X
বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২
২২ আষাঢ় ১৪২৯

সেঞ্চুরিয়নেই ঘুচলো ‘বৈষম্য’

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২২, ০০:২৮

সময়টা ২০০৮ সাল। ব্লুমফন্টেইনের স্থানীয় এক পত্রিকায় বাংলাদেশ দলের বর্তমান পেস বোলিং কোচ অ্যালান ডোনাল্ড কলাম লিখেছিলেন। যার শিরোনাম ছিল, 'টাইগারস হ্যাভ দেয়ার ফুট অন দ্য টয়লেট'। বাংলাতে যার অর্থ দাঁড়ায়, ‘বাউন্সি উইকেটে দক্ষিণ আফ্রিকান ফাস্ট বোলারদের ভয়ে টয়লেটেই পালাবেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা!’ মূলত ওই সময়ের বাস্তবতা মেনেই ডোনাল্ড এমন মন্তব্য করেছিলেন। ১৪ বছর পর সেই ডোনাল্ডই বাংলাদেশের পেস বোলিং কোচের দায়িত্বে। তাসকিন-শরিফুল-মোস্তাফিজদের খুব বেশিদিন না পেলেও তার কোচিংয়েই এবার ‘টয়লেটে পালিয়েছেন’ নিজের দেশের ব্যাটাররা। সেঞ্চুরিয়নে দুই ম্যাচে বাংলাদেশের পেসারদের তোপে সিরিজ প্রোটিয়া ব্যাটারদের ‘শাসন’ করে কিছুটা হলেও ‘বৈষম্য’ কমালো বাংলাদেশ।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের এটাই প্রথম সফর নয়। এর আগে আরও তিনবার দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। ২০০২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম সফর করে বাংলাদেশ দল। কিন্তু যুদ্ধে হার মানতে হয় সফরকারীদের। ৬ বছর পর ২০০৮ সালেও একই পরিণতি, উল্টো টেস্ট সিরিজের আগে কটূক্তি গায়ে মাখতে হয় মাশরাফি-তামিম-আশরাফুলদের! সর্বশেষ ২০১৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়ে হোয়াইটওয়াশ হতে হয়েছে বাংলাদেশকে। অবশেষে সেঞ্চুরিয়নেই হারের গেরো খুলেছেন তামিমরা। একই মাঠে স্বাগতিকদের হারিয়ে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করলো বাংলাদেশ।

সেঞ্চুরিয়নেই ঘুচলো ‘বৈষম্য’

দক্ষিণ আফ্রিকায় সদ্য সমাপ্তটিসহ বাংলাদেশ এখন খেলেছে অব্দি ৭৮টি সিরিজ। বুধবার প্রোটিয়াদের ৯ উইকেটে উড়িয়ে দিয়ে সিরিজ জয়ের মধ্য দিয়ে ৩০টিতে জয়ের ফুল ফুটিয়েছে। ৩০ সিরিজ জয়ের তালিকার মধ্যে সাতবার দেশের বাইরে জয় পেয়েছে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। দেশের বাইরে প্রথম সিরিজ জয় ২০০৬ সালে। কেনিয়াকে তাদের মাটিতে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়েছিল হাবিবুল বাশারের দল। এর বাইরে জিম্বাবুয়েকে তিনবার ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দু’বার হারানোর কৃতিত্ব রয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু এর কোনোটিই এই জয়ের সমকক্ষ নয়! দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সিরিজ জয়, বিশেষ করে এশিয়ার দলগুলোর জন্য বেশ কঠিন। সাম্প্রতিক এমন পরিসংখ্যান কেবল পাকিস্তানেরই আছে। সর্বশেষ সিরিজে ভারত ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল। ২০২১ সালে পাকিস্তান ২-১ ব্যবধানে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছিল।

পচেফস্ট্রুম, কিম্বার্লি, বেনোনি, ইস্ট লন্ডন, পার্ল— কোথাও সাফল্য পায়নি বাংলাদেশ দল। গত ২০ বছরে এই পাঁচ ভেন্যুতে এর আগে ৯টি ওয়ানডে খেলেছিল লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। কিন্তু কোনও ম্যাচে জয় তো দূরে থাক, সামান্যতম লড়াই পর্যন্ত করতে পারেনি। বাংলাদেশের মাঠে নামা মানেই যেন হতাশার কাব্যগ্রন্থ। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে শুরুতেই টপ অর্ডার ধসে পড়ে ম্যাচের ‘গল্প’ জানিয়ে দেওয়া, টেস্টের নিষ্পত্তি হয়ে যেত প্রথম সেশনেই। এ নিয়ে প্রোটিয়ার সাবেক ক্রিকেটারদেরঠাট্টা-বঞ্চনার শিকার কম হতে হয়নি বাংলাদেশকে! এতদিন দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে প্রতিটি ম্যাচে বাজেভাবেই হেরেছে বাংলাদেশ।

এর আগে প্রতিটি সফরেই ভালো খেলবো, আগের চেয়ে উন্নতি করবো-কোচ, অধিনায়করা এমন সব বুলি উড়িয়ে দেশ ছাড়তেন। এবার তামিম ইকবালরা ইতিহাস বদলের পণ করেই আফ্রিকা সফরে গিয়েছিলেন। অধিনায়ক তামিম ইকবাল থেকে শুরু করে, কোচ-টিম ম্যানেজমেন্ট বিশ্বাস করেছেন এবার তারা জিততে পারেন! প্রতিটি ক্রিকেটারের হৃদয়ে বিশ্বাস ছিল দক্ষিণ আফ্রিকায় জেতা সম্ভব, সেই বিশ্বাস থেকেই সেঞ্চুরিয়নে ১৪১ বল বাকি রেখে ৯ উইকেটে ম্যাচ জয়ের সঙ্গে এলো ঐতিহাসিক সিরিজ জয়।

