ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস আগে থেকেই দলটির পছন্দের তালিকায় ছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরেই দলের পর্যবেক্ষণে ছিলেন ঢাকা-১০ আসন থেকে নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য। মেয়র পদে নির্বাচনে অংশ নিতে তাকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রস্তুতি নিতেও দল থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। অবশ্য, তাপস ছাড়াও ঢাকা দক্ষিণ অঞ্চলের আওয়ামী লীগের অন্য একজন সংসদ সদস্যও পর্যবেক্ষণে ছিলেন। এদিকে, তাপস নিজেও বেশ কয়েকবার আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দলের কয়েকজন নেতার কাছে সিটি মেয়র পদে নির্বাচনের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আওয়ামী লীগ ও তাপসের ব্যক্তিগত সূত্রে আলাপকালে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
রবিবার (২৯ ডিসেম্বর) ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এতে ঢাকা উত্তর সিটিতে বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলাম ও দক্ষিণ সিটিতে ঢাকা-১০ আসনের এমপি শেখ ফজলে নূর তাপসকে মেয়র পদে নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়। আগের দিন শনিবার অনুষ্ঠিত দলের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায় এই দুই জনকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ক্ষমতাসীন দলটি।
জানতে চাইলে তাপসের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, তাপস আগে থেকেই ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদে নির্বাচন করার চিন্তাভাবনা করেছিলেন। ঢাকা উত্তরের সাবেক মেয়র প্রয়াত আনিসুল হকের উন্নয়নমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি মেয়র পদে নির্বাচন করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি মনে করেন, সংসদ সদস্যের তুলনায় মেয়র হয়ে এলাকার উন্নয়নে বেশি ভূমিকার সুযোগ বেশি। মূলত এই দুই কারণেই তাপস মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছাপোষণ করেন।
তাপসের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ধানমন্ডি, হাজারীবাগ ও নিউমার্কেট থানার এমন কয়েকজন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনি এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ করতে গিয়ে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন তাপস। এ কারণেই তিনি সিটি নির্বাচনের চিন্তা করেন। বিভিন্ন সময়ে তাপসের দেওয়া বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এই নেতারা জানান, স্থানীয় উন্নয়নের কোনও বরাদ্দই সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে আসে না। এসব উন্নয়নের বরাদ্দ আসে সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে। সিটি মেয়রই সব।
এদিকে, আওয়ামী লীগের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা সিটিতে মেয়র পদে লড়তে আগ্রহী হওয়ায় এর আগে তাপস একাধিকবার বিভিন্ন লোভনীয় পদের প্রস্তাব পেলেও তা গ্রহণ করেননি। তাপস বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভা ও তার পিতা শেখ ফজলুল হক মনির হাতে গড়া সংগঠন যুবলীগের নেতৃত্বের প্রস্তাব পেয়েছিলেন বলে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন। তারা আরও জানান, তাপস রাজি না হওয়ায় শেখ মনির বড় ছেলে ও রাজনীতি থেকে বাইরে থাকা শেখ ফজলে শামস পরশকে যুবলীগের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, ব্যারিস্টার তাপসের মেয়র পদে মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি ঘটা করে মনে হলেও প্রকৃত তথ্য তা নয়। তিনি আগে থেকেই দলের একটি পর্যবেক্ষণে ছিলেন। দল থেকে আকার-ইঙ্গিতে সিটির নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল।
দলের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য ও সদ্য বিদায়ী কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর দুই জন সদস্য অন্তত ৬ মাস আগে বাংলা ট্রিবিউনকে ব্যারিস্টার তাপস ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনার কথা জানান। অবশ্য, তাপস না হলে সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় অপশন হিসেবে ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরীর কথাও তারা বলেছিলেন। ঢাকা দক্ষিণে প্রার্থী পরিবর্তনের জোর সম্ভাবনার কথা জানিয়ে ওই নেতারা বলেছিলেন, ঢাকা দক্ষিণে প্রার্থী হিসেবে শেখ ফজলে নূর তাপসকে ভাবা হচ্ছে। তবে, কোনও কারণে সেটা না হলে সাবের হোসেন চৌধুরীকে নিয়ে চিন্তা করা হবে। ওই নেতারা ঢাকা উত্তরের প্রার্থী পরিবর্তন না হওয়ার আভাসও দিয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শেখ ফজলে নূর তাপস দলের মনোনয়নের আবেদন করার পরই অনেকটা স্পষ্ট হয়ে গেছে, তিনি মনোনয়ন পাচ্ছেন।’ তিনি বলেন, ‘কোনও ধরনের সিগন্যাল না পেয়ে মনোনয়নের আবেদন করার মতো লোক তাপস নন। সিগন্যাল পেয়েছিলেন বলেই তিনি মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন।’
গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচন করার কোনও ইচ্ছা আমার ছিল না। কিন্তু ঢাকার এমপি হিসেবে তিন মেয়াদে কাজ করতে গিয়ে অনুভব করেছি, উন্নয়নমূলক কাজ করতে ঢাকা সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য সংস্থার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করতে হয়। তাই জনগণের ইচ্ছা বা আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে বারবার হতাশ হয়েছি। পুরনো ঢাকাবাসী এখনও ন্যূনতম নাগরিক সেবা পাচ্ছে না। বিষয়টি আমাকে পীড়া দিচ্ছে। তাই আরও বৃহৎ পরিসরে কাজ করার প্রয়োজন থেকেই মেয়র পদে নির্বাচন করার ইচ্ছা পোষণ করি।’
ঢাকা সিটির মেয়র পদে দলের মনোনয়ন বিষয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা বিচার বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করছি। নেত্রী (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) নিজের সোর্স থেকেও খোঁজ নিয়েছেন, গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট নেওয়া হয়েছে। যারা প্রার্থী হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন, তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড, গ্রহণযোগ্যতা, জনপ্রিয়তা যাচাই করে উইনেবল ও ইলেকট্যাবল বিবেচনা করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মনোনয়ন বোর্ড সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘তাপসের ইমেজ ভালো, তিনি যোগ্য ও মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ঢাকাকে একটি আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার চিন্তাভাবনা রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে দলের মনোনয়ন বোর্ড তাকে বেছে নিয়েছে।’
শেখ তাপসকে মেয়র পদে বাছাই করতে আগে থেকে কোনও চিন্তা দলের ছিল কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা দক্ষিণের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ড. রাজ্জাক বলেন, ‘হ্যাঁ ছিল। তিনি সবারই চিন্তার মধ্যে ছিলেন। আর পুরো কমিটি তাকে সমর্থন জানিয়েছে।’
অবশ্য, তাপস আগে থেকেই দলের পছন্দের তালিকায় থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘তাপস আমাদের চেনাজানা। রাজধানীরই একটি আসনে একাধিকবার তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এখনও তিনি এমপি। তাপসসহ যে কয়েকজন মনোনয়ন পেতে আবেদন করেছিলেন, আমরা নগরের নেতাদের কাছ থেকে তাদের তথ্য নিয়েছি। দক্ষিণের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কাছে আমরা জানতে চেয়েছিলাম, যারা আবেদন করেছেন, তাদের মধ্যে কে হলে আপনাদের ভালো হয়? সবাই একবাক্যে জবাব দিয়েছেন, তাপস হলে ভালো হয়। আর আমরা তো এই নির্বাচনে জিততে চাই।’ এজন্যই তাপসকে বেছে নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।








