২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ঘরের মাঠে ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর প্রথমবার হোয়াইটওয়াশ চোখ রাঙাচ্ছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঢাকায় দুই ম্যাচ হেরে যাওয়ায়। চট্টগ্রামে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের পয়মন্ত ভেন্যুতে শেষ পর্যন্ত হোয়াইটওয়াশে হার এড়াতে পেরেছে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। সাকিব আল হাসানের আলো ঝলমলে অলরাউন্ড পারফরম্যান্সেই টানা ৯ বছর ওয়ানডেতে হোয়াইটওয়াশ না হওয়ার রেকর্ড অক্ষুণ্ন রাখতে পারে তামিম ইকবালের দল। ব্যাটিংয়ের পর বোলিংয়ে দুর্দান্ত ছিলেন সাকিব।
গত কয়েক বছর ধরেই ঘরের মাঠে ওয়ানডে ফরম্যাটে অপ্রতিরোধ্য দল বাংলাদেশ। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে আইসিসি ওয়ানডে সুপার লিগের শীর্ষেই উঠে গিয়েছিল বাংলাদেশ। এমন পরিস্থিতিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে জয়ের প্রত্যাশায় ছিল গোটা দেশ। কিন্তু নিজেদের চেনা কন্ডিশনে অচেনা বাংলাদেশের দেখা পাওয়া গেছে। মিরপুরের প্রথম দুই ম্যাচে ভিন্ন ভিন্ন কন্ডিশনে খেলে স্বাগতিকরা যেন হয়ে উঠছিল সফরকারী! প্রথম ম্যাচে স্লো উইকেট এবং দ্বিতীয় ম্যাচে স্পোর্টিং উইকেটের সুবিধা নিয়ে মিরপুরের সিরিজ নিশ্চিত করে ফেলে ইংলিশরা।
সিরিজ হারলেও চট্টগ্রামে বাংলাদেশের জন্য ম্যাচটি হয়ে উঠে মহাগুরুত্বপূর্ণ। একেতো ঘরের মাঠে নিজেদের শক্তিশালী হিসেবে পরিচিত দলটি হয়েছে ছন্নছাড়া, তার মধ্যে ৯ বছর পর ঘরের মাঠে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার আশঙ্কা। সবকিছু মিলিয়ে তাই শেষ ম্যাচটি স্বাগতিকদের জন্য হয়ে ওঠে বাঁচা মরার লড়াই। তবে টস জিতে ব্যাটিং করতে নেমে হতাশাই উপহার দিচ্ছিল বাংলাদেশ! ১৭ রানে দুই ওপেনার লিটন দাস ও তামিম ইকবাল ফিরে যাওয়ার পর আগের দুই ম্যাচের পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কাই জাগে। দুই ওপেনারের আউট ছিল দৃষ্টিকটু। ফ্লিক করতে গিয়ে পয়েন্টে ক্যাচ দেন তামিম। লিটনতো অফস্টাম্পের বাইরের বল খেলতে গিয়ে ‘জীবন দান’ করেছেন।
ব্যাটিংয়ে মুশফিক ও শান্তর শুরুটাও ছিল অস্বস্তিকর। তাদের ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছিল নবীন কাউকে কঠিন কোনো পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। যদিও শুরুর দিকে সাগরিকায় ব্যাটিং করাটা বেশ কঠিন ছিল। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটিং করা কিছুটা সহজ হয়। সেটা পরে কাজে লাগিয়েছেন সাকিব আল হাসান। শুরুর অস্বস্তি কাটিয়ে শান্ত ও মুশফিক মিলে ৯৮ রানের জুটি গড়ে প্রাথমিক বিপর্যয় সামাল দেন। ৭১ বলে ৫৩ রান করে মুশফিকের ভুলে রান আউট হন শান্ত। এদিকে নিজেকে সামলে নেওয়া মুশফিক ৯৩ বলে ৭০ রান করে আদিল রশিদের গুগলি বুঝতে না পেরে ক্লিন বোল্ড। মাহমুদউল্লাহও রশিদের বল বুঝতে না পেরে বোল্ড হয়ে ফেরেন সাজঘরে। আফিফ-মিরাজও পারেননি।
তবে একপ্রান্ত আগলে রেখে দারুণ ব্যাটিং করেছেন সাকিব। নবম ব্যাটার হিসেবে তিনি যখন আউট হন বাংলাদেশের রান তখন ২৪৬। আরও ৭ বল বাকি থাকলেও বাংলাদেশের ইনিংস থামে ওই ২৪৬ রানেই। আর্চারের বলে জেসন রয়ের দুর্দান্ত ক্যাচে বিদায় নেওয়ার আগে সাকিব রানের ফুলঝুরি ফুটিয়েছেন। শুরুতে কিছুটা স্লো ব্যাটিং করলেও শেষ দিকে মেরে খেলে ৭১ বলে ৭ চারে ৭৫ রানের ইনিংস খেলেছেন সাকিব।
চট্টগ্রামের উইকেটে ২৪৮ রানের লক্ষ্যটা খুব কঠিন ছিল না। সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছিল ইংল্যান্ড। ওপেনিং জুটিতে ৫৪ রান তোলার পর মাত্র ১ রানের ব্যবধানে ৩ উইকেট হারায় ইংলিশরা। সেখানেও কৃতিত্ব সাকিবের। তার ঘূর্ণি বল কাট করতে চেয়েছিলেন জেসন। কিন্তু নিচু হওয়া বলটি লাইন মিস করলে বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরেন তিনি। তার আগে অবশ্য ২৫ বলে ৩৫ রানের ইনিংস খেলা ফিল সল্টকে মাহমুদউল্লাহর ক্যাচ বানিয়ে ম্যাচে ফেরান বাংলাদেশকে। যদিও জেমস ভিন্স, স্যাম কারান ও জস বাটলার মিলে জয়ের পথেই রেখেছিলেন দলকে। কিন্তু ভিন্সকে বেশিক্ষণ ক্রিজে থাকতে দেননি সাকিব। তার বিদায়ের পর মঈন আলী আউট হন। সপ্তম উইকেটে ক্রিস ওকসকে সঙ্গে নিয়ে অধিনায়ক বাটলার একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
কিন্তু রিভার্স সুইপ শুধু তাকেই সাজঘরে ফেরায়নি, ইংল্যান্ডকেও ম্যাচ থেকে ছিটকে দিয়েছে। তাইজুলের দারুণ এক ডেলিভারি রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে এলবিডব্লিউর শিকার হন বাটলার (২৬)। এরপর লেজের ব্যাটারদের সঙ্গে নিয়ে ওকস চেষ্টা করেছেন, তাতে কেবল জয়ের ব্যবধান কমাতে পেরেছেন। লেজের দিকের নিজের চতুর্থ উইকেট নিয়ে সাকিব ওয়ানডেতে বাংলাদেশের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে ৩০০ উইকেটের মাইলফলক ছুঁয়েছেন। শুধু তাই নয় বিশ্বের তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে ওয়ানডেতে ৬ হাজার রান ও ৩০০ উইকেট শিকারের অনন্য নজির গড়েছেন। তার এমন অলরাউন্ড পারফরম্যান্সেই মূলত ৯ বছরের রেকর্ড অক্ষুণ্ন রাখলেন সাকিব-তামিমরা।









