X
বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
১৬ ফাল্গুন ১৪৩০
৯ বছরে পাঁচ বার ভাঙনের কবলে বিএনপি জোট

ভাঙা-গড়ার খেলাই তো রাজনীতি: মির্জা ফখরুল

সালমান তারেক শাকিল
১৪ জুলাই ২০২১, ২৩:১০আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২১, ২৩:৪০

‘ভাঙা-গড়ার খেলাই তো রাজনীতি’, ২০ দলীয় জোট থেকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (একাংশ) বেরিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে বলছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘কত ভাঙবে, কত গড়বে— এই ভাঙা গড়ার খেলাই তো রাজনীতি। কিছুদিন আগেও আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতের কলকাতায় দেখা গেলো, এক দলের নেতারা অন্য দলে যোগ দিচ্ছেন। আবার নির্বাচনের পর অন্য দলে। সংসদীয় রাজনীতি ও বুর্জোয়া চরিত্রের দলগুলোতে এটা হয়ে থাকে।’

বুধবার (১৪ জুলাই) রাত ৯টার দিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিলেন মির্জা ফখরুল। এদিন দুপুরে জোটের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একাংশ বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। অভিযোগ, বিএনপি তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করেনি।

বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকারের চাপে পড়েই জোট ছাড়তে হয়েছে জমিয়তকে। বিশেষ করে হেফাজতে ইসলামের ২৬ মার্চের কর্মসূচিকেন্দ্রিক মামলা, গ্রেফতার ও মাদ্রাসা বন্ধ থাকার চাপ থেকেই জোট ত্যাগ করেছে দলটি। একইসঙ্গে জমিয়তের আরেকটি অংশের ওপরেও জোট ছাড়ার চাপ আসতে পারে, এমন ধারণাও করছেন কোনও কোনও নেতা।

২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশন অডিটোরিয়ামে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। পর্যায়ক্রমে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ও সাম্যবাদী দল যোগ দিলে তা ২০ দলীয় জোটে পরিণত হয়। এরপর থেকে এই ৯ বছরে কয়েক দফায় শরিক দলগুলো এই জোট ছেড়ে গেছে। সর্বশেষ বুধবার (১৪ জুলাই) জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একাংশ নানা অভিযোগ এনে জোট ত্যাগ করে। যদিও  অভিযোগের জবাবে জোটের সমন্বয়ক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘তারা তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসে জোট ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছে। এখন বুঝে নেন, কেন তারা জোট ছেড়েছে।’

বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, জোট গঠনের পর থেকে যথাযথ সমন্বয়ের অভাবেই দিনে-দিনে হতাশ হয়ে পড়েছে সবগুলো শরিক দল। বিশেষ করে, চাহিদা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে সমন্বয়হীনতার কারণেই সরকারপক্ষ থেকে শরিকদের আলাদা করা সহজ হচ্ছে। একইসঙ্গে গত নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর এই জোটের শরিকরা আরও বঞ্চিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, জোটের মহাসচিব পর্যায়ে বৈঠক হলেও গুরুত্ব দিয়ে কোনও ইস্যুতেই সক্রিয় হতে পারেনি ২০ দলীয় জোট।

জোটের শরিক একটি দলের সাবেক মহাসচিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তিনটি কারণে মূলত শরিকরা জোট ছাড়ছে। এগুলো হচ্ছে— হতাশা থেকে, কোনও কার্যক্রম না থাকা  ও যোগাযোগহীনতা।’

জোটের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান বুধবার বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জোটের সব সিদ্ধান্ত শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই হয়।’

দলের প্রভাবশালী একজন দায়িত্বশীল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শরিকদের বঞ্চনা হওয়ার কথা রাজনৈতিক নয়, বরং গত নির্বাচনে জিয়া পরিবারের কেউ নির্বাচন না করলেও জোটের সকল শরিক দলের প্রধান, ভারপ্রাপ্ত প্রধানদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। উপরন্তু, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আন্তরিকভাবেই শরিকদের পাশে ছিলেন।

বিএনপি-জোটে প্রথম ভাঙন ঘটে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে। ওই সময় বিএনপি জোটে ভাঙন ধরিয়ে বেরিয়ে যায় শেখ শওকত হোসেন নিলুর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি)। প্রয়াত নীলু ওই সময় অভিযোগ করেছিলেন, ২০ দলের জোটে বিএনপি-জামায়াত সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতো। ওই সময় তার দলের একটি অংশ অবশ্য জোটে থেকে যায়।

গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে জোটের বৈঠক (ফাইল ফটো)

