ঢাকা-১৮ উপনির্বাচন: ঘরে-বাইরে চ্যালেঞ্জের মুখে জাহাঙ্গীর

Send
আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ১০:৩১, অক্টোবর ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩১, অক্টোবর ২৪, ২০২০

জাহাঙ্গীর হোসেনঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে ঘরে-বাইরে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন। ইতোমধ্যে নিজ দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেছেন। অন্যদিকে নির্বাচনি মাঠের প্রধান প্রতিপক্ষ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তো আছেই। ফলে, নির্বাচনের মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি ঠিকমতো নিতে পারছেন না জাহাঙ্গীর।

বিএনপির নেতারা বলছেন, ঘরে-বাইরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার জন্য জাহাঙ্গীর হোসেন নিজেই এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ক্ষুদ্র একটা অংশ দায়ী। গত ১২ সেপ্টেম্বর বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে এই আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম কফিল উদ্দিন আহমেদের সমর্থকদের ওপর হামলা করে জাহাঙ্গীরের অনুসারীরা। এতে কফিল উদ্দিনের ১৫ জন সমর্থক আহত হন। এই ঘটনায় তদন্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনকে। কিন্তু হামলার জন্য সরকারকে দায়ী করে তদন্ত প্রতিবেদন দেন খোকন। এতে হামলায় আহতরা ক্ষিপ্ত হয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে বিচার চান। তিনি বিচার না করে বরং অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। এতে ক্ষিপ্ত নেতাকর্মীরা মহাসচিবের বাসায় ডিম ছুড়ে মারেন। কিন্তু হামলার ঘটনার বিচার না হলেও ডিম ছুড়ে মারার অপরাধে ১২ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। আর এখন এই বহিষ্কৃত নেতাকর্মীরা বিভিন্নভাবে জাহাঙ্গীরের নির্বাচনি প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করছে। তারই অংশ হিসেবে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বহিষ্কৃত নেতাদের নেতৃত্বে জাহাঙ্গীরকে বিএনপি থেকে বহিষ্কারের দাবিতে কালো পতাকা মিছিল করা হয়। এতে জাহাঙ্গীরের অনুসারী ও বহিষ্কৃতদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ঘটনা ঘটে।  

ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির সমন্বয়কের দায়িত্বে আছেন দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমান উল্লাহ আমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে যে বিরোধ ছিল সেটা এখন মিটে গেছে। বৃহস্পতিবার কফিল আহমেদ নির্বাচনি প্রস্তুতি সভায় অংশ নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। আমাদের মধ্যে এখন আর কোনও বিরোধ নেই।’

তাহলে কেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা জাহাঙ্গীরকে বিচার ও বহিষ্কারের দাবিতে মিছিল করেছেন? জানতে চাইলে আমান উল্লাহ বলেন, ‘এই ধরনের কোনও মিছিলের খবর আমার কাছে নেই। কারা মিছিল করেছেন সেটাও জানি না।’

এ বিষয়ে প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধের বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় বিএনপি কাজ করছে। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। আমি মনে করি, স্থানীয় সব নেতাকর্মী আমার সঙ্গে আছেন। তারা আমার পক্ষে কাজ করছেন এবং করবেন। আমার প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আওয়ামীকে সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছি।’

নির্বাচনে জাহাঙ্গীরের পক্ষে কাজ করবেন কিনা জানতে চাইলে মনোনয়ন বঞ্চিত কফিল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দলের সিনিয়র নেতাকর্মীরা আমার কাছে এসেছিলেন। আমি বলেছি, নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শরীর ঠিক রেখে যতটুকু কাজ করা যায় ততটুকুই করবো।’

আপনার সমর্থকরা জাহাঙ্গীরের পক্ষে নামবেন কিনা? জানতে চাইলে কফিল উদ্দিন বলেন, ‘আমি আমার কথা বলতে পারবো। যারা হামলার শিকার এবং দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন তারা কাজ করবেন কিনা সেটা তো আমি বলতে পারবো না। এখন বহিষ্কৃতরা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে মিছিল করলে বা নির্বাচনি মাঠে কাজ না করলে আমি কী করতে পারি? তারা তো দলেও নেই।’

শুক্রবার জাহাঙ্গীর হোসেনকে ঢাকা-১৮ আসনে ‘বহিরাগত-সন্ত্রাসী,’ ‘ঘর জামাই’ উল্লেখ করে তাকে বহিষ্কারের দাবিতে উত্তরায় কালো পতাকা মিছিল করেছে বহিষ্কৃত নেতাকর্মীরা। এই মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন গত ১২ অক্টোবর মির্জা ফখরুলের বাড়িতে হামলার অভিযুক্ত দক্ষিণখান থানা বিএনপির সদস্য নাজিম উদ্দিন দেওয়ান ও আমজাদ হোসেন এবং উত্তরা পূর্ব থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মতিউর রহমান।

নাজিম উদ্দিন দেওয়ান বলেন, ‘আসলে আমরা সবাই দল করি। দুঃখ হলো বিচারহীনতা। ১২ সেপ্টেম্বর গুলশান অফিসে হামলায় আমরা ১৬ থেকে ১৭ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছিলাম। আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন এই ঘটনার বিচার হবে। কিন্তু আমরা তো বিচার পাইনি, উল্টো হামলার প্রতিবাদ করতে গিয়ে বহিষ্কার হয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আজকে ঢাকা-১৮ আসনের বহিরাগত ও সন্ত্রাসী জাহাঙ্গীরকে বিএনপি থেকে বহিষ্কারে দাবিতে কালো পতাকা মিছিল করেছি। আগামীতে আরও কর্মসূচি দেওয়া হবে। আমরা ১২ সেপ্টেম্বরের ঘটনার বিচার চাই। ব্যক্তিকে বাঁচানোর জন্য দলের আদর্শকে যারা বিসর্জন দিচ্ছেন, তাদেরও বিচার হওয়া দরকার।’

বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা-১৮ আসনের স্থানীয় নেতাকর্মীরা তিন ভাগে বিভক্ত। একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ করেন জাহাঙ্গীর হোসেন, আরেকটি কফিল উদ্দিন আহমেদ। অপর একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ করেন আরেক মনোনয়ন বঞ্চিত ব্যবসায়ী বাহাউদ্দিন সাদি। এর মধ্যে আবার বহিষ্কারের ঘটনা। তবে, সাদির অনুসারীদের সঙ্গে অভিমান ভেঙে জাহাঙ্গীরের পক্ষে মাঠে নামার একটা সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু কফিলের অনুসারীরা তার পক্ষে থাকবে না এটা পরিষ্কার। এখন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি নিজ দলের নেতাকর্মীদেরও মোকাবিলা করে এগোতো হবে জাহাঙ্গীরকে।

সূত্র আরও জানায়, মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়া পর থেকে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি অংশ সরাসরি জাহাঙ্গীর হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন। এজন্য গত ১১ সেপ্টেম্বর তাকে মনোনয়ন না দিতে কেন্দ্রীয় বিএনপির বরাবর লিখিত চিঠি দেন ঢাকা-১৮ সংসদীয় আসনের ৭ ওয়ার্ডের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ ছিল, গত ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ওয়ার্ড কাউন্সিলের পদে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের বিপক্ষে কাজ করেছিলেন জাহাঙ্গীর। গোপনে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলদের পক্ষে কাজ করেছিলেন জাহাঙ্গীর ও যুবদলের নেতাকর্মীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা বলেন, ‘বিএনপিতে যারা অন্যায় করে তারা সব সময় পুরস্কার পেয়ে আসছে। ১/১১ সরকারের সময় যারা খালেদা জিয়া এবং বিএনপির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন তারা বিভিন্নভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন। সর্বশেষ জাহাঙ্গীরের লোকরা হামলা করলো, আর তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হলো। হামলার কোনও বিচারও হলো না।’

তিনি আরও বলেন, ‘১২ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় যদি সরকার পক্ষ হামলা করে তাহলে তো জাহাঙ্গীর, কফিল এবং সাদি সবার অনুসারীদের আহত হওয়ার কথা। কিন্তু হামলায় শুধু কফিলের অনুসারীরা কেন আহত হলো? আমাদের অন্যায়কারীদের পুরস্কৃত করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এখন যারা প্রকাশ্যে জাহাঙ্গীরের বিরোধিতা করছে তাদের তো আমরা কিছু বলতেও পারবো না। কারণ তাদের তো আগেই দলে থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাহলে কোন পরিচয়ে বিদ্রোহীদের আমরা বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে বলবো।’

এদিকে ঢাকা-১৮ আসনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন পর দলে সক্রিয় হয়েছেন আমান উল্লাহ আমানসহ ৯০-এর বিএনপির ছাত্রনেতারা। নিজের মধ্যের বিভেদ ভুলে গত কয়েকদিন নির্বাচনি বিভিন্ন প্রস্তুতি সভায় অংশ নিয়েছেন ছাত্রনেতা হাবিবুর রহমান হাবিব, নাজিম উদ্দিন আলম, মোস্তাফিজুর রহমান বাবলাসহ অনেকে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঢাকা-১৮ আসন উপনির্বাচনে বিএনপির সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন ৯০-এর ছাত্রনেতা ডাকসুর সাবেক ভিপি আমানউল্লাহ আমান। শুধু তাই নয়, ৯০-এর অধিকাংশ ছাত্রনেতা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে এই নির্বাচনকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন।’

 

 
 
/এমএএ/

লাইভ

টপ