সেঞ্চুরিয়নেই ঘুচলো ‘বৈষম্য’

২০ বছর আগে ২০০২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় একই পরিণতি হয়েছিল বাংলাদেশের। আগে ব্যাটিং করে বাংলাদেশ ঠিক ১৫৪ রানে থেমেছিল। সেই রান বিনা উইকেট টপকে যায় প্রোটিয়ারা। ২০ বছর পর সেঞ্চুরিয়নে আগে ব্যাটিং করে ১৫৪ রানে করে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা। সেই রান ১৪১ বল আগে এক উইকেট হারিয়ে টপকে যায় সফরকারী বাংলাদেশ। ২০ বছর পরেও হলে ওই হারের বদলা নিতে পারলো বাংলাদেশ!

দক্ষিণ আফ্রিকায় পুরনো পরিসংখ্যান বদলে দেওয়া মিশনে দক্ষিণ আফ্রিকার কোচিং স্টাফদের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান কোচ রাসেল ডমিঙ্গো, পেস বোলিং কোচ অ্যালান ডোনাল্ড, পাওয়ার হিটিং কোচ অ্যালবি মরকেল মিলে দারুন এক পরিকল্পনার ফসল ওয়ানডে সিরিজ জয়। দক্ষিণ আফ্রিকার কঠিন কন্ডিশনে কোচেরাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন। তারা প্রত্যেকেই প্রতিপক্ষের ক্রিকেটার এবং কন্ডিশন সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন। তামিমরা এই ধারণা মাঠে বাস্তবায়ন করেই সাফল্য তুলে নিয়েছেন।

সেঞ্চুরিয়নের ছোট আকৃতিতে মাঠে প্রোটিয়া ব্যাটারদের জন্য তিনশো রান করা কোনও ঘটনাই হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বুধবার তাসকিনের আগুনে বোলিংয়ের সামনে খেই হারায় প্রোটিয়া ব্যাটাররা। বিদেশের মাটিতে প্রথম ৫ উইকেট নিয়ে স্বাগতিকদের ১৫৪ রানেই আটকে ফেলে বাংলাদেশ। তাসকিনের এই সাফল্যে অংশীদার সাকিবও! পরিবারের ৫ সদস্যকে হাসপাতালে রেখে সাকিব থেকে দেখেন দলের সঙ্গে, কেবলমাত্র গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচটি খেলবেন বলেই! বুধবার ১১তম ওভারে বোলিং আসেন সাকিব, ততোক্ষণে ১ উইকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার রান ৫৯। একপ্রান্ত থেকে সাকিব একের পর এক ডট বল দিয়ে চাপ বাড়িয়েছেন। ৫৪ বলের মধ্যে ৩৯ বলেই করেছেন ডট। অন্য প্রান্ত থেকে সেটারই সুবিধা আদায় করে নিয়েছেন তাসকিন-শরীফুলরা। আর তাতেই ১৫৫ রানের সহজ লক্ষ্য তৈরি হয় বাংলাদেশের জন্য।

সেঞ্চুরিয়নেই ঘুচলো ‘বৈষম্য’

সেঞ্চুরিয়নে সহজ এই লক্ষ্যটা আরও সহজ করে ফেলেন লিটন-তামিমের ওপেনিং জুটি। দু’জন মিলে ঠান্ডা মাথায় দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে গড়েন ১২৭ রানের রেকর্ড জুটি। লিটন যখন ৪৮ রানে আউট হন, তখন জয় থেকে মাত্র ২৮ রান দূরে বাংলাদেশ। বাকি পথটুকু সাকিব ও তামিম মিলেই পেরিয়ে যান। জোহানেসাবার্গের উচু-নিচু উইকেটে ব্যর্থ হওয়া সাকিব-তামিম দু’জনই দারুন ব্যাটিং করেছেন। তামিম ক্যারিয়ারের ৫২তম হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করে ৮৭ রানে অপরাজিত থাকেন। রাবাদার করা ২৬তম ওভারের তৃতীয় বলে কাট করে পয়েন্ট দিয়ে চার মারেন সাকিব। তাতেই বাংলাদেশ নাম লেখায় ইতিহাসের পাতায়। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৯ উইকেটের বিশাল জয়ে লেখা হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের ২০০তম জয়।

/ইউএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিদ্যুতে রেশনিং চায় এফবিসিসিআই
বিদ্যুতে রেশনিং চায় এফবিসিসিআই
কমছে সব নদীর পানি
কমছে সব নদীর পানি
হেলে পড়া বিদ্যালয় ‘সোজা’ করার চেষ্টা
হেলে পড়া বিদ্যালয় ‘সোজা’ করার চেষ্টা
শীর্ষ পুরস্কার পেলো সিটি ব্যাংক
শীর্ষ পুরস্কার পেলো সিটি ব্যাংক
এ বিভাগের সর্বশেষ
শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে সমতায় প্রোটিয়ারা
শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে সমতায় প্রোটিয়ারা
আভিষ্কা ফার্নান্ডোর সেঞ্চুরিতে শ্রীলঙ্কার জয়ে শুরু 
আভিষ্কা ফার্নান্ডোর সেঞ্চুরিতে শ্রীলঙ্কার জয়ে শুরু