ফারুক, বুলবুলের পর তামিম—ক্রিকেটে কি ভাবমূর্তি ফিরবে?

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:২৪আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:০২

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) যেন অনেকটাই ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলা চলছে। গত প্রায় দুই বছরে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই খেলাটি তিন জন সভাপতি পেয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কে আগে বোর্ডে বসবেন—তা নিয়েই শুরু হয় লড়াই। ফারুক আহমেদের পর হঠাৎ করে আসেন প্রবাসী আমিনুল ইসলাম বুলবুল, আর সব শেষে দায়িত্ব নিয়েছেন তামিম ইকবাল।

তিন জনই জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক এবং তিন জনই ক্রিকেটের উন্নয়নে নিজেদের নিয়োজিত করার কথা বলেছেন। তবে প্রথম দুজন এখন অতীত, আর তৃতীয় জনের পথচলা সবে শুরু। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় তারা বা বোর্ডের পরিচালকেরা এসেছেন, তা ছিল অনেকটাই দৃষ্টিকটু।

প্রত্যেকেই নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করেছেন, অথচ পরবর্তীতে প্রায় একই প্রক্রিয়ায় নিজেরাই দায়িত্বে এসেছেন—যা এক ধরনের দ্বিচারিতার ইঙ্গিত দেয়।

শুরুর দিকে ফারুক আহমেদকে ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছিল। হঠাৎ করেই তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তাকে সরিয়ে দেন। যদিও এর আগেই তিনি বিভিন্ন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। পরে আবার সেই ফারুকই নতুন বোর্ডে সহ-সভাপতি হন।

অন্যদিকে, আমিনুল ইসলাম বুলবুল কখনও ভাবেননি যে তিনি সভাপতি হবেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভাগ্য খুলে যাওয়ায় তিনি সেই চেয়ারে বসেন। পরে ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সভাপতি হন। এমন নির্বাচন হয়েছে যে সারা জীবন সততার কথা বলা বুলবুলও চেয়ারের জন্য আপস করেছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষেত্রেও নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

বর্তমান সরকার আসার পর বুলবুলের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়ে। গত বছরের অক্টোবরের বিসিবি নির্বাচন নিয়ে সরকারি তদন্তে উঠে এসেছে ভোট কারচুপি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতার ঘাটতির চিত্র—যা দেশের ক্রিকেট পরিচালনায় গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এর ধারাবাহিকতায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বুলবুলের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়।

সাবেক বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের কমিটির তদন্তে দেখা যায়, বিসিবির শীর্ষ কর্মকর্তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসহযোগিতা করেছেন। বুলবুল নিজে সরাসরি সাক্ষাৎকার না দিয়ে লিখিত জবাব দেন। তবে কমিটির মতে, নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় বিসিবি ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার সম্পৃক্ততায় অনিয়ম হয়েছে।

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) ক্রীড়া পরিচালক মোহাম্মদ আমিনুল এহসান সংবাদ সম্মেলনে জানান, নির্বাচন প্রক্রিয়া অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ ছিল না; ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে এবং ব্যাপক অনিয়ম ঘটেছে। এসব কারণে সরকার বোর্ড ভেঙে দেওয়ার যথেষ্ট কারণ পেয়েছে।

কমিটির মতে, তামিম ইকবালের অভিযোগ থেকেই তদন্তের সূচনা। কাউন্সিলরদের নাম জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়ানোর পেছনে অসৎ উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যথাযথ কারণ ছাড়াই সময়সীমা বাড়িয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সভাপতি আমিনুল ইসলাম এবং তৎকালীন পরিচালক নাজমুল আবেদীন ফাহিম প্রভাব খাটিয়ে কাউন্সিলর পদ নিশ্চিত করেন। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রভাবেও অ্যাডহক কমিটিতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়—যা ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

এছাড়া, গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে একতরফাভাবে ১০ জন সাবেক ক্রিকেটারকে কাউন্সিলর মনোনয়ন দেওয়া হয়। ই-ভোটিং প্রক্রিয়াতেও কারচুপির প্রমাণ পাওয়া গেছে; ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়নি এবং একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে ভোট পরিচালিত হয়েছে। তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে এই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করা হয়েছিল।

বুলবুলের সময়ে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে বিতর্কই বেশি আলোচিত হয়েছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়া নিয়ে খেলোয়াড়দের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেননি তিনি। ঘরোয়া ক্রিকেটও সচল করতে ব্যর্থ হন। তার কিছু মন্তব্যও সমালোচনার জন্ম দেয়।

সব শেষে, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকার বুলবুলের বোর্ড ভেঙে দিয়ে তামিম ইকবালকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করে। তবে এই কমিটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এতে মন্ত্রী-এমপিদের আত্মীয়স্বজন থাকার অভিযোগও উঠেছে।

দেখা গেছে, যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, তারা নিজেদের মতো করে বোর্ড গঠন করেছে—প্রক্রিয়া যাই হোক না কেন। ফলে গত কয়েক বছরে ক্রিকেট মাঠের চেয়ে বাইরের ঘটনাই বেশি আলোচনায় এসেছে। এমনকি একজন সমর্থক মন্তব্য করেছেন, মাঠের খেলার চেয়ে চেয়ারের লড়াইই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর ফলে ইতিবাচক সাফল্য—যেমন পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়—অনেক সময় আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে তামিম ইকবাল দায়িত্ব নিয়েছেন। প্রথম দিনেই তিনি নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন, যদিও কীভাবে তা বাস্তবায়ন করবেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তিনি বুঝতে পারছেন যে ক্রিকেট এখন মাঠের চেয়ে বাইরের নেতিবাচক কারণে বেশি আলোচিত। তাই তিনি ইতিবাচক ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন। তবে পথ সহজ নয়। আমিনুল ইসলাম বুলবুল এখনও নিজেকে সভাপতি দাবি করে বিবৃতি দিচ্ছেন—অর্থাৎ দ্বন্দ্ব চলমান।

সব মিলিয়ে, কথার লড়াই ছাড়িয়ে ঘরোয়া ক্রিকেট সচল করা এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা—এটাই এখন তামিম ইকবালদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

/টিএ/এফআইআর/এমওএফ/
সম্পর্কিত
পদত্যাগ করেছেন শন টেইট
বাংলাদেশ সফরের ব্যাখ্যা দিলো আইসিসি
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
সর্বশেষ খবর
শেষ মুহূর্তেও একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলেন তারা
শেষ মুহূর্তেও একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলেন তারা
ছোট ছেলে শ্বশুরবাড়ি, বড় ছেলের ঘরের মেঝে খুঁড়ে মায়ের লাশ উদ্ধার
ছোট ছেলে শ্বশুরবাড়ি, বড় ছেলের ঘরের মেঝে খুঁড়ে মায়ের লাশ উদ্ধার
‘শাহজালালে হাজিদের লাগেজ কেটে চুরির অভিযোগ সঠিক নয়’
‘শাহজালালে হাজিদের লাগেজ কেটে চুরির অভিযোগ সঠিক নয়’
৩০০ ফিটে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চীনা নাগরিকের মৃত্যু
৩০০ ফিটে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চীনা নাগরিকের মৃত্যু
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের