বিরোধী দলের লং মার্চ: কী করতে চায় ক্ষমতাসীনরা?

মহসীন কবির
৩১ অক্টোবর ২০২৬, ২৩:০০ আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ২৩:০০

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসনসহ ৭ দফা দাবিতে ঢাকা থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে লং মার্চ পালন করছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।

গত ৫ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখে এ কর্মসূচি শুরু হয়।এরপর দ্বিতীয় দফা ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর এবং সর্বশেষ ৩১ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখে হয় তৃতীয় লং মার্চ।

ঢাকা থেকে শুরু হয়ে সর্বশেষ গন্তব্য পর্যন্ত একাধিক পথসভায় বক্তব্য রাখেন বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা— যেখানে সরকারবিরোধী তীর্যক বক্তব্য দিয়েছেন তারা। এমনকি সরকারের পতন ও নতুন বিপ্লবেরও হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। সামনে বরিশাল, রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিং বিভাগেও একই কর্মসূচি রয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে সরকারের পৌনে এক বছরের মাথায় এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে কী অর্জন করতে চায় বিরোধী দল? তারা কি এখনই সরকারকে ভিন্ন কোনও বার্তা দিতে চায়? আর ক্ষমতাসীনরাই বা বিষয়টি কীভাবে দেখছেন অথবা সামনে এর বিপরীতে কী করতে চান তারা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এক্ষেত্রে দুই পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এখনই চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব নয়।তবে বিরোধী দলের নেতারা যেভাবে আরেকটি বিপ্লব বা সরকার পতনেরে কথা বলছেন, তা কীসের ভিত্তিতে বলছেন, সেটি ভাববার বিষয়।

তারা কি আসলে নিজের শক্তিতেই এতটা কঠোর হচ্ছেন,  নাকি ভিন্ন কোনও শক্তির ভরসা করছেন, এমন প্রশ্নও সামনে আসছে।

যদিও ক্ষমতাসীনরা বলেছেন, বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে তারা স্বাভাবিকভাবে দেখছেন।তবে আন্দোলনের নামে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইলে তারা বসে থাকবেন না। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবেন বলে জানান।

হুঁশিয়ারি আসল নাকি ফাঁকা আওয়াজ?

সম্প্রতি দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে লং মার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে সরকারের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় বক্তব্য রাখছেন জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ নেতারা। এমনকি সরকারকে পদত্যাগেরও হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন তারা।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর)বিকালে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, শুনেছি পতিত স্বৈরাচার নাকি ডিসেম্বরে দেশে আসবে। আমরা জানি, সেই স্বৈরাচারকে এই নতুন স্বৈরাচার কোনোভাবেই মোকাবিলা করতে পারবে না। কারণ, তারা নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি, জনগণকে কীভাবে রক্ষা করবে?  তিনি বলেন, ‘‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জনগণকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মুজিববাদী ফ্যাসিবাদী শক্তি এবং এই দুর্নীতিবাজ মাফিয়া সরকারের বিরুদ্ধে  ঐক্যবদ্ধ হয়ে আবারও রাস্তায় নামতে হবে।’’

এর একদিন পর শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে ১১ দলের ঢাকা-খুলনা ও কুষ্টিয়া অভিমুখী  লং মার্চের আগে উদ্বোধনী সমাবেশে জামায়াতের আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘বিএনপির জাতির সঙ্গে প্রতারণা করে গণরায়কে উপহাস করার বিষয়টি প্রতিহতে আরেকটি বিপ্লবের জন্য দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকতে হবে।’’

সরকারের মাত্র ৮ মাসের মাথায় বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের এতটা কঠোরতা কেন, বা লং মার্চের মতো কর্মসূচি দেওয়ার পরিস্থিতি কি এখনই হয়েছে? তাদের হুঁশিয়ারি আসল, নাকি ফাঁকা আওয়াজ এমন প্রশ্নও সামনে আসছে। কেউ কেউ বলছেন, আসলে বিরোধী দল নিজের অবস্থান নিয়েও শঙ্কায় আছে। তাই তারা গরম বক্তব্য দিয়ে মাঠে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চায়। বাস্তবে তাদের এমন হুমকি কাগুজে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী (রতন) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আসলে সরকারের একবছর না হতেই বিরোধী দল যে ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে, তা ফাঁকা আওয়াজ।  বিরোধী দল হিসেবে তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে।এ কারণে দিন দিন তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কারণ তথাকথিত বিরোধী দল দুর্নীতি ও নারী নিপীড়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সাধারণ মানুষের সামনে তাদের প্রকৃত চেহারা উন্মোচিত হয়ে গেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনে ভরাডুবির মধ্য দিয়ে তারা বেসামাল হয়ে গেছে। তারা নিজেদের অবৈধ টাকার মাধ্যমে কয়েক হাজার যানবাহন নিয়ে তারা লং মার্চ করেছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে দানের টাকা এনে তারা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। সরকারের উচিত তা তদন্ত করে খতিয়ে দেখা।’’

ভিন্ন কথা বলছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও দলটির রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সারোয়ার তুষার। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলন না করলে তো সরকার লাইনচ্যুত হয়ে যেতে পারে। জনগণের অধিকার আদায়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই তো আন্দোলন হয়ে থাকে। সর্বশেষ সার্বিয়াতেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সরকার পতন হলো। আমরা মনে করি, বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তাই বিরোধী দল অবশ্যই তার জায়গা থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে পারে। সরকার সংশোধন না হলে তো এক সময় তার বিস্ফোরণ ঘটতেই পারে।’’

ভিন্ন শক্তির ওপর ভর করার পরিকল্পনা?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক  এক সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, আসলে বর্তমান বিরোধী দল নিজেদেরকে কতটা শক্তিশালী মনে করে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারছে না।একদিক দিয়ে লং মার্চ করছে, আবার সংসদে গিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বলছেন— জ্বালানি ইস্যু সরকারের সৃষ্ট নয়। আর ঠাকুরগাঁয়ের উপনির্বাচনে হেরে জামায়াত প্রার্থী বিক্ষোভের ডাক দেন। আবার বিজয়ী বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে বসে মিষ্টি খাচ্ছেন ও তার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। সেখানে বিরোধী দল হিসেবে তাদের ভূমিকা প্রশ্নবোধক। তাই তাদের কঠোর বক্তব্য ভিন্ন কোনও শক্তির ওপর ভরসা করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।’’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিরোধী দল এখন পর্যন্ত সঠিক পথেই আছে। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করছে। কিন্তু সরকার নিজেদের মতো করে একলা চলো নীতিতে চলছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে জনগণের বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘আমরা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাই না বলেই এখনই কঠোর আন্দোলন দিচ্ছি না। কিন্তু সরকার দলীয়করণ ও দুর্নীতি অব্যাহত রাখলে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিশীল অবস্থা থেকে উত্তরণ না করতে পারলে— আমরা আমাদের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেবো। এক্ষেত্রে বিকল্প কারও দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই। আমরা জনগণের শক্তি নিয়েই মাঠে নামবো।’’

কী করবে ক্ষমতাসীনরা?

লং মার্চসহ বিরোধী দলের আগামী দিনের আন্দোলনের বিপরীতে ক্ষমতাসীন বিএনপি কী করবে, এ নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির একাধিক নেতা জানান, তারা সব সময়ই গণতান্ত্রিক আচরণে বিশ্বাসী। তাই বিরোধী দলকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে প্রশাসনিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। অথচ অতীতে বিএনপিসহ বিরোধী দলের আন্দোলনে নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করেছে তৎকালীন আওয়ামী লীগ।

এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিরোধী দল তাদের আন্দোলন স্বধীনভাবেই করছে। আমাদের দল বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনও ধরনের বাধা দেওয়া হচ্ছে না। কারণ, আমরা পরমত সহিষ্ণু। তবে বিরোধী দল যদি অহেতু আন্দোলন করে দুর্ভোগ সৃষ্টি সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায়, সাধারণ মানুষই তা প্রতিহত করবে।’’

তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘‘তারা পতিত ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে হাত মেলালে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা আশা করবো, তারা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে।’’

তিনি জানান, বিএনপি কারও কাজে বাধা দেবে না। তবে কেউ নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চাইলে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে। আর আপাতত নির্বাচনি ইশতেহার পূরণ করাই বিএনপির প্রধান লক্ষ্য।’’

/এপিএইচ/  
সম্পর্কিত
১১ দলের লংমার্চের গাড়িবহর পৌঁছানোর আগে স্বাগত তোরণে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ
অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী নিয়ে পুকুরে জামায়াতের লংমার্চের বাস, নিহত ১: ঘটনাস্থলে দুই এমপি
জামায়াতের লংমার্চের গাড়িচাপায় একজনের মৃত্যু: খাদে পড়ে আহত ৩০
সর্বশেষ খবর
তাহসিফ ও দীপের শেষ সাত ঘণ্টা: সিসিটিভির বাইরে কোথায় ছিলেন
তাহসিফ ও দীপের শেষ সাত ঘণ্টা: সিসিটিভির বাইরে কোথায় ছিলেন
সংসদের আগামী অধিবেশনেই পাস হবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন আইন: বিদ্যুৎমন্ত্রী
সংসদের আগামী অধিবেশনেই পাস হবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন আইন: বিদ্যুৎমন্ত্রী
স্কুল ছেড়ে কারখানায় কাজ, এখন তিনি চীনের শীর্ষ ধনী নারী
স্কুল ছেড়ে কারখানায় কাজ, এখন তিনি চীনের শীর্ষ ধনী নারী
১১ দলের লংমার্চের গাড়িবহর পৌঁছানোর আগে স্বাগত তোরণে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ
১১ দলের লংমার্চের গাড়িবহর পৌঁছানোর আগে স্বাগত তোরণে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ
সর্বাধিক পঠিত
এইচএসসিতে সাফা, ফারিণ থেকে হিমি: কে কত পেয়েছিলেন
এইচএসসিতে সাফা, ফারিণ থেকে হিমি: কে কত পেয়েছিলেন
কনস্টেবলের স্ত্রীর সঙ্গে ‘শারীরিক সম্পর্ক’, সেই এএসপি বাধ্যতামূলক অবসরে
কনস্টেবলের স্ত্রীর সঙ্গে ‘শারীরিক সম্পর্ক’, সেই এএসপি বাধ্যতামূলক অবসরে
লাগেজ কাটা-চুরি বন্ধে নতুন ব্যবস্থা: কতটা বদলালো শাহজালাল বিমানবন্দর
লাগেজ কাটা-চুরি বন্ধে নতুন ব্যবস্থা: কতটা বদলালো শাহজালাল বিমানবন্দর
পাসের হারে শীর্ষে কোন বোর্ড, তালানিতে কোনটি
পাসের হারে শীর্ষে কোন বোর্ড, তালানিতে কোনটি
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ৬৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ৬৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী