বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে নতুন করে চারজনকে মনোনীত করা হয়েছে। শনিবার (১৫ আগস্ট) দলের সহ-দফতর সম্পাদক মুনির হোসেনের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, আমান উল্লাহ আমান, ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ও মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য হিসেবে মনোনীত করার বিষয়টি জানানো হয়। এর মাধ্যমে নতুনভাবে পুনর্গঠিত হলো বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী এই ফোরামটি।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলটি দেশের তৃণমূল স্তর (ইউনিয়ন ও পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড পর্যায়) থেকে সুসংগঠিত হয়ে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত মোট ১৩টি ধাপে বিস্তৃত। এই সাংগঠনিক কাঠামোর ৯ম ধাপে অবস্থান করছে ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’। এটিই মূলত দলের চূড়ান্ত নীতি নির্ধারণী ও তদারকি অঙ্গ।
দলটির গঠনতন্ত্রে ১৩ ধরনের কমিটির কথা উল্লেখ আছে। সেগুলো হলো ১) ইউনিয়নের ওয়ার্ড কাউন্সিল ও ইউনিয়নের ওয়ার্ড নির্বাহী কমিটি; ২) পৌরসভা/মহানগর, ওয়ার্ড কাউন্সিল ও পৌরসভা/মহানগর, ওয়ার্ড নির্বাহী কমিটি; ৩) ইউনিয়ন কাউন্সিল ও ইউনিয়ন নির্বাহী কমিটি; ৪) উপজেলা/থানা কাউন্সিল ও উপজেলা/থানা নির্বাহী কমিটি; ৫) পৌরসভা কাউন্সিল ও পৌরসভা নির্বাহী কমিটি; ৬) মহানগর কাউন্সিল ও মহানগর নির্বাহী কমিটি; ৭) জেলা কাউন্সিল ও জেলা নির্বাহী কমিটি; ৮) জাতীয় কাউন্সিল; ৯) জাতীয় স্থায়ী কমিটি; ১০) জাতীয় নির্বাহী কমিটি; ১১) পার্লামেন্টারি বোর্ড; ১২) পার্লামেন্টারি পার্টি এবং ১৩) প্রবাসে সংগঠন।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও স্থায়ী কমিটির আকার
বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। ওই কাউন্সিলের পর ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে সদস্যদের মৃত্যু ও পদত্যাগের কারণে কয়েকটি পদ শূন্য হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করার পর তিনি তার পদ ছেড়ে দেন।
স্থায়ী কমিটিতে বর্তমানে সদস্য আছেন ১৩ জন—তারেক রহমান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তবে রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের পর মির্জা ফখরুল পদ ছেড়ে দেওয়ায় সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১২ জনে। তাদের সঙ্গে আজ নতুন চারজন যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে স্থায়ী কমিটির মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়ালো ১৬ জনে।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য
দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলের চেয়ারম্যান, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পদাধিকার বলে স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকেন। চেয়ারম্যান এই কমিটির প্রধান এবং তিনি সভা আহ্বান করেন। এই স্থায়ী কমিটি নিম্নোক্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে থাকে:
১. নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়ন: দলের প্রধান নীতি নির্ধারক অঙ্গ হিসেবে এ কমিটি দলের মৌলিক নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়ন ও প্রবর্তন করে।
২. শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও পুনর্বিচার: একমাত্র চেয়ারম্যানের অপসারণ ব্যতীত দলের অন্যান্য সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পুনর্বিচারের চূড়ান্ত ক্ষমতা এই কমিটির হাতে থাকে।
৩. গঠনতন্ত্রের ব্যাখ্যা দান: এ কমিটি প্রয়োজনবোধে দলের ঘোষণাপত্র, গঠনতন্ত্র, বিধি, উপবিধি ও ধারার যথাযথ সংগতিপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করে, যা চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।
৪. গঠনতন্ত্রের প্রতি সম্মান নিশ্চিতকরণ: দলের সদস্যরা যাতে দলের ঘোষণাপত্র, গঠনতন্ত্র ও বিধি-বিধানের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করেন এবং তা মেনে চলেন, সেদিকে স্থায়ী কমিটি বিশেষ লক্ষ্য রাখে।
৫. প্রচারপত্র ও প্রকাশনা অনুমোদন: দলের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রচারপত্র ও প্রকাশনার অনুমোদন দান করে স্থায়ী কমিটি। এই কমিটির অনুমোদন ব্যতীত দলীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রচারপত্র প্রকাশ বা বিতরণ করা যায় না।
৬. অধীনস্থ কমিটি বাতিল ও পুনর্গঠন: ওয়ার্ড পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত যেকোনো নির্বাহী কমিটির কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত করা কিংবা বাতিল করে আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে পুনর্নির্বাচন ও পুনর্গঠনের নির্দেশ দিতে পারে এই কমিটি।
৭. তদারকি ও রিপোর্ট পেশের নির্দেশ: জাতীয় নির্বাহী কমিটিসহ অন্যান্য কমিটির কার্যক্রম তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রয়োজনে যেকোনো বিষয়ের ওপর রিপোর্ট তলব করার অধিকার স্থায়ী কমিটির রয়েছে।
সভা আহ্বান ও কোরাম সংক্রান্ত বিধি
দলের চেয়ারম্যান যেকোনো সময় তার ইচ্ছানুযায়ী স্থায়ী কমিটির সভা আহ্বান করতে পারেন। তবে গঠনতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৩ মাসে অন্তত একবার স্থায়ী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হওয়া বাধ্যতামূলক। কমিটির বিদ্যমান (এক্সিস্টিং) মোট সদস্য সংখ্যার অন্তত ৫০ শতাংশ সদস্যের উপস্থিতিতে সভার কোরাম গঠিত হয়।
দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে আশা প্রকাশ করে বলা হয়, নতুন যুক্ত হওয়া এই নেতারা তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, মেধা ও বিচক্ষণ সুচিন্তিত পরামর্শের মাধ্যমে সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামে দল ও জনগণের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশেষ অবদান রাখবেন।









