নির্বাচনি বোঝাপড়ায় বিএনপি, আগে সনদের সমাধান চায় এনসিপি

সালমান তারেক শাকিল
২৪ অক্টোবর ২০২৫, ২২:০০আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৫, ২৩:০০

রাজনৈতিক আলোচনায় দৃশ্যত বিএনপি ও এনসিপির নেতারা বিরোধমুখর হলেও পর্দার আড়ালে দুপক্ষের মধ্যে চলছে বোঝাপড়া তৈরির কাজ। অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে আলাপ চলছে। এই আলাপে এনসিপির পক্ষ থেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট নিয়ে আগে সমাধান করার পক্ষে অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।

যদিও বিএনপি চায় নির্বাচনি সমঝোতার পথ সমাধান করতে। ইতোমধ্যে গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে নির্বাচনি আলোচনা শুরু করেছে দলটি। এর সঙ্গে এনসিপি কতগুলো আসনে বিএনপির সমর্থন পাবে—এ নিয়ে দলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। বিএনপি ও এনসিপির প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বিএনপির প্রভাবশালী একটি সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করাকে কেন্দ্র করে নির্বাচনি সমঝোতা আটকে আছে। বিশেষ করে বিএনপি, গণতন্ত্র মঞ্চ, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে অর্থবহ সমঝোতা না হলে নির্বাচন ও সনদ কার্যকরের ক্ষেত্রে নানামুখী সংকট তৈরি হতে পারে। এই সংকটের রেশ নির্বাচনের সময়সীমাকেও প্রভাবিত করতে পারে বলে ধারণা করছে সূত্র।

ইতোমধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট দেওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হলেও কবে ভোট হবে, এ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত ও এনসিপির বিরোধ রয়েছে। জামায়াত ইতোমধ্যে নভেম্বরের মধ্যে গণভোট চেয়েছে। যদিও বিএনপি চায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়ে সরকার-প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার দেশীয়-আন্তর্জাতিক শুভাকাঙ্ক্ষীরা শক্ত অবস্থানে আছেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর চাপ তৈরি করার জন্য নির্বাচনের আগে গণভোটের পক্ষে সরকার। এরপর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতি নজর এই সরকারের। এক্ষেত্রে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপিকে আস্থায় রেখে এই উদ্যোগগুলো সম্পন্ন করার পক্ষে সরকার ও তার বন্ধুপক্ষগুলো।

গত রবিবার (১৯ অক্টোবর) কমিশনের একজন সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিএনপির পক্ষ থেকে নোট অব ডিসেন্ট উল্লেখপূর্বক গণভোট করার কথা বলা হয়েছে। এটা মেনে নিলে তো সনদের আর দরকার হয় না। সংসদের উচ্চকক্ষে ভোটের আনুপাতিক হারে প্রার্থী মনোনয়নের পক্ষে সবাই অবস্থান নিলেও বিএনপির অবস্থান নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্য হওয়ার ভিত্তিতে। ফলে, আবারও ব্যক্তিস্বার্থে সংবিধান কাটাছেঁড়ার শঙ্কা থেকে যায়। বিশেষ করে শেখ হাসিনার সরকার যেভাবে ব্যক্তিস্বার্থে সংবিধানকে ব্যবহার করেছে, সনদের পরেও এই আশঙ্কাই থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে সরকারপ্রধান ও দেশি-বিদেশি শক্তিগুলো গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে।’’

জুলাই জাতীয় সনদ তৈরিতে ৩৩টি দলের মতামত নেওয়া হলেও ২৫টি দল সই করেছে। বাকি বামপন্থি বেশ কয়েকটি দল সনদে সই করেনি। এনসিপি এখনও সই না করলেও শিগগিরই তা সম্ভব হবে বলে দলটির নেতারা বলছেন। এখানে লক্ষণীয়, জুলাই সনদে দেশের একটি বড় অংশের রাজনৈতিক শক্তিকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ বাম, ডান ও প্রগতিশীল দলগুলোর একটি বড় অংশকে ‘ফ্যাসিস্টদের’ দোসর হিসেবে বিবেচনা করে তাদের মতামত নেওয়া হয়নি।

বিএনপির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ একজন দায়িত্বশীল এই বিষয়টিকে যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন, বিএনপি সংসদে গিয়ে জুলাই সনদ কার্যকর করার পক্ষে। কেবল গণভোটের মাধ্যমে ম্যান্ডেট নেওয়া হলে তা একপাক্ষিক চাপ তৈরি করবে। এ কারণে বিএনপি গণভোটে একমত হলেও তা কার্যকরের পক্ষে জোরালো অবস্থানে যেতে এখনই রাজি নয়।

এই বিরোধিতার মধ্যে এনসিপির সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতার আলোচনা শুরু করেছে বিএনপি। ইতোমধ্যে গুলশানে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকও হয়েছে বলে শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) বিএনপি ও এনসিপির নির্ভরযোগ্য একাধিক নেতা উল্লেখ করেন।

