রাজধানী বিজয়নগরের কালভার্ট এলাকায় শুক্রবার (১২ ডসিম্বের) দুপুরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করেছে অস্ত্রধারীরা।
এদিন রাত সাড়ে ৯টায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেন ঢামেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, ওসমান হাদির ঢামেকে প্রাথমিক একটা সার্জারি করা হয়েছে। তার মাথায়, বুকে ও পায়ে ইনজুরি (আঘাত) ছিল।
ঘটনার পরপরই বাংলা ট্রিবিউন একাধিক রাজনীতিকের সঙ্গে আলাপ করে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এ ধরনের ঘটনাকে ন্যক্কারজনক অ্যাখ্যায়িত করে বিচলিতবোধ করছেন রাজনীতিকরা। একে পুনরুদ্ধার হওয়া গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত করার ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। অবিলম্বে সরকারকে অপরাধীদের খুঁজে বের করে সাজা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)র সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের অগ্রযাত্রায় এ ধরনের হামলা অনাকাঙ্ক্ষিত। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে প্রশ্ন যায়। আমরা আগেই বলেছিলাম তফসিল ঘোষণার আগেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জিরো টলারেন্স রাখতে হবে। অথচ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পরদিনই এমন ঘটনা ঘটলো, যা রীতিমতো হতবাক ও বিচলিত হওয়ার মতো। আমরা মনে করি, ঘটনার পেছনের রহস্য স্পষ্ট হতে বেশি সময় লাগবে না। যারাই জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
প্রিন্স মনে করেন, নির্বাচন বিলম্ব করতে চায় কোনও কোনও দল। তাদের পক্ষ থেকে এ ধরনের তৎপরতা থাকতে পারে কিনা, তা তদন্তসাপেক্ষ। তবে এ বিষয়ে সরকারকে আরও শক্ত হতে হবে।
এদিকে হামলার নেপথ্যে কারা জড়িত এ নিয়েও নানা আলোচনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অপরাধীদের গ্রেফতারে তৎপরতা শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী।
হাদির ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, নির্বাচনি পরিবেশে এমন সহিংস হামলা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং দেশের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। প্রধান উপদেষ্টার বরাত দিয়ে এসব কথা জানিয়েছে প্রেস উইং।
ঘটনার পরপরই এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। অনেকেই ঢাকা মেডিক্যালে ছুটে যান। আবার কিছু রাজনৈতিক দল বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে। কেউ কেউ প্রতিবাদ মিছিল করেছে। অনেকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েও নিন্দা জানিয়েছেন।
ঢাকা মেডিক্যাল থেকে এভারকেয়ারে হাদি
শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় জানা গেছে, উন্নত চিকিৎসার জন্য পরিবারের আবেদনে শরিফ ওসমান হাদিকে ঢাকা মেডিক্যাল থেকে এভারকেয়ারে স্থানান্তর করা হয়েছে। গণমাধ্যমকে বিষয়টি জানিয়েছেন ঢামেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
তিনি জানান, ঢামেকে তার (ওসমান হাদির) প্রাথমিক একটা সার্জারি করা হয়েছে। মাথায়, বুকে ও পায়ে ইনজুরি (আঘাত) ছিল। প্রাথমিক সার্জারির পর তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। এটা তার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেই করা হচ্ছে।
হামলার স্থান ও সন্দেহভাজন কারা
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, শুক্রবার দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে বিজয়নগর পানির ট্যাঙ্কি এলাকায় একটি মোটরসাইকেলে এসে হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে কতিপয় দুষ্কৃতকারী।
এ সময় হাদির পেছনের রিকশায় ছিলেন তার সহকর্মী মো. রাফি। তিনি সাংবাদিকদের জানান, জুমার নামাজ শেষে তারা রিকশায় করে হাইকোর্টের দিকে আসছিলেন। বিজয়নগর আসতেই একটা মোটরসাইকেলে করে দুজন এসে হাদির ওপর এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়।
হাদির ওপর হামলায় কারা জড়িত থাকতে পারে এ নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। তবে জুলাই মঞ্চের সঙ্গে জড়িত একটি সূত্রের দাবি, এ হামলায় একজন বাউলের সমর্থকরা দায়ী। যদিও এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট করে কিছু জানানো হচ্ছে না।
ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দলগুলোর
দুপুরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার পরপরই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বিবৃতি দিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। তারা অবিলম্বে দুষ্কৃতকারীদের গ্রেফতারের দাবি জানায়। অনেক দল মনে করেন, এটি নির্বাচন ব্যাহত করার ষড়যন্ত্র।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী (বিএনপির) পক্ষ থেকে বিবৃতিতে বলা হয়, এই আক্রমণ সুদূরপ্রসারী অশুভ পরিকল্পনার অংশ। নিঃসন্দেহে এটি নির্বাচনি পরিবেশ বানচালের জন্য সন্ত্রাসী কার্যক্রম বিস্তারের নীলনকশা।
দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ সই করা বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের একটি চক্র এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।
শরিফ ওসমান হাদির ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। বিবৃতিতে তিনি বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিনই একজন অন্যতম জুলাইযোদ্ধা এবং এমপি প্রার্থীর ওপর প্রকাশ্যে গুলি চালানোর ঘটনা নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এ হামলাকে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার হওয়া গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ওপরও সরাসরি আঘাত আখ্যায়িত করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে গুরুতর আহত শরিফ ওসমান হাদির দ্রুত সুস্থতা কামনা এবং দেশবাসীর কাছে তার জন্য দোয়া চেয়েছে দলটি। এনসিপি মনে করে এই হামলা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও নির্বাচনি পরিবেশের ভঙ্গুরতা সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দেয়।
ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এম এ আউয়াল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন ওসমান হাদীকে গুলি করার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সামনে এসেছে। প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুধু তাই নয় বিগত দেড় বছরে প্রকাশ্যে কয়েকটি খুন ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।
তিনি অবিলম্বে ওসমান হাদীর হামলাকারীদের গ্রেফতারের দাবি জানান।
ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, সরকারকে বলবো অবিলম্বে এই আক্রমণের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করতে হবে। এটা আগামী নির্বাচনসহ সামগ্রিকভাবে দেশের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। ফলে বিষয়টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সচেষ্ট হতে হবে।
ওসমান হাদিকে গুলিবিদ্ধ করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টি এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও ফ্রন্টের মুখপাত্র এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। যৌথ বিবৃতিতে তারা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে সব প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
ইনকিলার মঞ্চের মুখপাত্রের ওপর হামলার ঘটনায় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। যা খুবই আশঙ্কার ও উদ্বেগের।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল যৌথ বিবৃতিতে ওসমান হাদির ওপর গুলি চালানোর ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান। তারা বলেন, এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত আতঙ্কজনক। এ ব্যাপারে সরকার ও পুলিশ প্রশাসনকে জবাব দিতে হবে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন এমন সহিংস হামলার ঘটনা পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়াকেই বাধাগ্রস্ত করবে। সরকার কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না। আহত ওসমান হাদির সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিতের আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নির্বাহী সভাপতি মাওলানা একেএম আশরাফুল হক বলেন, হাদির ওপর এই হামলাকে বাংলাদেশকে নতুন করে অস্থিতিশীল করে তোলার দেশি-বিদেশি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ।
জুলাই অভ্যুত্থানের সাফল্য ও নতুন বাংলাদেশ গড়ার ঐক্যবদ্ধ যাত্রা ব্যাহত করতে এমন সহিংস ও সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (বাংলাদেশ ন্যাপ) চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অকার্যকর করার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ বলেই দেশবাসী আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে হবে।
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ফয়জুল হাকিম এক বিবৃতিতে ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। এই হামলা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির গভীর চক্রান্তের অংশ বলে তিনি মনে করেন। অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি।
হাসপাতালে ছুটে গেলেন যারা
গুলিবিদ্ধ ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে দেখতে ঢাকা মেডিক্যালে ছুটে যান অনেক রাজনৈতিক দলের নেতা। তারা এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিকালে তাকে দেখতে গিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কেউ যদি আবার বাংলাদেশে নতুন করে ফ্যাসিজম বা সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চান, তাহলে খুব দেরি হবে না; যথাযথ জবাব পেয়ে যাবেন। জনগণ সব ষড়যন্ত্র রুখে দেবে।
এছাড়াও হাসপাতালে যান হাদির আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস। অবশ্য কতিপয় যুবক এ সময় তার বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেওয়ায় তিনি কথা বলতে পারেননি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা না যেতেই একজন প্রার্থীর ওপর এমন হামলা এক ধরনের অশনি সংকেত। এ ধরনের কর্মকাণ্ড করে কারা লাভবান হতে চায় চিহ্নিত করতে হবে। আমরা মনে করি, এগুলো করে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন ব্যাহত করার পরিকল্পনা করছে একটি পক্ষ। তবে গণতন্ত্রকামী মানুষ তা মেনে নেবে না।








