রওশনসহ সিনিয়র নেতাদের সম্মতিতেই রাঙ্গার স্থলে বাবলু

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ২০:৫১, জুলাই ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:২১, জুলাই ২৮, ২০২০

বাবলু (বায়ে) ও রাঙাপ্রায় আড়াই বছর পর জাতীয় পার্টির মহাসচিব পদ থেকে মসিউর রহমান রাঙ্গাকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় দলটির চিফ প্যাট্রন রওশন এরশাদসহ সিনিয়র নেতাদের সম্মতি রয়েছে। একইসঙ্গে এই পরিবর্তনের পেছনে রাঙ্গার সাংগঠনিক উদ্যোগহীনতা, এরশাদ পরিবারের একাধিক সদস্য ও চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের সঙ্গে দূরত্ব ইত্যাদি প্রভাব রেখেছে বলে মনে করেন জাপার সিনিয়র কয়েকজন নেতা।

তবে দলটির প্রেসিডিয়ামের নির্ভরযোগ্য একাধিক নেতা জানান, চেয়ারম্যানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকলেও এই পরিবর্তনের ঘটনাটি ‘আকস্মিক’ এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়ে রাঙ্গার সম্পর্কের বিষয়টিকে সামনে রাখলে ঘটনাটি আরও ‘তাৎপর্যমূলক’ বিবেচিত হচ্ছে বলে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে এমন কথা জানান সিনিয়র কয়েকজন নেতা।

রবিবার (২৬ জুলাই) হঠাৎ করেই মহাসচিব পদ থেকে মসিউর রহমান রাঙ্গাকে সরিয়ে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে পদায়ন করেন জিএম কাদের। গঠনতন্ত্রের ২০-এর ১(ক) ধারার ক্ষমতা বলে তিনি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন বলে দলীয় প্রচার বিভাগ থেকে জানানো হয়।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়ামের অন্তত ছয় জন গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মহাসচিব পদে পরিবর্তন আকস্মিক হলেও দলের চিফ প্যাট্রন রওশন এরশাদ, সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, কো-চেয়ারম্যান এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপিসহ সিনিয়র আরও কয়েকজন নেতার সম্মতি নিয়েই রাঙ্গাকে সরিয়ে বাবলুকে পদায়ন করা হয়েছে।

নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রওশন এরশাদ আমাকে সমর্থন দিয়েছেন, গতকাল (২৬ জুলাই) রবিবার আমাকে তিনি ফোন করেছেন।’

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘আমার ধারণা, দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলেই এটা করেছেন।’

এ বিষয়টি নিয়ে জানতে চেয়ে রবিবার ও সোমবার একাধিক মাধ্যমে জি এম কাদেরের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার প্রেস সেক্রেটারি ও প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায়ও এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না বলে জানান বাংলা ট্রিবিউনকে।

দলের কোনও কোনও নেতা অবশ্য বলছেন, জাপায় মহাসচিব পদে পরিবর্তন একটি নিয়মিত ঘটনা। এর আগে রুহুল আমীন হাওলাদারকে সরিয়ে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে মহাসচিব করা হয়েছিল। পরে তাকে সরিয়ে আবারও হাওলাদারকে পদায়ন করা হয়। এরপর ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর জাপার প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রুহুল আমীন হাওলাদারের স্থলাভিষিক্ত করেন মসিউর রহমান রাঙ্গাকে। আড়াই বছর পর তাকে সরিয়ে কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা বাবলুকে আবারও মহাসচিব পদে ফেরালেন জি এম কাদের।

রওশনপন্থী জাপার একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মহাসচিব পরিবর্তন হঠাৎ করেই হয়েছে। তবে এটা জাপায় স্বাভাবিক ঘটনা। জি এম কাদের ভালো জানবেন তিনি কেন এ সিদ্ধান্ত নিলেন। গঠনতন্ত্রের এই ক্ষমতাচর্চা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় থেকেই হয়ে আসছে। রাঙ্গা ও জিএম কাদের দুজনের বাড়িই রংপুরে। ফলে সিদ্ধান্ত তিনি বুঝেশুনেই নিয়েছেন বলে মনে করি। আর এমন সিদ্ধান্তে দলে এর আগেও প্রভাব পড়েনি, এখনও পড়বে না বলে মনে হয়।’

