১৫ মে মোহিন্দর অমরনাথ কথাটা মজা করে বলেছিলেন। তার বক্তব্য ছিল, ‘‘ভাবছি, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি মেখে ইন্টারভিউ দিতে যাব।’’ ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি একটা ক্রিমের নাম। যার বিজ্ঞাপনে দাবি করা হত, ওটা মাখলে গায়ের রং কয়েক পোচ ফরসা হয়ে যাবে। কিন্তু ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার মোহিন্দরের সঙ্গে ওই প্রসাধনের সর্ম্পক কী? আর ওই ক্রিম তো মূলত মহিলারা মাখেন!
ঘটনাটা ২০০৫-এর। ভারতীয় ক্রিকেট দলের কোচ নির্বাচন করা হবে। ওই পদের জন্য আবেদন করেছেন চার জন। গ্রেগ চ্যাপেল, টম মুডি, ডেসমন্ড হেনস আর মোহিন্দর। নির্বাচন হওয়ার আগেই হাওয়ায় ছড়িয়ে গিয়েছিল, গ্রেগ আর মুডির মধ্যে থেকেই কাউকে বেছে নেওয়া হবে। অর্থাৎ সাদা চামড়ার বিদেশি কেউ-ই ভারতের কোচ হচ্ছেন। সেই জন্য মোহিন্দর মজা করে ওই ক্রিম মাখার কথা বলেছিলেন। শেষমেশ মূলত সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের জোরালো সওয়ালের ফলে গ্রেগ চ্যাপেল কোচ হন এবং পরবর্তী সময়ে এই দু’জনের মধ্যেই মতবিরোধ তীব্র আকার নেয়। সেটা ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়।
হালফিলে দেখছি, কলকাতার ফুটবল ময়দানেও বিদেশি কোচ নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত প্রীতি। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের কর্মকর্তারা বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যকে বাদ দিয়ে আনলেন বিলিতি কোচ ট্রেভর জেমস মর্গ্যানকে। বছরে প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা এবং ফ্ল্যাট ও গাড়ির মতো অন্যান্য সুযোগ-সুবিধে দিয়ে। কলকাতার ময়দানে কোচদের মধ্যে এত টাকা কেউ আগে পাননি। অথচ সেই জায়গায় বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য পেতেন ২০-২২ লক্ষ টাকা। এর আগেও মর্গ্যান ইস্টবেঙ্গলে কোচিং করিয়েছেন। সাফল্য বলতে ক্লাবকে তিনি দিয়েছেন তিন বছরে দু’টো ফেড কাপ আর মর্যাদাহীন কলকাতা লিগ। অথচ ভারতীয় ক্লাব ফুটবলে এখন সবচেয়ে মর্যাদার বলে ধরা হয় আই লিগ (সাবেক জাতীয় লিগ) জয়কে। সেটা কিন্তু ইস্টবেঙ্গলকে তিনবার দিয়েছেন দুই বাঙালি কোচ। মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য একবার আর সুভাষ ভৌমিক দু’বার। কোনও বিদেশি কোচ এই সাফল্য এনে দিতে পারেননি।
ইস্টবেঙ্গলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানেরও জাতীয় লিগ জয়ের রেকর্ড দেখুন। তিন ভারতীয় কোচ--- টি কে চাটুনি, সুব্রত ভট্টাটার্য ও সঞ্জয় সেনের কোচিংয়ে তারা জাতীয় লিগ ও আই লিগ পেয়েছে। আশার কথা, এবার জাতীয় লিগে ব্যর্থ হলেও সবুজ-মেরুন কর্মকর্তারা সঞ্জয়ের ওপর আস্থা রেখেছেন। লাল-হলুদ কর্মকর্তাদের মতো বিশ্বজিৎকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেননি। কিন্তু গতবার আই লিগ এনে দেওয়া সঞ্জয় সেনের ওপরেও মোহনবাগানের কর্মকর্তারা কত দিন আস্থা রাখবেন, সেটা অবশ্য দেখার। কারণ, কলকাতার ক্লাবগুলোর দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের অধিকাংশ এখনও বস্তাপচা মানসিকতাকে আঁকড়ে চলেন। ইস্টবেঙ্গল কোচ হয়তো কোনও টুর্নামেন্ট ক্লাবের ঘরে তুললেন, কিন্তু সেই টুর্নামেন্টে মোহনবাগানের সঙ্গে ম্যাচটায় টিম হেরে গেলো। অমনি কোচকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি তোলেন ক্লাবের সদস্যদের একাংশ আর কর্মকর্তারা নুইয়ে পড়েন।
একটা দলকে ঠিকঠাকভাবে গড়ে তুলতে হলে কোচকেও খানিকটা সময় দেওয়া দরকার। যাতে তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ পান। মাথায় কার্যত বন্দুকের নল ঠেকিয়ে, সময়সীমা বেঁধে দিলে কি আর সাফল্য আসে? মর্গ্যানের মতো অত বেশি টাকা দরকার নেই, বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যকে যদি তার অর্ধেকেরও কম টাকা আর কিছুটা সময় দেওয়া হত, তাহলে তিনিও সাফল্য এনে দিতে পারতেন না, সেটা কে বলল? মর্গ্যান ৭০ লাখ পাচ্ছেন, বিশ্বজিৎকে না হয় ৩০ দেওয়া হত। আর ১০ লাখ টাকা খরচ করে তাকে বিদেশে কোনও স্বল্পমেয়াদী ট্রেনিং দিয়ে আনা যেতে পারত। তাতেও তো সোজা হিসেবে ৩০ লক্ষ টাকা বাঁচে। আবার কলকাতার ছেলে বলে বিশ্বজিতের মতো কোচকে রাখলে ফ্ল্যাট ভাড়ার খরচও টানতে হবে না। এই হিসেব কলকাতার ক্লাবগুলোর কর্মকর্তারা মাথায় রাখেন না। রাখলে যে শুধু তাদের ক্লাব নয়, বাংলার ফুটবলের লাভ হত, সেটাও তারা বোঝেন না।
মোহনবাগান যেমন একটা সময়ে মেতেছিল মরক্কান কোচ করিম বেনশারিফাকে নিয়ে। তাকে বছরে ৪০ লাখেরও বেশি টাকা দেওয়া হত। মরগ্যানের আগে করিমই কলকাতার ময়দানের সব চেয়ে দামি কোচ। অথচ তার সাফল্য কী? কোনও আই লিগ নেই। একবার কলকাতা লিগ আর ফেড কাপ। ওটুকু পেয়েই করিমের নামে বুঁদ হয়ে থাকতেন বাগান-কর্তারা। ঘরের ছেলে সুব্রত ভট্টাচার্যের কথা তাদের মনে পড়ত না। এখনও যে তারা পুরোপুরি এই ধরনের মোহমুক্ত, সেটা জোর দিয়ে বলা যাবে না।
এগারো বছর আগে মোহিন্দর অমরনাথ যেমন বলেছিলেন। বিশ্বজিৎ, সুব্রতদের বোধহয় এবার তেমনই ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি মেখে বসে থাকতে হবে। যাতে সাদা চামড়ার বলে তারা বড় দলে কোচিং করাতে ডাক পান।
/এফআইআর/








