ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিগত অধিবেশনগুলোতে মোটামুটি স্বাভাবিক আচরণ করলেও বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে বেশ আক্রমণাত্মক ভূমিকায় দেখা গেছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতসহ তাদের মিত্র দলগুলোকে। ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদ সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মন্তব্যকে ঘিরে মারমুখী আচরণ করেন তারা। এ সময় দুপক্ষের হইচই ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ অধিবেশন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে। প্রথমদিকে তিনি দুপক্ষকেই নিবৃত্ত করতে কিছুটা সমর্থ হলেও ‘পরিপূর্ণ সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে সরকার আংশিক সংস্কার করতে চাইছে’, এমন অভিযোগ এনে শেষ পর্যন্ত সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। সংসদ থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের কাছে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন সংসদীয় বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা।
হঠাৎ বিরোধী দলের এমন কঠোর অবস্থানের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাড় না দেওয়ার মানসিকতাই কি তাদের এমনটি করতে বাধ্য করেছে, নাকি লং মার্চসহ ঢাকায় মহাসমাবেশ সামনে রেখে আন্দোলন চাঙা করার কৌশল—সে প্রশ্নও সামনে আসছে। আবার অনেকে মনে করেন, গণমাধ্যমের আনুকূল্য পাওয়ার জন্যও তারা এমনটি করতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিবিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সংসদে বিরোধী দলের নামে যাদের কথা বলা হচ্ছে, প্রথম দিন থেকে তারা কোনও দায়িত্বশীল আচরণ করছে বলে দেশের সচেতন মানুষ মনে করে না। অবশ্য ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তো তাদের কোনও পার্থক্য নেই। নির্বাচনের আগে এরা তো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্ষমতা উপভোগ করেছে। তাই এ সময়ে এই ধরনের বিরোধিতা মিডিয়ার দৃষ্টি পাওয়া, আর মাঠ গরম রাখা ছাড়া নতুন কিছু নয়।’’
সংসদে কী ঘটেছিল?
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দুটি মন্তব্যকে ঘিরেই মূলত তীব্র আপত্তি তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
জামায়াত থেকে নির্বাচিত পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে প্রথমে বলেন, দেশে প্রকাশ্যে ছিনতাই ও সংসদ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটলেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো এমপির লোকজনকে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। পরে একই দলের আরেক সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ঢাকা কলেজে ছাত্রদল ও যুবদলের সংঘর্ষের ঘটনায় তাকে আসামি করা হয়েছে। এরপর এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ জ্বালানি সংকট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘কোথায় কী ঘটেছে তা সুনির্দিষ্ট না করে পল্টনের মতো ভাষণ দেওয়া হচ্ছে।’’
তার এ মন্তব্যের পরপরই দাঁড়িয়ে পড়েন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিুকুর রহমান। এ সময় দুপক্ষের সদস্যরাই হইচই শুরু করেন। এরপর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে থাকেন বিরোধীদলীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ডা. শফিকের অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুরু থেকেই বিরোধী দলকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি সংসদে আমাদের শিক্ষক হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করেন। আমরা তার ছাত্র হওয়ার জন্য আসিনি। অপরদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী দলের বিরুদ্ধে বাকস্বাধীনতা হরণের অভিযোগ আনেন। তখন স্পিকারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।
পরবর্তীকালে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল সংসদে উত্থাপনের প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। ওয়াকআউটের পর বিরোধীদলীয় নেতা সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘গণভোটের রায় মানা তো হয়নি। উল্টো ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি ল্যাপস করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন—এ মৌলিক বিষয়গুলো ছিল। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে, সেগুলো আস্তে আস্তে বিভিন্ন কায়দায় সরকারি দল এখানে নিয়ে আসছে।’’ যদিও সরকারি দলের দাবি, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলটির ক্ষেত্রে তারা জুলাই সনদের আলোকেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
আত্মপরিচয় প্রমাণের চেষ্টা?
সংসদে বিরোধী দলের হঠাৎ মারমুখী আচরণকে ভিন্নভাবে দেখছেন রাজনীতিক ও বিশ্লেষকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, আসলে বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াত যখন তাদেরই বিপক্ষে বিরোধী দল, তখন বিষয়টিকে অনেকে এক ধরনের সমঝোতার সংসদ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে দুইপক্ষের দহররম-মহররম সম্পর্ক এবং সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজেদের মনোনীত প্রার্থীকে হারিয়ে বিজয়ী হওয়া মির্জা ফখরুলকে জড়িয়ে ধরে দলটির আমিরের উচ্ছ্বাস প্রকাশসহ বিভিন্ন কারণেই এমন ধারণা আরও আর শক্তভিত্তি পেয়েছে বলে তার ধারণা। এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জামায়াতকে দেশের বেশিরভাগ মানুষ প্রকৃত বিরোধী দল মনে করে না। কারণ দীর্ঘদিন তারা বিএনপির সঙ্গে ঘর-সংসার করেছে। বিএনপি জোট ভেঙে না দিলে হয়তো তারা এতদিন দলটির সঙ্গেই থাকতো। সরকারের অর্থনৈতিক অনেক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও দুই দল একমত। বিশেষ করে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি ও মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রেও বর্তমান বিরোধী দল সরকারের কোনও বিরোধিতা করেনি।’’
তিনি বলেন, ‘‘সরকারের বিভিন্ন নীতির সঙ্গে বিরোধী দলের মিল রয়েছে। এসব কারণে তাদের আচরণ স্ববিরোধী বলে মনে করেন অনেকে। অন্যদিকে তারা নিজেদের সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। তাই এই সময়ে তারা সরকারের বিরুদ্ধে এতটা কঠোর হচ্ছে মূলত নিজেদের আত্মপরিচয় প্রমাণের জন্য। আমরা মনে করি, বিরোধী দল তার জায়গায় নিজস্ব অবস্থান নিতেই পারে। সেক্ষেত্রে সামনে হয়তো তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারবে।’’
অপরদিকে বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আসলে বিরোধী দল নিজেদের সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। তাই সমালোচনার মুখে তারা নিজেদের অবস্থান জাহির করতে চায়। এ কারণেই এই সময়ে এসে দৃষ্টিকটু আচরণ করছে।’’
রাজপথের আন্দোলন জোরদারের কৌশল?
সংসদে বিরোধী দলের কঠোর অবস্থানের বিষয়টিকে একেকজন একেকভাবে মূল্যায়ন করেন। অনেকে মনে করেন, সামনে রাজপথে দলটির বড় ধরনের কর্মসূচিকে ঘিরে সংসদ থেকেই জনদৃষ্টি সেদিকে নেওয়ার পরিকল্পনা থেকে এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে। এতে করে জনগণকে এই বার্তা দেওয়া যে সরকার তাদেরকে রাজপথে যেতে বাধ্য করেছে। অবশ্য বিরোধী দলের দাবি, তারা হঠাৎ করে রাজপথে কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। আগামী ৫ সেপ্টেম্বরে ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখে লং-মার্চ এটি তাদের ধারাবাহিক কর্মসূচিরই অংশ।
এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সংসদে বিরোধী দলের প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য ছিল কিছুটা প্যাঁচানো। এ বিষয়ে বিরোধী দল হয়তো সুযোগ পেয়েছে। তাই নিজেদের কঠোর মনোভাব দেখিয়েছে। আর গুম কমিশনসহ তিনটি বিলের বিষয়ে তাদের দ্বিমত থাকায় ওয়াকআউট করেছে।’’
সামনের লং-মার্চকে কেন্দ্র করে তারা এমনটি করছে কিনা, জানতে চাইলে মান্না বলেন, ‘‘হতে পারে। যদিও তারা সে আন্দোলন কতটুকু চাঙা করতে পারে, সেটিই দেখার বিষয়।’’
তবে ভিন্ন কথা বলছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সামনের লং-মার্চ এবং ঢাকায় মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে আমরা সংসদ উত্তপ্ত করেছি— এমন দাবি অবান্তর। কারণ, জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে গত তিন মাস ধরেই আমরা রাজপথে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে আসছি। রাজধানীতে একাধিক কর্মসূচি পালন করেছি। কোনও জ্বালাও-পোড়াও করা হয়নি।’’
তিনি বলেন, ‘‘সংসদে যা হয়েছে, তার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়ী। কারণ তিনি সব সময় আমাদের দিকে ইঙ্গিত করে আপত্তিজনক কথা বলে আসছেন। এ বিষয়টিতেই বিরোধীদলীয় নেতা প্রতিবাদ করেছেন। আমাদের পক্ষ থেকে কোনও অসংসদীয় আচরণ করা হয়নি। আর জুলাই সনদের ধারা অমান্য করে সরকারের পক্ষ থেকে গুমসহ তিনটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে। এটি আমাদের নীতির সঙ্গে যায়নি, তাই আমরা ওয়াকআউট করেছি। সেটি আমাদের অধিকার। আমরা মনে করি সংসদীয় রীতিনীতিতে এটি অস্বাভাবিক নয়।’’