মসিউর রহমান রাঙ্গা মহাসচিব পদে থাকাকালীন সাংগঠনিক কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করেননি বলে জানান রাঙ্গার ঘনিষ্ঠ প্রেসিডিয়ামের আরেক সদস্য। জাতীয় সংসদের নির্বাচিত এই সদস্য বলেন, আমার সঙ্গে মসিউর রহমান রাঙ্গা ভাইয়ের সম্পর্ক খুব ভালো। ফলে আমি প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে পারছি না। এটুকু বলতে পারি, তিনি সংগঠন গোছানোর মতো কোনও কাজ করেননি। জেলা পর্যায়ের কোনও বৈঠক করেননি। এতে সিনিয়রদের দায় থাকলেও মহাসচিব হিসেবে এটা তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন না।

প্রেসিডিয়ামের এই সদস্য আরও বলেন, রংপুরে সাদ এরশাদ ও আসিফ শাহরিয়ারকে কেন্দ্র করেও রাঙ্গার সঙ্গে সমস্যা ছিল। তাদের সঙ্গেও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি গত ২০ জুলাই এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ারকে কেন দলে ফেরানো হলো— এ নিয়ে জিএম কাদেরের সঙ্গেও রাঙ্গার বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান এই নেতা।

প্রেসিডিয়ামের প্রভাবশালী আরেক সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সব সিনিয়র নেতা মিলেই মসিউর রহমানকে সরিয়ে দিয়েছেন। নতুন মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নানা পর্যায়ে সুসম্পর্ক রয়েছে। আর এই সিদ্ধান্ত রাঙ্গা নিজেও মেনে নিয়েছেন। তিনি এটাও মনে করেন, ভবিষ্যতে আবারও তিনি এই পদে নিযুক্ত হবেন।

‘তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকলেও মসিউর রহমান এই সময়ে সেখান থেকে কোনও সহযোগিতা পাবেন না বলে দাবি করেন জাতীয় পার্টির একজন কো-চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, মন্ত্রিত্ব যাওয়ার পর থেকে তিনি ফ্রাস্টেশনে ভুগছেন। কিছু দিন সরকারের বিরুদ্ধেও কথা বলেছেন।’

দলের কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি বলেন, ‘আমি কিছু দিন রাজনীতি থেকে দূরে আছি। আমি জানি না।’

জাপার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলছে, রবিবার জিএম কাদেরের সিদ্ধান্ত আসার পর মসিউর রহমান বেশ কয়েকজনকে ফোন করে কড়া কথা বলেছেন। জিএম কাদের ও রওশন এরশাদকে ফোন করেন তিনি। তবে রওশন এরশাদের তরফে বলা হয়েছে, ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’। সোমবার বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে মসিউর রহমান রাঙ্গা জানান, রওশন এরশাদ তাকে বলেছেন, সবাই মিলে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে চেয়ারম্যানের ভুল ধরা যায় না।

সোমবার দুপুরে মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘আমাকে সরানোর কোনও কারণ তো দেখি না। এই পদে পরিবর্তন রুটিন ওয়ার্ক। সবাই কাজ করবেন, অসুবিধা কোথায়। একসময় তিনি (বাবলু) ছিলেন, বাদ পড়েছিলেন, এরপর হাওলাদার সাহেব ছিলেন, তিনিও বাদ পড়েছিলেন। এটা তো সরকারের মন্ত্রিত্ব বা ক্ষমতাসীন দলের সেক্রেটারির পদ না, আমাদের এখানে পয়সা দিয়ে রাজনীতি করতে হয়। তো দরকার কী আছে, উনি যদি করতে পারেন, ভালো। আমি উনাকে হেল্প করবো, অসুবিধা নাই তো। আমি উনাকে সমর্থন করি, কালকেও করেছি, আজকেও করেছি।’

চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে মসিউর রহমান বলেন, ‘হয়তো কিছুটা বিধিসম্মত হয় নাই। তো না হলে না হবে, চেয়ারম্যান ক্যান ডু এনিথিং আন্ডার দ্য আর্টিকেল অব টুয়েন্টি। চেয়ারম্যান যদি মনে করেন—এটা করবো, তাহলে এটা নিয়ে কারও দ্বিমত করার উপায় নাই। তিনি ভালো মনে করেছেন, তাই করেছেন, সমস্যা নাই।’

‘আমি নতুন মহাসচিব ও চেয়ারম্যানকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি’ উল্লেখ করে মসিউর রহমান বলেন, ‘ছোট একটি দল, এটা আর কী ভাঙা যাবে। সেজন্য একসঙ্গে থাকাটাই আমাদের জন্য ভালো। কর্মীরা কষ্ট পায়।’

জাতীয় পার্টির রাজনীতির ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষক এরশাদের সন্তান এরিকের মা বিদিশা মনে করছেন, জিএম কাদেরের গৃহীত সিদ্ধান্ত অগণতান্ত্রিক। এটা কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না।’

সোমবার বিকাল তিনটায় বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘২০-এর ১-এর ‘ক’ ধারা প্রয়োগ করে আগের মহাসচিবকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা একদম অগণতান্ত্রিক। মসিউর রহমান রাঙ্গার কী দোষ কী ত্রুটি, ভুল ছিল সেটার জন্য তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ করা উচিত ছিল। মহাসচিব চেঞ্জ করাটা প্রেসিডিয়াম মিটিংয়ে সবার সম্মতিক্রমে করলে জিনিসটা আরও গ্রহণযোগ্যতা পেতো।’’

বিদিশা আরও বলেন, ‘আগামী দিনে দেখা যাবে ঠিক একই প্রক্রিয়ায় জিয়াউদ্দিন বাবলু সাহেবকে বাদ দিতে পারেন এই চেয়ারম্যান। এখন তো পুরো একনায়কতন্ত্র চলছে জাতীয় পার্টিতে। এটা কোনও গণতান্ত্রিক রাজনীতি হতে পারে না। চেয়ারম্যান সাহেব নিজেই তো একজন বিতর্কিত। তার চেয়ারম্যানের বৈধতা রিট করে হাইকোর্টে বিচারাধীন আছে। তিনি নিজে কতদিন চেয়ারম্যান আছেন তা দেখার অপেক্ষায় আছে দলীয় নেতাকর্মীরা।’

মসিউর রহমান রাঙ্গাকে সরানোর কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রেসিডিয়াম ও সংসদ সদস্য বলেন, জাপার সংসদীয় ভূমিকার ওপরেই স্পষ্ট হবে তারা কোনও দিকে ভিড়েছেন বা তাদের চালিকা শক্তি কী। যে কারণে রাঙ্গাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তার সূত্রপাত দলে নয়, দলের বাইরে থেকে এসেছে। এরইমধ্যে গত ১৮ জুলাই জিএম কাদের বলেছেন, আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এতে সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। সংসদীয় একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতা একজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। গণতন্ত্র সুসংহত করতে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য এখনই এ ব্যাপারে চিন্তা করতে হবে।

নতুন মহাসচিব হিসেবে দলকে জিএম কাদেরের নেতৃত্বে আরও সুসংগঠিত করার কথা জানালেন জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। সোমবার সকালে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের নেতৃত্বে পুরো পার্টিকে সংগঠিত করবো। দলের কো-চেয়ারম্যানদের সঙ্গে মিলে, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সবাই মিলে দলটিকে শক্তিশালী করবো। একটি শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে যেন জাতীয় পার্টি যে কর্মকাণ্ড করছে, এটাকে আরও জোরদার করবো বলে আশা করছি।’

আরও পড়ুন, 

পদ হারানোর কারণ জানেন না রাঙ্গা

 

/এএইচআর/এপিএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