আমানের আচরণে বিরোধীদের সন্দেহ

আন্দোলনের নতুন সমীকরণে বিএনপি

সালমান তারেক শাকিল
২৯ জুলাই ২০২৩, ২৩:৩৮আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৩, ১০:৫৭

সরকার পতনের এক দফা দাবিতে বিএনপির চলমান আন্দোলন আগের চেয়ে তুঙ্গে। এ অবস্থায় আবারও জেলা পর্যায়ে কর্মসূচি দিয়েছে দলটি। এর মধ্য দিয়ে নতুন করে সারা দেশের তৃণমূল পর্যায় থেকে আন্দোলন গুছিয়ে আনার পরে ঢাকাকেন্দ্রিক কর্মসূচি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। শনিবার (২৯ জুলাই) রাজধানীতে ‘শান্তিপূর্ণ অবস্থান’ কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা, নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও আটক হওয়ার মধ্য দিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এমন চিন্তাভাবনা চূড়ান্ত করেছে বিএনপি।

পাশাপাশি নতুন এই কর্মসূচির বিষয়ে যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত কোনও দল বা জোটের সঙ্গেই কোনোধরনের আলোচনা করেনি বিএনপি। আবার শনিবার গাবতলীতে বিএনপি নেতা আমানউল্লাহ আমানের হঠাৎ অসুস্থতার খবরেও ‘সন্দেহ’ ছড়িয়ে পড়েছে বিরোধী দলগুলোর নেতাদের মধ্যে। তারা বলছেন, শনিবার গাবতলীতে বড় জমায়েতের পরিকল্পনা ছিল। আর সেই কর্মসূচিতে গিয়ে আমানউল্লাহ আমান অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কিন্তু সেখানে যত সংখ্যক নেতাকর্মীর জমায়েত হওয়ার কথা ছিল, তাও হয়নি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সূত্রগুলো বলছে, গতকাল শুক্রবার (২৮ জুলাই) মহাসমাবেশের পর শনিবার ঢাকার প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচি পুলিশের বাধায় পণ্ড হওয়ায় আন্দোলন থেকে ‘রিট্রিট’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। আন্দোলনের ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিস্থিতি খুব স্বাভাবিক বলেও দাবি করছেন নেতারা।

দলের নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখেন, এমন একাধিক নেতার ভাষ্য, আমরা আবারও আন্দোলন সাজিয়ে আনবো। এরপর আবার ঢাকাকেন্দ্রিক প্রোগ্রাম আসবে।

তবে গণতন্ত্র মঞ্চ ও ১২-দলীয় জোটের নেতারা বলছেন, বিএনপি শনিবারের কর্মসূচি দিয়েছে কোনও ধরনের আলোচনা ছাড়াই। আজ শনিবারও আগামী সোমবারের নতুন কর্মসূচি নিয়ে বিএনপির তরফ থেকে কোনও দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি।

মঞ্চের প্রভাবশালী এক নেতা বলেন, ‘বিএনপিকে আজ বেদিশা, অস্থির মনে হয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতি হলে কী করণীয়, তা তো আগেই ঠিক রাখার কথা। কিন্তু কোনও হিসাবের মধ্যেই ছিল না।’

আমানউল্লাহর বিষয়ে মঞ্চের আরেক নেতা বলেন, শনিবারের প্রোগ্রামে ক্যাজুয়ালিটি (আহত-নিহত) কেমন হবে, এটা বিএনপির জানার কথা। কিন্তু তারা কোনও পূর্বপরিকল্পনা করেনি। এ ছাড়া আমানউল্লাহ আমানের আচরণ সন্দেহজনক।

মঞ্চ ও জোটের নেতাদের দাবি, গত বছরের ১০ ডিসেম্বর আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখনও আমানের এক বক্তব্যে (১০ ডিসেম্বরের পর খালেদা জিয়ার কথায় দেশ চলবে) পুরো পরিস্থিতি নষ্ট হয়ে যায়। আজ গাবতলীতে বড় সমাবেশ করার কথা, অথচ সেখানে কোনও প্রস্তুতি রাখেনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি। এগুলো কি পূর্বপরিকল্পিত?

এ বিষয়ে কথা বলতে আমানউল্লাহ আমানকে ফোন করা হলেও তার পক্ষ থেকে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

গণতন্ত্র মঞ্চের প্রভাবশালী এক নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপির আচরণ বলছে আবার আন্দোলন রি-অ্যারেঞ্জ করবে। যেখানে অলআউট কর্মসূচি পালনের কথা ছিল রবিবার, সেখানে আবার নতুন করে মুভমেন্ট গড়ে তুলতে হবে। বিএনপি হয়তো নানা হিসাব-নিকাশ করে জেলা পর্যায়ে শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে।’

এই পরিস্থিতিতে আবারও গণতন্ত্র মঞ্চ যুগপতের বাইরে কর্মসূচির দেওয়ার কথা চিন্তাভাবনা করছে। শনিবার রাতে অনুষ্ঠিত মঞ্চের বৈঠকে রবিবার (৩০ জুলাই) সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ বিষয়ে মঞ্চের সমন্বয়ক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিদ্যমান ঘটনায় মনে হচ্ছে সময়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হয়তো নতুন সমীকরণের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শনিবার রাজধানীতে স্বৈরাচারী সরকার আমাদের ওপর অস্ত্র দিয়ে বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছে। দেশের মানুষকে নির্যাতন করেছে। এসব নির্যাতনে গণ-আন্দোলন থেমে থাকে না। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, অতীতে যত আন্দোলন হয়েছে; এ রকমই হয়েছে। যখন সব মানুষ নেমে পড়বে, তখন শান্তিপূর্ণভাবে আমরা আন্দোলনে বিজয়ের দিকে যাবো।’

বিএনপি নেতা আমানউল্লাহ আমানের হাতে প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো খাবার তুলে দিচ্ছেন গাজী হাফিজুর রহমান (লিকু)

কর্মসূচিতে ছিলেন না বিএনপির জ্যেষ্ঠ অনেক নেতা

১২-দলীয় জোটের একাধিক নেতা মনে করছেন, বিএনপিকে ভিসানীতি নিয়েও সতর্ক থাকতে হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মসূচি যেন সহিংসতাপ্রবণ না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ভিসানীতির সমস্যার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বিএনপি।

জোটের কোনও কোনও নেতার মত, শুক্রবার মহাসমাবেশের পর রবিবার কর্মসূচি দেওয়ার কথা ছিল। সেখান থেকে সরে এসে শনিবারেই ঢাকার প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচি দেয়। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে মহাসমাবেশে নেতারা ঢাকায় অবস্থান করার নির্দেশ দিলেও, পরে কার্যকর কোনও পরিকল্পনা হয়নি। এ অবস্থার কারণে শনিবার বিক্ষোভে জমায়েত ছিল কম।

গণতন্ত্র মঞ্চ ও জোটের নেতারা অভিযোগ করে বলেন, ঢাকার প্রবেশমুখে কর্মসূচি বাস্তবায়নে শুক্রবার রাতে ডিএমপির নিষেধাজ্ঞার পর কোনও পরিকল্পনার কথা জানানো হয়নি। উপরন্তু বিএনপির পরিচিত অনেক মুখকেই দেখা যায়নি কর্মসূচিতে। কর্মসূচিতে অতিথি হিসেবে থাকার কথা থাকলেও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ড. আবদুল মঈন খান উপস্থিত হতে পারেননি। দেখা যায়নি বরকত উল্লাহ বুলু, জয়নাল আবেদীন, বিপি জয়নাল, মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ অনেককেই।

মঞ্চের এক নেতার ভাষ্য, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী রবিবার (৩০ জুলাই) সচিবালয়ের চারদিকে শান্তিপূর্ণ ঘেরাও কর্মসূচি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঢাকার প্রবেশমুখের কর্মসূচি ডেকে জনশক্তিকে চারটি ভাগে বিভক্ত করা হলো। তবে সোমবার জেলা পর্যায়ে জনসমাবেশের মধ্য দিয়ে আবারও নতুন কর্মসূচি আসবে ঢাকাকেন্দ্রিক, এমনটি মনে করছেন জোট ও মঞ্চের নেতারা।

১২-দলীয় জোটের অন্যতম নেতা শাহাদাত হোসেন সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মুভমেন্ট কোন দিকে যাবে, তা স্পষ্ট। মাঠ এখন এক দফা আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত। নেতাকর্মীদের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। আজকের আন্দোলন অবশ্যই যৌক্তিক পরিণতির দিকে যাবে।’

শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির সিদ্ধান্ত বিএনপির

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সরকারি ও সরকার-দলীয় বাহিনীর বেআইনি ও সন্ত্রাসী তৎপরতার জবাব দেওয়ার ক্ষমতা জনগণের রয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগের ফলে যে মর্মান্তিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো, আমরা তা বরাবরই পরিহার করতে চেয়েছি এবং আজও করেছি। এটা আমাদের দুর্বলতা নয়, জনগণ ও গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতা।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বলছেন, বিএনপি শুরু থেকেই শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে আন্দোলন তুঙ্গে নিয়ে এসেছে। শনিবার অবস্থানকে কেন্দ্র করে যেসব ভাঙচুর, বাসে অগ্নিসংযোগ হয়েছে, তা যেন আগামী দিনে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে অনুসারীদের।

এ প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা জেনেছি যে মাতুয়াইল ও শ্যামলীতে গাড়িতে আগুন দেয়া ও ভাঙচুরের ঘটনার জন্য বিএনপিকে দায়ী করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। অথচ পত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সুস্পষ্ট প্রমাণ দিয়ে খবর বেরিয়েছে যে পুলিশের সামনেই এসব ঘটনা ঘটিয়ে ভিডিও করে অপরাধীরা নির্বিঘ্নে চলে গেছে। কারা এটা করতে পারে, তা অনুমানের জন্য বেশি বুদ্ধিমান হওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজেরা অপরাধ করে বিএনপির ওপর দোষ চাপানোর অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকার জন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দিচ্ছি।’

তবে কোনও কোনও নেতা দাবি করেছেন, যেভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বিএনপির অনুসারীরা চড়াও হয়েছে, এতে কর্মীরা চাঙাবোধ করছে।

আরও পড়ুন:

বিএনপি নেতা আমানকে ফল ও দুপুরের খাবার পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী

সকালে মারধরের শিকার গয়েশ্বর, দুপুরে আপ্যায়ন করালো ডিবি

/এনএআর/
সম্পর্কিত
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সব দলকে তাদের কর্মকাণ্ড করতে দিতে চাই, মানুষ ঠিক করবে তারা কাকে চায়: মির্জা ফখরুল
প্রশিক্ষণে চীন যাচ্ছেন ছাত্রদল-যুবদল নেতাসহ তরুণ প্রতিনিধিরা
সর্বশেষ খবর
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যা বললেন আরাঘচি
কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যা বললেন আরাঘচি
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম