আগের রাতে ভারতের কাছে অস্ট্রেলিয়ার হেরে যাওয়ায় বাংলাদেশের সামনে খুলে যায় সেমিফাইনালে যাওয়ার দুয়ার। মঙ্গলবার বোলারদের কল্যাণে আফগানিস্তানকে ১১৫ রানে থামিয়ে দিতে পেরেছিল বাংলাদেশ। তাতে করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে যেতে তাদের ১২.১ ওভারে ১১৬ করতে হতো। কিন্তু স্নায়ুক্ষয়ী ম্যাচের জন্ম দিয়ে শান্তরা সেমিফাইনালে যেতে তো পারলেনই না, উল্টো আফগানিস্তানের কাছে শেষ ম্যাচটা হারলেন সম্ভাবনা জাগিয়ে! বাংলাদেশের এমন হারে পর প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ কি জেতার চেষ্টা করেছে? পুরো ম্যাচটা কি পজিটিভ ইনটেন্ট নিয়ে খেলেছে? রান তুলতে গিয়ে নিয়মিত উইকেট হারিয়ে একটা সময় সেমিফাইনালের সমীকরণটাই ভুলে যান বাংলাদেশের ব্যাটাররা। শেষে তো জেতার সমীকরণও শান্তর দল মেলাতে পারেনি। এমন হারের পর ব্যাটারদের মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেলো।
সেন্ট কিটসের উইকেটের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের বোলাররা আফগানদের শুরু থেকেই চেপে ধরেছিল। দুই প্রান্ত থেকে চাপ অব্যাহত রাখলেও উইকেট তুলে নিতে পারছিলেন না তারা। ইনিংসের ১১তম ওভারে এসে লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেন ব্রেক-থ্রু এনে দেন। রহমানউল্লাহ গুরবাজ ছাড়া আফগান ব্যাটারদের কেউই আসলে সেভাবে প্রতিরোধ গড়তে পারেনি। পুরো টুর্নামেন্টে দারুণ বোলিং করা তানজিম হাসান সাকিব এদিন ছিলেন কিছুটা ছন্নছাড়া। তার শেষ ওভারে দুই ছক্কা না হলে বাংলাদেশের সেমিফাইনালের সমীকরণটাও ভিন্ন রকম হতে পারতো। ৪ ওভারে ৩৬ রান খরচ করে উইকেট শূন্য ছিলেন তরুণ এই পেসার।
তানজিম সাকিব ছাড়া দলের বাকি বোলাররা দারুণ বোলিং করেছেন। তাসকিন ছিলেন দুর্দান্ত। মাত্র একটি ছক্কা হজম করেছেন তিনি। ৪ ওভারে ১২ রান খরচায় তার শিকার ছিল একটি উইকেট। সাকিব ৪ ওভারে দিয়েছেন ১৯ রান, ছিলেন উইকেট শূন্য। নিজের পছন্দমতো উইকেট পেয়ে আজ আবার জ্বলে উঠেছিলেন মোস্তাফিজ। ১৭ রানে তার শিকার একটি উইকেট। তবে সবচেয়ে সফল বোলার রিশাদ হোসেন। ২৬ রান খরচায় তার শিকার ছিল তিনটি। পুরো ম্যাচে বাংলাদেশের বোলাররা ৬৬টি ডট বল করেছেন। অর্থাৎ ১১ ওভার থেকে কোনও রানই করতে পারেনি আফগানিস্তান। বাকি ৫৪ বলে আফগানরা রান নিয়েছে ১১৫!