এনসিপির সিনিয়র একজন নেতা উল্লেখ করেন, যেকোনও বৈঠক হলেই বিএনপি ও জামায়াতপন্থি মিডিয়ায় বিভিন্ন ‘ন্যারেটিভ’ তৈরির জন্য নিজেদের কৌশল অনুযায়ী খবর তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলীয় স্বার্থনির্ভর প্রচারণা তৈরিতে আসন বণ্টন, জোট গঠনের বিষয় ছড়ানো হচ্ছে। মূলত কার্যকরভাবে আসন বণ্টন বা জোট নিয়ে কোনও আলোচনা হচ্ছে না।

এনসিপির পক্ষ থেকে অন্তত ১৫টি আসনে বিএনপির সমর্থন চাওয়া হলেও বিএনপির নীতিনির্ধারকরা অন্তত ৬-৭টি আসনে তরুণদের এই দলটিকে সমর্থন দিতে চায়। এ বিষয়ে শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় এনসিপির প্রভাবশালী একজন নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এনসিপি নির্বাচনি আলাপে সক্রিয় হবে জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির স্পষ্ট অবস্থান পেলে। এখনও অনানুষ্ঠানিক আলাপ চলছে বিভিন্ন মাধ্যমে। আমরা চাই আগে সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কী হবে, এরপরই আমরা নির্বাচনি আলোচনায় যেতে চাই।’’

আসনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, এখনও আসন নিয়ে চূড়ান্ত কোনও চাওয়া-পাওয়ার আলাপ হয়নি। কারণ, এনসিপির নিজেদের দলীয় সিদ্ধান্ত রয়েছে। প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের জটিলতা এখনও শেষ হয়নি।’’

জানতে চাইলে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক ভাবনা জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে, সনদের আইনি ভিত্তি, দলের প্রতীক নিয়ে মূলত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করেছে এনসিপি। সেই আলোচনার জায়গা থেকে অন্য দলগুলো নানামুখী জোট হিসেবে প্রচার করছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এনসিপি কারও সঙ্গে কোনও জোট গঠন বা সমঝোতার বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি।’’

এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব (মিডিয়া) মুশফিক উস সালেহীনের ভাষ্য, ‘এখন সবচেয়ে বড় প্রায়োরিটি জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া। সনদের নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে যেসব বিষয় সুষ্ঠুভাবে সুরাহা হয়নি, সে বিষয়গুলোকে জোর দিচ্ছি। এখনও জোট গঠন বা আসন বণ্টন এসব আলোচনায় আমরা নেই।’’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদু টুকু বলেন, ‘‘এনসিপির সঙ্গে নির্বাচনি কোনও আলোচনার বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে যারা যুগপৎ আন্দোলনে ছিল, তাদের সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে।’’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সূত্র জানায়, গণতন্ত্র মঞ্চকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বিএনপি। আসন দেওয়ার ক্ষেত্রে উদারতার পরিচয় না দিলেও পরিস্থিতি ও বাস্তবতা অনুযায়ী মঞ্চকে সঙ্গে রাখবে বিএনপি। ইতোমধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে গণতন্ত্র মঞ্চের আসন নিয়ে আলাপ করছেন। দলের মনোনয়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে যুগপৎ ধারার দলগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করবে বিএনপি। এ নিয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

জানতে চাইলে গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নির্বাচন নিয়ে, আসন বণ্টন নিয়ে যুগপৎ ধারায় গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বিএনপির আলোচনা চলমান আছে।’’

বিএনপির একজন প্রভাবশালী দায়িত্বশীল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, গণতন্ত্র মঞ্চ, এনসিপিসহ অন্যান্য দলের সঙ্গে আসন নিয়ে বিএনপি আন্তরিক। জুলাই সনদের বিষয়টি সমাধানের পথ ধরেই নির্বাচনি সমঝোতার পথ এগোবে বলে জানান তিনি।

তবে কোনও কোনও রাজনৈতিক সূত্র, নির্বাচনি সমঝোতায় বিএনপির সঙ্গে জামায়াতও যুক্ত হতে চায় বলে দাবি করছে। শেষ মুহূর্তে নির্বাচনি সমঝোতায় জামায়াতকে বিএনপি সঙ্গে নেবে, এমন সন্দেহ রয়েছে অনেকের।

জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ‘‘ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে আমরা কাজ করছি। আমাদের বোঝাপড়া অব্যাহত থাকবে। কিন্তু বিএনপির সঙ্গে জোট বা এ ধরনের কোনও আলোচনা তো নেই।’’

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
কেন্দ্র ও তৃণমূলের মাঝে দূরত্ব বাড়ছে বিএনপিতে?
সব দলকে রাজনীতি করতে দিতে চায় বিএনপি, এর মধ্যে আ.লীগ কি আছে?
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
সর্বশেষ খবর
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
পদোন্নতি না পাওয়ায় পদত্যাগ করলেন সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান 
পদোন্নতি না পাওয়ায় পদত্যাগ করলেন সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান 
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি, কমেছে তাপমাত্রা 
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি, কমেছে তাপমাত্রা 
কারামুক্ত স্বামীকে জড়িয়ে কাঁদলেন স্ত্রী, আবার ধরে নিয়ে গেলো ডিবি পুলিশ
কারামুক্ত স্বামীকে জড়িয়ে কাঁদলেন স্ত্রী, আবার ধরে নিয়ে গেলো ডিবি পুলিশ
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি