জ্বালানি খাতে অরাজকতা ও ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল বন্ধে জাতীয় অডিটের দাবি জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীর বিজয়নগরে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘জ্বালানি খাতে অরাজকতা ও ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল বন্ধের দাবিতে’ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এই দাবি জানান।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশের পরিবর্তে সবার আগে লুটপাটতন্ত্র কায়েমের চেষ্টা এবং জ্বালানি খাতকে বেসরকারিকরণের উদ্যোগের মধ্যে দিয়ে পাকাপোক্তভাবে লুটপাটের আয়োজন চলছে।’
তিনি বলেন, ‘কয়লা ময়লা নয়; বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের মূল সমস্যা কয়লা নয়, বরং আমদানিনির্ভরতা ও বেসরকারিকরণের রাজনৈতিক অর্থনীতি। দেশে আগামী ৫০-৬০ বছর ব্যবহারের মতো কয়লা মজুদ থাকার পরও পরিবেশের অজুহাতে তা ব্যবহার না করে উচ্চমূল্যের এলএনজি, আমদানিকৃত কয়লা ও তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং জনগণের বিদ্যুৎ বিল, সবই বেড়েছে।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, ‘পৃথিবীর বহু শিল্পোন্নত দেশ দীর্ঘদিন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ও শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছে। পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে; তবে বাংলাদেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ ব্যবহারের সম্ভাবনাকে একেবারে পরিত্যাগ করে আমদানিনির্ভর হওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি সরকার অতীতেও জ্বালানি খাতে কার্যকর ও টেকসই সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছে। যারা অতীতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের পুনরায় একই দায়িত্ব দিয়ে এবার সফলতা আশা করা কতটা বাস্তবসম্মত, জনগণ তা জানতে চায়।’
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, ‘কুইক রেন্টালের নামে বিদ্যুৎ খাতের যে বেসরকারিকরণ ও উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল, তার বোঝা এখনও জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়ার ফলে রাষ্ট্রকে নিয়মিত আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। একই সঙ্গে এলএনজি বাজার ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়ে সরকার যদি মূল্য ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তাহলে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করবে। জ্বালানিকে পণ্য হিসেবে নয়, জাতীয় নিরাপত্তা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করে এমন কোনও সিদ্ধান্ত সরকার নিতে পারে না। এবি পার্টি বেসরকারিকরণের বিপক্ষে নয়, তবে সেটি হতে হবে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, গ্যাস সরবরাহে নিয়োজিত ছয়টি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলেই ৬৩ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিলের সমস্যার সমাধান হবে, এর নিশ্চয়তা কোথায়? ‘
তিনি আরও বলেন, ‘একটি বেসরকারি কোম্পানিকে দেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে সরকার সেই বাজার কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জ্বালানি খাতে একক বা অতিরিক্ত বাজার নিয়ন্ত্রণ ঠেকাতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলো হলো,
১. দেশীয় কয়লা ও গ্যাসের পরিবেশসম্মত ও সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
২. এলএনজি, কয়লা ও তেল আমদানির ওপর অতিনির্ভরতা কমাতে হবে।
৩. উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি ও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
৪. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সব বড় চুক্তি ও ব্যয়ের স্বাধীন জাতীয় অডিট করতে হবে।
৫. সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
৬. গ্যাসকে সার, শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বরাদ্দ করতে হবে।
৭. ভুতুড়ে ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল বন্ধে স্বাধীন অডিট ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
৮. বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি আমদানি, বিতরণ ও মিটার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
৯.বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কৌশলগত সম্পদ বেসরকারিকরণের আগে জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের মালিকানার প্রশ্নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, ‘ভুতুড়ে বিল থেকে জনগণকে মুক্ত করতে হলে শুধু মিটার বদলালেই হবে না; বিদ্যুতের মালিকানা, কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন ও বিতরণ,পুরো ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। ভারতীয় মিটার আমদানির মাধ্যমে জনগণ কী পরিমাণ সেবা পাচ্ছে এবং এসব মিটারের সঙ্গে ভুতুড়ে বিলের কোনও সম্পর্ক আছে কি না, তাও স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।’

মিটার একবার, ভাড়া ও চার্জ আজীবন







