদন করা হলেও কোনো গানম্যান বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, এই বৈষম্যমূলক আচরণ শুধু একজন নারী প্রার্থীর বিরুদ্ধেই নয়, বরং নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং স্বাধীন, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধেও উদ্বেগজনক।
এদিকে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে বিএনপির নারী কর্মীদের হুমকি ও হেনস্তার অভিযোগ তুলেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, জামায়াত-শিবির প্রতিনিয়ত বিএনপির নারী কর্মীদের হুমকি দিচ্ছে এবং অনলাইন-অফলাইন উভয় মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করছে।
রিজভী আরও বলেন, জামায়াতের কোনও নারী সংসদ সদস্য প্রার্থী নেই। তারা ক্ষমতায় গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নারীরা। দলটির আমির প্রকাশ্যে বলেছেন, তার দলের প্রধান কখনও নারী হতে পারবে না। তিনি উল্লেখ করেন, ধর্ম ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের নারীদের সম্পর্কে অশ্লীল মন্তব্য করছে একটি রাজনৈতিক দলের বট বাহিনী।
অপরদিকে, বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ৩৬ দফার সমন্বয়ে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সেখানে তিনটি দফায় নারীদের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়ে বলা হয়েছে—সংসদে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা, পূর্ণ বেতনে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ও এক মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক এবং সরকারি কর্মক্ষেত্রে ঐচ্ছিক পিরিয়ড লিভ ও ডে-কেয়ার সুবিধা চালু। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে স্যানিটারি সামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসামগ্রী সরাসরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরবরাহের কথা বলা হয়েছে।
নারীদের বিষয়ে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কেউ কেউ মনে করে জামায়াত ক্ষমতায় এলে মা-বোনদের বাইরে বের হতে দেওয়া হবে না। তবে তার দলের লক্ষ্য দেশের সকল মা-বোনকে দেশের সেবায় নিয়োজিত হতে সহায়তা করা। ২০১৮ সালের নির্বাচনের রাতে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার অপরাধে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এক নারীর সম্মানে নোয়াখালীর সুবর্ণচরকে পৌরসভা ঘোষণা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
নির্বাচনি প্রচারের সময় বিভিন্ন স্থানে জামায়াতের নারী সংগঠনের নেতা–কর্মীদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হেনস্তার প্রতিবাদে মহিলা সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছিল জামায়াত। সুবিধাজনক নিরাপদ ভেন্যু না পাওয়ায় এবং নির্বাচনি কাজের চাপের কারণে পূর্বনির্ধারিত সমাবেশ স্থগিত করা হয়েছে। তবে নতুন কর্মসূচি দেওয়ার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে বলে জানিয়েছে দল।
এদিকে নারীদের বিশেষ একটি দল প্রয়োজনে ব্যবহার করছেন বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম। তিনি বলেন, বিশেষ একটি রাজনৈতিক দল চায়, নারীরা ঘরের ভেতরে থাকবেন। তবে তারা নারীদের ব্যবহার করে তাদের ভোট চাওয়া ও জান্নাতের টিকিট বিক্রির জন্য। তারা সবসময় নারীবিরোধী কথাবার্তা এবং ন্যারেটিভ তৈরি করে।