২০১৬ সালের জানুয়ারিতে দীর্ঘদিনের জোটগত সম্পর্ক ত্যাগ করে ইসলামি ঐক্যজোট। ২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর জেবেল রহমান গানির নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাপ ও খন্দকার গোলাম মোর্তুজা নেতৃত্বাধীন এনডিপি বেরিয়ে যায়। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর জোট ত্যাগ করেন বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ। সর্বশেষ আজ  বুধবার জমিয়তের একটি অংশ ছাড়লো বিএনপি-জোট। এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো শরিকহারা হলো বিএনপি।

বিএনপি জোটের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়েছে কয়েকটি দল। দুই ভাগ হয়েছে লেবার পার্টি ও এলডিপি। জামায়াতে ইসলামী থেকে বেরিয়ে একটি অংশ নতুন দল গঠন করে।

দলীয় প্রভাবশালী একাধিক দায়িত্বশীল মনে করছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর ২০ দলীয় জোটের শরিকদের তেমন গুরুত্বই দেয়নি বিএনপি। পাশাপাশি গত একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর জামায়াতসঙ্গ ত্যাগে দলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে জোরেশোরে আলোচনা উঠে। বিশেষত, বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রায় সব সদস্যই জামায়াতকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক কৌশলের পক্ষে মত দেন। এসব নানা বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় জোটগত রাজনীতিকে সামনে আনেনি বিএনপি। তবে, সর্বশেষ জমিয়ত ছেড়ে যাওয়ায় আবারও দলে জোটের রাজনীতি নিয়ে আলাপ উঠতে পারে, এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন এই দায়িত্বশীল।

সূত্রের ভাষ্য, আগামী শনিবার (১৭ জুলাই) বিএনপির স্থায়ী কমিটির নিয়মিত বৈঠকে জোটের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা উঠতে পারে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমি বুঝি প্র্যাকটিক্যালি, রাজনীতিতে নানা দলের সংমিশ্রণ থাকে, নানা দলে নানা মত থাকে। একেক দলের একেক মত। আর এখন বিরোধী দলের ওপর সরকারের যে অত্যাচার চলছে। এই যে তাদের উপরও তো চলছে। হেফাজতের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কতজনকে গ্রেফতার করা হলো। এখন বিরোধী দলে ভাঙন দেখাতে সরকার কত কী করবে। নেতাদের মামলার ভয় দেখিয়ে, গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে এগুলো করা হয়ে থাকে। কিন্তু এসবে কোনও লাভ হবে না।’

প্রসঙ্গত, ১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম এবং ইসলামি ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হককে সঙ্গে নিয়ে চার দলীয় জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপর ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল কলেবর বেড়ে ১৮ দলীয় জোট হয়।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
প্রতিবেদন নিয়ে বিতর্ক, তদন্ত করবে উচ্চতর কমিটি
ভিকারুনিসায় যৌন হয়রানি:প্রতিবেদন নিয়ে বিতর্ক, তদন্ত করবে উচ্চতর কমিটি
রাজধানীর বেরাইদে বাবা- ছেলের মরদেহ উদ্ধার
রাজধানীর বেরাইদে বাবা- ছেলের মরদেহ উদ্ধার
ভারতে এক ট্রেনে আগুন আতঙ্ক, অন্য ট্রেনের নীচে কাটা পড়ে দুইজন নিহত
ভারতে এক ট্রেনে আগুন আতঙ্ক, অন্য ট্রেনের নীচে কাটা পড়ে দুইজন নিহত
সাকিব-তামিম ভুয়া হলে আমাদের মাটির ভেতরে ঢুকে যাওয়া উচিত: মুশফিক
সাকিব-তামিম ভুয়া হলে আমাদের মাটির ভেতরে ঢুকে যাওয়া উচিত: মুশফিক
সর্বাধিক পঠিত
শবে বরাত নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য: সেই ইসলামি বক্তার বিরুদ্ধে আরেক মামলা
শবে বরাত নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য: সেই ইসলামি বক্তার বিরুদ্ধে আরেক মামলা
রমজানে সরকারি অফিসের নতুন সময়সূচি ঘোষণা
রমজানে সরকারি অফিসের নতুন সময়সূচি ঘোষণা
ভর্তি পরীক্ষার খাতার নিচে মোবাইল রেখে গুগল থেকে উত্তর লিখছিলেন শিক্ষার্থী
ভর্তি পরীক্ষার খাতার নিচে মোবাইল রেখে গুগল থেকে উত্তর লিখছিলেন শিক্ষার্থী
রমজানে বড় ইফতার পার্টি করা যাবে না
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনারমজানে বড় ইফতার পার্টি করা যাবে না
পাহাড়ের বুক চিরে ৫২ বছরের কষ্ট চাপা দেবেন তারা
পাহাড়ের বুক চিরে ৫২ বছরের কষ্ট চাপা দেবেন তারা