নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারীরা কতটা জায়গা পেলেন?

সুষ্মিতা মুন্সী
২১ জুলাই ২০২৬, ১৯:০০আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ১৯:০০

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সামনের সারিতে উঠে আসেন নারীরা। মিছিলের নেতৃত্ব, বিক্ষোভ সংগঠিত করা এবং আন্দোলনের অন্যতম দৃশ্যমান মুখ হিসেবে তাদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।

দুই বছর পর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—জুলাই আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়া সেই নারীরা এখন কোথায়? বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা কতটা জায়গা করে নিতে পেরেছেন?

আন্দোলনের অন্যতম মুখ উমামা ফাতেমা বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানে নারীরা চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করলেও পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় তাদের প্রভাব খুব কমই দেখা গেছে।”

তার ভাষ্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম ছিল। পুরুষের আধিপত্যই বহাল রয়েছে।

নারীদের এই সীমিত প্রতিনিধিত্ব আন্দোলনে সক্রিয় থাকা অনেকের মধ্যেই হতাশা তৈরি করেছে।

একই ধরনের উদ্বেগ উঠে আসে ২০২৪ সালের নভেম্বরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘ডায়ালগ অন উইমেন অব দ্য মাস আপরাইজিং: হোয়্যার ডিড দ্য উইমেন গো?’ শীর্ষক আলোচনায়।

সেখানে নারী অধিকারকর্মীরা বলেন, আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও পরবর্তী সংস্কার কমিশন, নীতিনির্ধারণী আলোচনা কিংবা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় নারীদের যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

আন্দোলনের সময় নারীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত দৃশ্যমান। কিন্তু আন্দোলন-পরবর্তী ক্ষমতার কাঠামোয় তাদের উপস্থিতি দ্রুত কমে যায়।

এর প্রতিফলন দেখা যায় ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনেও। মোট এক হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৮১ জন নারী, যা মোট প্রার্থীর ৪ দশমিক ০৮ শতাংশ।

এমন এক দেশে এই চিত্র দেখা গেল, যেখানে মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী।

৩০০টি সাধারণ সংসদীয় আসনে সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র সাতজন নারী—এর মধ্যে ছয়জন বিএনপির এবং একজন স্বতন্ত্র।

২০২৪ সালের নির্বাচনে সরাসরি নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্য ছিলেন ২০ জন। এক নির্বাচনি চক্রের ব্যবধানে সেই সংখ্যা ২০ থেকে ৭-এ নেমে আসা নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে স্পষ্ট পশ্চাদপসরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

২০২৫ সালেও প্রায় ৮৫ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে মাত্র সাতজন বিজয়ী হন, যা ১০ শতাংশেরও কম সাফল্যের হার।

অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান বলেন, “জুলাই আন্দোলনের ব্যাপক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সেই অনুপাতে বাড়েনি।”

তার মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো এখনও পুরুষতান্ত্রিক। দলীয় নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীরা উল্লেখযোগ্যভাবে কম প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছেন।

দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়াতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শতাধিক প্রার্থী দিলেও একজন নারী প্রার্থীও মনোনয়ন দেয়নি। বিষয়টি নারী অধিকারকর্মী এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সমালোচনার মুখে পড়ে।

অপরদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৪৪ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র তিনজন নারীকে মনোনয়ন দেয়। আন্দোলনে নারীদের ভূমিকার তুলনায় এটিকেও অনেকেই অপর্যাপ্ত বলে মনে করেন।

জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সমঝোতার পর তাসনিম জারা, সৈয়দা নিলিমা দোলাসহ কয়েকজন নারী নেতা দলটি থেকে পদত্যাগ করেন। পরে তাসনিম জারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন।

নারী নেত্রীদের ভাষ্য, রাজনীতিতে পুরুষদের তুলনায় তাদের অনেক বেশি বাধার মুখে পড়তে হয়। ব্যক্তিগত আক্রমণ, সাইবার বুলিং এবং অনলাইনে চরিত্রহনন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

উমামা ফাতেমা বলেন, “রাজনীতিতে নারী ও পুরুষকে একই মানদণ্ডে বিচার করা হয় না। পুরুষদের মূল্যায়ন করা হয় তাদের রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে, আর নারীদের বিচার করা হয় ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও সামাজিক ধ্যানধারণার ভিত্তিতে।”

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম ছাত্রনেত্রী সানজিদা আহমেদ তন্বী একই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আহত হওয়ার পর তার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তিনি আন্দোলনের অন্যতম প্রতীকী মুখ হয়ে ওঠেন।

তন্বী বলেন, “রাজনীতি ও সমাজে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এখনও পরিবার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগত নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয়। অনলাইন হয়রানি ও সাইবার বুলিং এখনো বড় প্রতিবন্ধকতা।”

জুলাই আন্দোলনে নারীরা শুধু নেতৃত্বই দেননি, সহিংসতারও শিকার হয়েছেন। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে অন্তত ১১ জন নারী নিহত হন।

এ ছাড়া আরও অনেক নারী আহত, গ্রেফতার কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের অবদানকে তাদের আত্মত্যাগ থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জ্যোৎস্না দত্ত বলেন, “নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, কিন্তু নেতৃত্বের জায়গা এখনও সন্তোষজনক নয়। রাজনৈতিক দলগুলো নারীর নেতৃত্বের কথা বললেও মনোনয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বৈষম্য এখনও রয়ে গেছে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থান দেখিয়ে দিয়েছে, নারীরা কেবল অংশগ্রহণকারী ছিলেন না; নেতৃত্ব, সংগঠন ও প্রতিরোধ—সব ক্ষেত্রেই তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।”

তবে তার মতে, রাজনৈতিক দলগুলো সেই বাস্তবতাকে মনোনয়ন ও নেতৃত্বের পদে প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি বলেন, “শুধু সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। দলগুলোকে সরাসরি নির্বাচনে আরও বেশি নারীকে মনোনয়ন দিতে হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং নারী নেতৃত্ব বিকাশে বিনিয়োগ করতে হবে।”

নির্বাচন কমিশনের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক দলগুলো ধীরে ধীরে তাদের বিভিন্ন সাংগঠনিক পর্যায়ে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবে। তবে অধিকাংশ দল এখনও সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে, ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে বিশ্বজুড়ে জাতীয় সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব ছিল ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে কয়েকটি দেশ।

রুয়ান্ডা, মেক্সিকো, বলিভিয়া ও কিউবায় সংসদ সদস্যদের অন্তত ৫০ শতাংশই নারী।

এছাড়া ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও আইসল্যান্ডের মতো নর্ডিক দেশগুলো বহু বছর ধরে ৪৫ শতাংশের বেশি নারী প্রতিনিধিত্ব ধরে রেখেছে।

আইপিইউর তথ্য অনুযায়ী, নর্ডিক দেশগুলোর সংসদে গড়ে ৪৫ দশমিক ২ শতাংশ সদস্য নারী।

এই উদাহরণগুলো দেখায়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দলীয় মনোনয়নে নারীদের অগ্রাধিকার, কার্যকর কোটা ব্যবস্থা, নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচি এবং নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দ্রুত নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো সম্ভব।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-৫ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব স্তরে নারীর পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

তবে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৮টি দেশে রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে একজন নারী দায়িত্ব পালন করছেন। আর শতাধিক দেশে এখনও কোনো নারী কখনও রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হননি।

অর্থাৎ অগ্রগতি হলেও সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পর্যায়ে লিঙ্গবৈষম্য এখনও বহাল রয়েছে।

জাতিসংঘ ও ইউএন উইমেনের ২০২৫ সালের একটি জেন্ডার বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব বিশেষভাবে নারীদের ওপর পড়েছিল।

প্রতিবেদনটিতে আন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীদের অর্থবহ অন্তর্ভুক্তিকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের অধিকারকর্মীদের মতে, জুলাই আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলন।

কিন্তু নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্য ও রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন বিশ্লেষণ বলছে, জুলাই আন্দোলনে নারীদের দৃশ্যমান ভূমিকা এখনও সমান রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে রূপ নেয়নি।

ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—জুলাই আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়া সেই নারীরা কি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সমান অংশীদার হতে পেরেছেন, নাকি আবারও তারা প্রান্তিকেই রয়ে গেছেন?

/এম/
সম্পর্কিত
খেলাধুলাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়েদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহ্বান রিজভীর
৪০ পেরোনোর পর সকালে যে ৩ অভ্যাসে গুরুত্ব দেবেন নারীরা
আগে গোল দিয়েও মালয়েশিয়াকে হারাতে পারলো না বাংলাদেশের মেয়েরা
সর্বশেষ খবর
মালয়েশিয়া থেকে সমুদ্রপথে ইন্দোনেশিয়ায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা, ৮ বাংলাদেশিসহ আটক ১৬
মালয়েশিয়া থেকে সমুদ্রপথে ইন্দোনেশিয়ায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা, ৮ বাংলাদেশিসহ আটক ১৬
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ-যুবলীগের ১৩ সদস্য আটক
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ-যুবলীগের ১৩ সদস্য আটক
‘নো গ্যাস নো বিল, নো সার্ভিস নো ট্যাক্স’
‘নো গ্যাস নো বিল, নো সার্ভিস নো ট্যাক্স’
কক্ষে উইপোকা, মাঝরাতে সার্কিট হাউস ছাড়লেন বিরোধীদলীয় উপনেতা
কক্ষে উইপোকা, মাঝরাতে সার্কিট হাউস ছাড়লেন বিরোধীদলীয় উপনেতা
সর্বাধিক পঠিত
দেড় ঘণ্টা পর শাহবাগ ছাড়লেন ‘ঢাকাস্থ নোয়াখালীবাসীরা’
দেড় ঘণ্টা পর শাহবাগ ছাড়লেন ‘ঢাকাস্থ নোয়াখালীবাসীরা’
নতুন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল
নতুন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল
বিমানবন্দরে দিলীপ তাহিলের কাছে শাহরুখকে মারার কারণ জানতে চাইলেন তরুণী
বিমানবন্দরে দিলীপ তাহিলের কাছে শাহরুখকে মারার কারণ জানতে চাইলেন তরুণী
আর্জেন্টিনার হয়ে বিদায়ী ম্যাচ খেলবেন মেসি?
আর্জেন্টিনার হয়ে বিদায়ী ম্যাচ খেলবেন মেসি?
পেডিকিউর থেকে কেনাকাটা, পাতায়ায় মার্কিন নাবিকদের ছুটির আমেজ
পেডিকিউর থেকে কেনাকাটা, পাতায়ায় মার্কিন নাবিকদের ছুটির আমেজ