মঙ্গলবারও বোলারদের ধারবাহিকতায় অল্প রানে আফগানদের বেঁধে রেখেছিলেন মোস্তাফিজ-সাকিবরা। সেমিফাইনালে যাওয়ার সমীকরণটা কঠিন হলেও একেবারে অসম্ভব ছিল না। ৭২ বলে বাংলাদেশের করতে হতো ১১৬ রান। এই ধরনের চেজে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কম থাকলেও আধুনিক ক্রিকেটে দলগুলো অহরহ এমন রান তাড়া করছে। বাংলাদেশের শুরুটা ইতিবাচকই হয়েছিল। নাভিন উল হকের প্রথম ওভারেই বাংলাদেশ দল তুলে নেয় ১৩ রান। কিন্তু দ্বিতীয় ওভারে ফজল হক ফারুকি আসতেই বিদায় নেন তানজিদ হাসান তামিম। চলতি বিশ্বকাপে টপ অর্ডারদের মধ্যে সবচেয়ে বাজে পারফরম্যান্স জুনিয়র তামিমের। বিশ্বকাপে ৭ ম্যাচের মধ্যে তিনটিতে রানের খাতা না খুলেই আউট হয়েছেন। তার সর্বোচ্চ রান ৩৫, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে। বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপের শুরুতেই প্রায় প্রতি ম্যাচে নিজের উইকেট বিলিয়ে দিয়ে দলের বিপর্যয় ডেকে এনেছেন তিনি।
সেমিফাইনালে উঠার লড়াইয়ে যেমন ইনটেন্ট নিয়ে ব্যাটিংয়ের প্রয়োজন ছিল, সেভাবে ব্যাটিং করেছেন লিটন। কিন্তু সঙ্গীদের আসা যাওয়ার মিছিলে একটা সময় নিজেকে খোলসবন্দি করে রাখতে বাধ্য হন। তামিমের মতো পুরো টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হয়েছেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও। আজ ৫ বলে ৫ রান করে নাভিনের দ্বিতীয় শিকার হন তিনি। শান্তকে হারিয়ে চাপে পড়া বাংলাদেশ সাকিব-লিটনের ব্যাটে প্রতিরোধের স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু আরও একবার অভিজ্ঞতার কোনও ছাপ রাখতে ব্যর্থ সাকিব আল হাসান। শান্ত ফেরার পরের বলেই নাভিনকে রিটার্ন ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক। এরপর সৌম্য সরকার ও তাওহীদ হৃদয় দ্রুত বিদায় নিলে সেমিফাইনালের স্বপ্ন বিলীন হয়ে গেছে। লঙ্কানদের বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ‘শূন্য’ রানে আউট হওয়ার পর সৌম্যকে বাকি ম্যাচগুলোতে ডাগ আউটেই থাকতে হয়েছে। আফগানদের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ফেরানো হলেও প্রত্যাশা মেটাতে পারেননি তিনি। ১০ বলে ১০ রান করে আউট হয়েছেন অভিজ্ঞ এই ব্যাটার।
নবম ওভারে তাওহীদ আউট হওয়ার পর বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ৬৪। সেমিফাইনাল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশর তখন করতে হতো ১৭ বলে ৫২ রান। বাস্তবিক অর্থেই কঠিন সমীকরণ। তারপরও আশা করা হচ্ছিল ফিনিশার খ্যাত মাহমুদউল্লাহ হয়তো কিছু একটা করবেন। কিন্তু ফিনিশার তকমা গায়ে মাখা এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারও ৯ বলে ৬ রান করে আউট হয়েছেন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একটি ম্যাচ বাদে কোন ম্যাচেই ইমপ্যাক্টফুল ইনিংস খেলতে পারেননি তিনি। তার সাথে আরেক অভিজ্ঞ ক্রিকেটার সাকিব একটি ম্যাচেই ব্যাট হাতে অবদান রাখতে পেরেছিলেন। বাকি ম্যাচগুলোতে অবদান রাখাতো দূরে থাক, উল্টো অসময়ে আউট হয়ে দলকেই বিপদে ফেলেছেন।
মাহমুদউল্লাহর পর রিশাদকে ফিরিয়ে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছিলেন রশিদ খান। তবে জুনিয়র সাকিব সেটি হতে দেননি। লিটনকে সঙ্গে নিয়ে ১২ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েছেন। তবে বেশিক্ষন স্থায়ী হয়নি তানজিম সাকিবের ব্যাটিং। গুলবাদিনকে আনতেই ১০ বলে ৩ রান করে আউট হন তিনি। এরপর তাসকিনকে নিয়ে জয়ের চেষ্টা চালিয়ে যান লিটন। তাসকিনও লিটনকে সঙ্গ দিতে পারেননি। এই পেসারের আউটের পরের বলেই মোস্তাফিজ বিদায় নিলে ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতিতে বাংলাদেশ হেরে যায় ৮ রানের ব্যবধানে। তাতে জন্ম নেয় আফগান রূপকথার। বাংলাদেশকে হারিয়েই তো প্রথমবারের মতো সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে তারা। এমন অর্জনে দলটি মাঠেই আনন্দ উৎসব করেছে। এক প্রান্ত দাঁড়িয়ে লিটনের এসব দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। ওপেনিংয়ে নেমে ৫ চার ও ১ ছক্কায় ৫৪ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি।
আফগানদের বিপক্ষে এমন হারে কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হচ্ছে ব্যাটারদের। শুধু এই ম্যাচেই নয়, পুরো টুর্নামেন্টেই ব্যাটাররা অস্বস্তিকর ব্যাটিং করেছেন। অভিজ্ঞ যারা ছিলেন, তারাও প্রত্যাশা মেটাতে পারেননি। ধারাবাহিকভাবে একের পর এক ব্যর্থতার মিছিল চলেছে। জয়ের সংখ্যার হিসেবে এটি হয়তো সফল একটি টুর্নামেন্ট। কিন্তু বাংলাদেশ দল যেভাবে ছন্নছাড়া ক্রিকেট খেলেছে, তাতে করে আসলে এই দলটি নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখাও যেন অন্যায়। অবশ্য বাংলাদেশের প্রধান কোচ সুপার এইটে উঠার পর যখন বলে দেন, সুপার এইটে আসার পর বাকি সব ‘বোনাস’। তখন সেই দলের জয়ের মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিবেই।








