দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি ঘোষণার পর কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি বেশ কয়েকটি দেশ সফর করেছেন। চীন সফর করে এসেছে আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল। চলতি জুলাইয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারত সফরে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের আরেকটি প্রতিনিধি দল। তারপর দিল্লি সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী নির্বাচনের আগে এটিই হবে তার শেষ ভারত সফর। ফলে এই সফরকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ। এই সফরে দুই দেশের চলমান সম্পর্ক আরও গভীর ও ঘনিষ্ঠ হবে।’
সূত্রমতে, আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের ভারত সফরের দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এই সফর জুলাইয়ের মাঝামাঝি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফর হতে পারে আগামী ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর। ওই সময় জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তার। এই সফরে সম্মেলনের বাইরেও ভারতের নেতৃত্বের সঙ্গে পৃথক বৈঠক হবে এবং তাতে নানা বিষয়ে আলোচনা হবে আওয়ামী লীগ প্রধানের।
দলটির অর্ধ ডজন কেন্দ্রীয় নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন এলেই দেশে কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ বেড়ে যায়। রাজনীতির মাঠ দখলের জন্য তৎপরতা বাড়ায় বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো। এটি এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়ালেও এবারের প্রেক্ষাপট অনেকটা ভিন্নতর। মার্কিন ভিসানীতি এবং পশ্চিমা দেশ ও সংস্থাগুলো আওয়ামী লীগ এবং সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে নানা পন্থা অবলম্বন করছে। এর বিপরীতে সরকারের পক্ষে চীন দৃশ্যমান অবস্থান নিলেও ভারতের তৎপরতা সেভাবে দেখা যাচ্ছে না।
তারা আরও বলেছেন, পশ্চিমারা চাপ বাড়ালেও ভারত ও চীনের সমর্থন আওয়ামী লীগ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষেই থাকবে। বেইজিংয়ের তৎপরতা দৃশ্যমান হলেও দিল্লি গত দুটি জাতীয় নির্বাচনের মতো এবার প্রকাশ্যে সেভাবে তৎপর হয়নি। যদিও ভেতরে বিভিন্ন চ্যানেলে যোগাযোগ ও আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের পর দিল্লির অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যাবে। মূলত এ কারণেই সবার নজর এখন সেদিকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহু পুরোনো। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি আওয়ামী লীগকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তাই আমাদের প্রতিনিধি দল সে দেশে যাবে। দুই দলের সঙ্গে নানান বিষয়ে আলোচনা হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। তারপর আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি সফরে যাবেন। ফলে এই সফরে দুই দেশের চলমান সম্পর্ক আরও বাড়বে।’
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অন্তত তিন জন নেতা বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সে কারণে দেশ দুটির মধ্যে এক ধরনের উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশেরও ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার সঙ্গে। এমনকি নানা প্রতিকূলতায়ও শেখ হাসিনার পাশে থেকেছে দিল্লি। এবার ওয়াশিংটন ঢাকার ওপর ভিসানীতি ঘোষণা করায় পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দিল্লি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। ফলে জুলাইয়ে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল এবং সেপ্টেম্বরে শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের মধ্য দিয়ে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে যাবে। এ জন্য এই সফর দুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দলের সাম্প্রতিক চীন সফর সফল হয়েছে। দেশটির কূটনীতিকদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে তা স্পষ্ট হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকার ও আওয়ামী লীগের প্রতি বেইজিং আস্থাশীল এবং সেটি সমর্থনের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এখন ভারতের দিকে আমাদের নজর।
দিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতায় সম্পৃক্ত আওয়ামী লীগের আরেকজন নেতার মতে, জুলাইয়ে ভারত সফরে যাবে দলের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। এই দলের নেতৃত্ব দিতে পারেন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এরপর সেপ্টেম্বরে দিল্লি সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই দুই সফরে আগামী নির্বাচন নিয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যাবে এবং তা প্রকাশ্যেও আসবে। তবে দেশটির এবারের মনোভাব আগের দুই নির্বাচনের মতো সেভাবে সামনে নাও আসতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দলের পরবর্তী সফরে ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ‘পার্টি টু পার্টি’ আলোচনা হবে। অতীতেও এ ধরনের আলোচনা হয়েছে। তারা এসেছে, আমরাও গেছি। ভারতের জনগণের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত সম্পর্ক রয়েছে।’
আওয়ামী লীগের দিল্লি সফরের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘এই সম্পর্ক রক্তের আকরে লেখা। মুক্তিযুদ্ধে দিল্লির অবদান, নিকট প্রতিবেশী ও বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারত। আমরা আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্ককে বিবেচনা করে থাকি। বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে এই সম্পর্ককে মূল্যায়ন করি এবং আগামীতে এই সম্পর্ক আরও গভীর হবে বলে আমি মনে করি।’
আওয়ামী লীগের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দুই জন সাংগঠনিক সম্পাদক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভারত সফরের আগ পর্যন্ত রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের বর্তমান কৌশল অব্যাহত রাখবে আওয়ামী লীগ। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচি দেখে পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকবেন দলের নেতাকর্মীরা। তবে দিল্লি সফরের পর কর্মকৌশলে পরিবর্তন আসতে পারে, বদলে যেতে পারে কর্মসূচির ধরনও। বিশেষ করে শান্তি সমাবেশ, প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ সমাবেশের বদলে নির্বাচনি জনসভায় যাবে আওয়ামী লীগ। সেটি কতটা বিস্তৃত হবে, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
গত ২৪ মে এক অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মার উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে সেপ্টেম্বরে ভারত সফরে যাবেন। এরমধ্যে আমাদের পার্টি টু পার্টি (বিজেপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে) আলোচনা হবে। সেজন্য ভারতের বিজেপি থেকে আওয়ামী লীগকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আশা করছি আমরা জুলাই মাসে যাবো।’









