সাকিব আল হাসান একটুখানি বাজে সময় কাটালেই শরণাপন্ন হন ছোটবেলার গুরু মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের কাছে। এইতো সর্বশেষ ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে সাকিব হুট করে ভারত দেশে ফেরেন। ওই সময় সাকিবের ব্যাড-প্যাচ চলছিলো। যদিও এবারই প্রথম সাকিব তার গুরুর শরণাপন্ন হননি। এক সময় ছিলেন খুব কাছাকাছি। গুরু সালাউদ্দিনই বিকেএসপি থেকে বেড়ে ওঠা এই ক্রিকেটারকে ২০০৪-০৫ মৌসুমে ঢাকার প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগের দল ভিক্টোরিয়ায় খেলার সুযোগ করে দেন মাত্র ১৬ বছর বয়সে।
২০০৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত জাতীয় ক্রিকেট দলের ফিল্ডিং কোচ এবং সহকারী কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন সালাউদ্দিন। এখন আর বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সঙ্গে নেই তিনি। তবে যখনই সাকিব ছন্দ হারিয়েছেন, তখনই শরণাপন্ন হয়েছেন সালাউদ্দিনের। কাছে না পেলেও ফোন করে নিয়েছেন প্রয়োজনীয় টিপস। এমনকি সালাউদ্দিনের কর্মস্থল মালয়েশিয়ায় পর্যন্ত গেছেন ছুটে সাকিব।
শনিবার বিশ্বসেরা সাকিব আল হাসান আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একদশক পূর্ণ করেছেন। গুরু সালাউদ্দিন এই দশ বছরে কিভাবে দেখেছেন সাকিবকে। ভবিষ্যতে কিভাবে চান তারই বিস্তারিত বলেছেন বাংলা ট্রিবিউনকে।
বাংলা ট্রিবিউন: কিভাবে খুঁজে পেলেন বর্তমানের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারকে?
মোহাম্মদ সালাউদ্দিন: বিকেএসপি থেকে যখন অনূর্ধ্ব-১৫ ক্রিকেট দল করা হয়; তখন দেখলাম একটা ছেলে বাঁ হাতে বল দারুণ ঘোরাচ্ছে, আবার ব্যাটিংও দারুন করছে। তখন মনে হলো, এই ছেলেটিকে ঘঁষা-মাজা করা দরকার। বয়সভিত্তিক দলে এমন ক্রিকেটারইতো প্রয়োজন। তার কিছুদিন পর ভিক্টোরিয়ার কোচের দায়িত্বটা যখন দেওয়া হলো, তখন সাকিবকে ভিক্টোরিয়ায় আনলাম।
বাংলা ট্রিবিউন : প্রথম কবে দেখেন সাকিবকে?
মোহাম্মদ সালাউদ্দিন: আমি প্রথমে মাগুরাতে দেখেছিলাম। শুনছিলাম একটা ছেলে বিকেএসপির হয়ে ছয় মাসের জন্য ক্যাম্পে সুযোগ পাবে। খেলোয়াড় হিসেবে আমি ওকে একদিন ম্যাচে দেখেছিলাম। ওই ম্যাচে ও ৭০ এর মতো রান করে। তার আগের বছর তৃতীয় বিভাগে খেলেছিল। তখন আমার কাছে মনে হয়েছে এই ছেলেটাকে প্রিমিয়ার লিগ খেলানো যাবে। তৃতীয় বিভাগ থেকে তাকে আমি সরাসরি প্রিমিয়ার লিগে ভিক্টোরিয়াতে খেলাই।
বাংলা ট্রিবিউন : সাকিবের কোন ব্যাপারটা দেখে মনে হয়েছিলো সে বিশ্বসেরা হয়ে উঠবে?
মোহাম্মদ সালাউদ্দিন: ভিক্টোরিয়ার হয়ে যেদিন আমাদের প্রথম ম্যাচ ছিল, সেদিন কয়েকজন ড্রেসিংরুমে আমাকে বলেছিলো এই ছেলেটা একদিন অনেক বড় হবে। সাকিব ৪৬ রান করেছিলো প্রথম দিন। তখন আজম ভাই ছিলেন, উনি আমাকে বলছিলেন এই ছেলেটা অনেক বড় খেলোয়াড় হবে।
বাংলা ট্রিবিউন : আজ সাকিবের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার দশ বছর পূর্ণ হলো। কোচ হিসেবে এটা কতটুকু তৃপ্তির?
মোহাম্মদ সালাউদ্দিন: ভালো খেললে, সেটা দেখতে ভালোই লাগে। সাকিব যেহেতু বিশ্বের এক নাম্বার অলরাউন্ডার এটা দেখে অবশ্যই তৃপ্তি লাগে। বাংলাদেশ কোনও ক্রিকেটার যে বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার হতে পেরেছে এটা আসলে অনেক বড় গর্বের ব্যাপার। কেউ যদি এক নম্বর হয় তখন অন্যরা চিন্তা করে সাকিব ভাই হতে পারলে আমরা কেন পারবো না। সাকিব আমাদের ক্রিকেটের অনেক মানসিকতাই বদলে দিয়েছে। এটা আমাদের জন্য অনেক গর্বের বিষয়।
বাংলা ট্রিবিউন : কোনও সমস্যায় পড়লেই সাকিবকে আপনার কাছে যেতে দেখা যায়-এর কারণ কি?
মোহাম্মদ সালাউদ্দিন: আসলে একদম ছোট থেকেই সাকিব আমার কাছে ছিলো। কারণ আমি ছোটবেলা থেকে ওকে দেখছি। ওর মানসিকতা, ওর খেলা দেখে আসছি। এটা আসলে পুরোটা মানসিক ব্যাপার। অন্য কিছু না। আমার সঙ্গে কথা বললে মানসিক একটা তৃপ্তি পায়। এসব কারণে হয়তো বুঝতে একটু সুবিধা হয়। এটাতো আসলে এক দিনের সম্পর্ক না, এটা ১৫ বছরের সম্পর্ক। দুজনই বুঝতে পারি কার কী সমস্যা। সাকিব যে আমাকেও গাইড করে না তা নয়। সে আমাকেও গাইড করে।
বাংলা ট্রিবিউন : তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে সাকিবকে কিভাবে দেখছেন?
মোহাম্মদ সালাউদ্দিন: দেশের যে কোনও ক্রিকেটারের সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সাকিবই হতে পারে রোল মডেল। এটা শুধু ক্রিকেটের ক্ষেত্রে নয়, অন্য যে কোনও ক্ষেত্রেই হতে পারে। কারণ সে দেখিয়েছে কিভাবে পেছন থেকে এক নম্বর খেলোয়াড় হওয়া যায়।
বাংলা ট্রিবিউন : কোচ হিসেবে ভবিষ্যতে সাকিবকে কোথায় দেখতে চাইবেন?
মোহাম্মদ সালাউদ্দিন: আমি মনে করি সাকিবের এখনও অনেক উন্নতি করার জায়গা আছে। ব্যাটিংয়ে তাকে আরও ধারাবাহিক হওয়া উচিত। ক্যারিয়ারের ১০ বছরে সাকিবের যেখানে থাকা উচিত ছিল, সে ওই জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। এই কারণেই আমি মনে করি তার উন্নতি করার অনেক জায়গা আছে। সে আরও ভালো ব্যাটসম্যান হতে পারে। এই জায়গাটাতেই তার আরও উন্নতি করা উচিত।
বাংলা ট্রিবিউন : সাকিব তার ক্যারিয়ার নিয়ে সচেতন। তবুও তার জন্য আপনার কোনও পরামর্শ থাকবে কি না?
মোহাম্মদ সালাউদ্দিন: সবাই ধারণা করে সাকিব অহংকারী। সাকিবকে যারা কাছ থেকে চেনে তারা সবাই জানে সাকিব এমন কিছু না। সে অনেক সোজা-সাপ্টা কথা বলে। যেটা সত্য সেটাই বলে। তার খেলাতেও কিন্তু এসবের প্রভাব পড়ে। এই জিনিসগুলো যেন সাকিব কখনও পরিবর্তন না করে।
বাংলা ট্রিবিউন: ভবিষ্যতে সাকিবকে কোথায় দেখতে চান?
মোহাম্মদ সালাউদ্দিন: সাকিব দেশের জন্য অনেক কিছু করেছে। কিন্তু তারও আরও সামর্থ্য আছে। এখন ওর বয়স ২৭ বা ২৮ বছর। সাকিবের কাছে চাইবো যে, ও যাতে সুস্থভাবে আরও ১০-১২ বছর খেলে যেতে পারে। সাকিব এমন একটা জায়গায় যাবে, যাতে সবাই বলে যে, সাকিব অনেক কিছু করে গেছে। যেমন সাঙ্গাকারা- জয়াবর্ধনে শ্রীলঙ্কার জন্য অনেক কিছু করে গেছেন। আমরা তো খুব বেশি ম্যাচ খেলতে পারি না। তারপরও যতোটা খেলা যায়, তাতে যাতে সবাই পারফর্ম করেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
/এমআর/








