সাত মার্চে রেসকোর্সে তিন তরুণ

সালমান তারেক শাকিল
০৭ মার্চ ২০২৪, ১০:০০ আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৪, ১০:৫৫

৭ মার্চ, ১৯৭১। দুপুরের মধ্যেই জনসমাগমে টইটুম্বুর ময়দান। রাজধানীর রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ভাষণের দিন। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মৌলিক পথ-নির্দেশনা আসে যে ভাষণ থেকে। ঐতিহাসিক এই দিবসে সেখানে ছিলেন তিন তরুণ— যারা এখন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চে রেসকোর্সে উপস্থিত সেই তিন তরুণ হচ্ছেন— মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলছেন, ‘তাদের তিন জনের মুখ থেকেই শুনেছেন, তারা ৭ মার্চ রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য শুনেছেন, সেখানে ছিলেন।’

৭ মার্চ নিয়ে বিএনপি নেতারা প্রতি বছরই সমালোচনামুখর হন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা, ‘জনগণ কোনও নির্দেশনা ছাড়াই ময়দান ত্যাগ করেছে’— এমন প্রভৃতি ব্যাখ্যা দেন দলটির সিনিয়র নেতারা।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজের লেখায় জানান, `১ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।’

‘৭ মার্চ দুপুরে জনসভা। মানুষে জনসভাস্থল কানায় কানায় ভর্তি’ বলছিলেন ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্সে উপস্থিত থাকা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তার ভাষ্য, ‘সবার আশা আজ স্বাধীনতার ঘোষণা আসবে। শেখ মুজিবুর সাহেব বক্তব্য শুরু করলেন। ওনার প্রতিটা বাক্যে জনগণ উত্তেজিত— এই বুঝি স্বাধীনতার ঘোষণা আসবে। কিন্তু ভাষণে যে স্বাধীনতার ঘোষণাটা, সেটি সেদিন জনগণ পায়নি।’

বুধবার (৬ মার্চ) বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আমার জীবনে যত বক্তৃতা শুনেছি, শেখ সাহেবের ৭ মার্চের বক্তব্যটি সেরা। কিন্তু এটি স্বাধীনতার বক্তব্য নয়। আমি স্বাধীনতা সংগ্রামে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকাকে ছোট করি না। কিন্তু সত্য কী।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য যোগ করেন, ‘৭ মার্চের পরদিন ৮ মার্চ আওয়ামী লীগ থেকে প্রেসনোট দেওয়া হলো। সেই প্রেসনোটে তাজউদ্দিন সাহেব স্বাক্ষর করলেন। সেখানে বলা হলো— বাঙালির অধিকার আদায়ের জন্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ক্ষমতায় আসার জন্য এই ভাষণ (৭ মার্চ ভাষণ) দেওয়া হয়েছে। তাহলে সেটা যে স্বাধীনতার ঘোষণা না, আওয়ামী লীগের সেই প্রেসনোটো বোঝা গেলো।’

‘ভাষণের শেষে শেখ সাহেব বললেন, ‘জয় পাকিস্তান।’ বলেন ইকবাল হাসান মাহমুদ।

প্রসঙ্গক্রমে মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের সঙ্গে কথা বলা যায়নি।

মির্জা আব্বাসকে উদ্ধৃত করে বিএনপির মিডিয়া কর্মকর্তা শায়রুল কবির বলেন, ‘মির্জা আব্বাস প্রায়শই বলতেন—স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে মানুষের কীই-না প্রত্যাশা ছিল ৭ মার্চে, কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।’

যদিও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার নিজের লেখায় জানাচ্ছেন— ‘ওই বছরের ১ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।’ একইসঙ্গে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ‘সবুজ সঙ্কেত’ ও ‘নতুন দিগন্তের সূচনা’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর দৈনিক বাংলায় প্রথম প্রকাশিত ‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক নিবন্ধে জিয়াউর রহমান লিখছেন, ‘তারপর এলো ১ মার্চ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদাত্ত আহবানে সারাদেশে শুরু হলো ব্যাপক অসহযোগ আন্দোলন । এর পরদিন দাংগা হলো। বিহারীরা হামলা করেছিল এক শান্তিপূর্ণ মিছিলে।’

একই নিবন্ধে জিয়াউর রহমান উল্লেখ করেন, ‘৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক গ্রীন-সিগন্যাল বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম। কিন্তু তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে তা জানালাম না। বাঙালি ও পাকিস্তানি সেনাদের মাঝেও উত্তেজনা ক্রমেই চরমে উঠেছিল।’

‘১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক-বুদ্ধিজীবীদের আশ্রয় ও পরামর্শস্থল ছিল রাউজানের নূতনচন্দ্রের কু-ণ্ডেশ্বরী কমপ্লেক্স। প্রবীণ রাজনীতিক আবদুল্লাহ আল নোমানের গ্রামের বাড়ির পাশে এই কমপ্লেক্স। তিনি জানান, ‘তৎকালীন অনেক রাজনীতিকেরই যাতায়াত ছিল সেখানে।’

‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি’ শীর্ষক একটি নিবন্ধে বিএনপির অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান লিখেন, ‘জিয়া অনেক দূরদৃষ্টি-সম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তা না হলে তিনি ৭ মার্চের শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের প্রতিক্রিয়া দিতেন না। ভাষণে জিয়া বলেছিলেন, ‘ভাষণ যখন শুনেছিলাম, তখন বুঝলাম— নতুন দিগন্তে আমরা যাত্রা করছি।’

দলীয়ভাবে বিএনপিও প্রথমবারের মতো ৭ মার্চ পালন করেছে ২০২১ সালে। স্বাধীনতার ‍সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বিএনপির বছরব্যাপী অনুষ্ঠিত প্রোগ্রামগুলোর মধ্যে ওই বছরের ৭ মার্চ ছিল  আলোচনা সভা।

দলের মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, ‘বিএন‌পি, স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তী উদযাপন জাতীয় কমিটির উদ্যো‌গে ২০২১ সালে ‘৭ মার্চ উপলক্ষে আলোচনা সভা’ শীর্ষক অনুষ্ঠান হয়। স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে ওই সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বক্তব্য দেন।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
দুপুরে রাজশাহী আসছেন প্রধানমন্ত্রী, নজরদারিতে ৪০০ ক্যামেরা
পদ দেওয়ার কথা বলে টাকা-খাসি নেওয়ার অভিযোগ, বিএনপি নেতার অডিও ফাঁস
পদ্মা ব্যারাজ থেকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, প্রধানমন্ত্রীর কাছে যত প্রত্যাশা রাজশাহীবাসীর
সর্বশেষ খবর
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ৯ দেশে আঘাতের হুমকি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ৯ দেশে আঘাতের হুমকি ইরানের
গর্ব করে বলতে পারি, আমার দলের কোনও কর্মী চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়: আইনমন্ত্রী
গর্ব করে বলতে পারি, আমার দলের কোনও কর্মী চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়: আইনমন্ত্রী
দিল্লিতে রাবণ বধ করবেন ইয়ামি, বার্তা দেবেন নারীশক্তির
দিল্লিতে রাবণ বধ করবেন ইয়ামি, বার্তা দেবেন নারীশক্তির
জলরাশির গর্জনময় সৌন্দর্যে মুগ্ধতার অনন্য জগৎ ইগুয়াজু জলপ্রপাত
জলরাশির গর্জনময় সৌন্দর্যে মুগ্ধতার অনন্য জগৎ ইগুয়াজু জলপ্রপাত
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন