‘রাজনৈতিক ইস্যু ও কৌশল’ নির্ধারণে নতুন চিন্তা-ভাবনা বিএনপিতে

Send
সালমান তারেক শাকিল ও আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ২৩:৪৬, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৪৯, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০

বিএনপি

খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টিকে প্রণিধানযোগ্য হিসেবে রাখলেও ভবিষ্যতে ‘রাজনৈতিক ইস্যু ও কৌশল’নির্ধারণ করতে নতুন চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে বিএনপিতে। এক্ষেত্রে অনেকটাই হারিয়ে যাওয়া ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা’ ফিরিয়ে আনার দাবি তুলতে চায় দলটি। তবে, ইস্যুটিকে কীভাবে দৃশ্যপটে আনা যাবে এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে কোন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হবে, এ নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক ও দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য ও একাধিক দায়িত্বশীলদের সূত্রে জানা গেছে, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি এখন পর্যন্ত একমাত্র ‘কনসার্ন’ হলেও চলতি বছরে নতুন ইস্যু নিয়ে মাঠে সক্রিয় হতে চায় বিএনপি। আর এই ইস্যুটিকে কেন্দ্র করেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহৎ রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে চান দলটির নেতারা।

দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীলসূত্র জানায়, আগামী বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের সিদ্ধান্ত থাকলেও ‘রাজনৈতিকভাবে’ মূল দাবি হবে নতুন নির্বাচনের। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপির পক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যান করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি তোলা হলেও নেতারা এখন নীরব। সূত্রের দাবি, ২০২৩ সালে সম্ভাব্য দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও ভোটাধিকার’ নিশ্চিত করতে ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি সামনে আনবে বিএনপি।

জানতে চাইলে দলটির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিলেও নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে আসেনি। কারণ, দলীয় সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না, তার প্রমাণ গত একাদশ সংসদ নির্বাচনেই হয়ে গেছে। ৩০ তারিখের ভোট এই সরকার ২৯ তারিখ রাতে করে নিয়ে গেছে। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা আগামীতে অবশ্যই রাস্তায় নামবো।’

দলের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা যায়, ২০১১ সালের ১০ মে ফুলকোর্ট শুনানির পর নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। এরপর দলীয় সরকারের অধীনেই ২০১৪ সালে ‘নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ অনুষ্ঠিত হলেও বিএনপিসহ অধিকাংশ দল সে নির্বাচনে অংশ নেয়নি। পরে ২০১৬ সালে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার’ দাবি থেকে সরে এসে নতুন করে ‘নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার পদ্ধতির দাবি তোলা হয়। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াই ওই বছর প্রথম এ বিষয়টিকে সামনে আনেন। পরে ২০১৭, ২০১৮ সালে দফায় দফায় উদ্যোগ নিয়েও শেষ পর্যন্ত ‘সহায়ক সরকারের’ রূপরেখা থেকে সরে আসে বিএনপি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে রূপরেখা দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হলেও বিষয়টি ‘অঘোষিত’ কারণে বন্ধ হয়ে যায়।

উল্লেখ্য, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হওয়ার পর ২০১৭ সালের জুলাইতে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করার পরিকল্পনা করে বিএনপি। যদিও ওই প্রক্রিয়াটিও কিছুসময় পর বন্ধ হয়ে যায়।

দলের গুরুত্বপূর্ণ একজন দায়িত্বশীল জানান, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টিকে সামনে রেখেই নির্বাচনপদ্ধতি ও আগামী নির্বাচন ‘নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের’ অধীনে করার দাবিটিকে সমন্বয় করা হবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১৪ সালে দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় অনেকে বলেছেন আমরা ভুল করেছি। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমরা প্রমাণ করেছি, যে দলীয় সরকারের অধীনে যে নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। শুধু আমরা বলছি তা নয়, সরকারের শরিকসহ সব রাজনৈতিক দল বলছে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আমরা এখনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে যাইনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন আমাদের চিন্তায় দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি। এরপর ধারাবাহিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার আন্দোলন যাবো।’

দলের প্রভাবশালী একাধিক সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার মুক্তি, সুষ্ঠু নির্বাচনসহ জনভিত্তিক ইস্যু অনেক থাকলেও অন্যান্য দলগুলোকে একত্র করে দাবি আদায়ে কার্যকরভাবে কর্মসূচি প্রণয়নের চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে দলটির শীর্ষনেতৃত্বে। এক্ষেত্রে দেশের ধর্মভিত্তিকদলগুলোকেও সমন্বয় করার চিন্তা রয়েছে দলের নীতিনির্ধারকদের। বর্তমানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট থাকলেও আগামী দিনে এই কাঠামোতে পরিবর্তন আসবে, বলে জানান এই দায়িত্বশীল।

যদিও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘বিএনপি তো এককভাবে কর্মসূচি দিচ্ছে। আর কী দাবি নিয়ে ভবিষ্যতে চিন্তা-ভাবনা হবে, এটা নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হয়নি।’

২০ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের মহাসচিব অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশের মানুষের মধ্যে ঐক্য আছে। দাবি নিয়েও সমস্যা নেই, কিন্তু বিএনপিকে শক্ত হতে হবে। সংগঠন শক্তিশালী করতে হবে। আগে তাদের এ কাজে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছি।’

বিএনপির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সাংগঠনিকভাবে নিয়মিত কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও নানা কারণে কখনো ঢিলেমি আসে। দলের সপ্তম কাউন্সিল নিয়ে শীর্ষনেতৃত্বে এখনও সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না হলেও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে লক্ষ নির্ধারণের প্রতি। দল হিসেবে এখনও লক্ষ্য স্থির করতে পারেনি বিএনপি। এই সমস্যা কাটিয়ে উঠলেই দাবিগুলো প্রকাশ্যে আসবে।

দলের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, ‘বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে আসেনি। খালেদা জিয়া মুক্তি, জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচেনর দাবিতে আমাদের আন্দোলন চলছে। আশা করি জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে এই সরকারকে হটিয়ে দেশনেত্রীকে মুক্ত করতে এবং নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবো।’

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের মূল দাবিই হচ্ছে ভোটাধিকার আদায় করা। মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। গণতন্ত্র ফেরানোই দলের মূল লড়াই। আমরা তত্ত্বাবধায়ক বা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থার পক্ষেই আছি।’

/টিএন/

লাইভ

টপ