জাতীয় দলে ডাক নতুন নয়, তবে টেস্ট ক্যাপ এখনও অধরা। ভাগ্যও যেন বারবার পরীক্ষা নিয়েছে মুশফিক হাসানের। এবারও সুযোগটা এসেছে অন্য এক পেসারের দুর্ভাগ্যে। চোটে ছিটকে যাওয়া নাহিদ রানার পরিবর্তে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্টের দলে জায়গা পেয়েছেন ২২ বছর বয়সী এই ডানহাতি পেসার। কিন্তু এই ডাকের পেছনে লুকিয়ে আছে অভাব, ত্যাগ আর এক নানীর অটুট বিশ্বাসের গল্প।
বাবা-মা দুজনই জীবিত। তবু ছোটবেলা কেটেছে তাদের সান্নিধ্য ছাড়াই। সংসারের অভাব মেটাতে বাবা হেলাল খান ও মা মোর্শেদা খাতুনকে ঢাকায় এসে গার্মেন্টসে কাজ নিতে হয়েছিল। তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া মুশফিককে রেখে যেতে হয় নানীর কাছে। সেই নানীর হাত ধরেই বড় হয়েছেন তিনি। ক্রিকেটের স্বপ্ন দেখার সাহসটাও এসেছে তার কাছ থেকেই।
অভাবের সংসারে ক্রিকেট ছিল বিলাসিতা। কিন্তু নানী কখনও নাতির স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। কাতারপ্রবাসী এক মামাও পাশে ছিলেন। তাদের উৎসাহ আর সহযোগিতাতেই ক্রিকেটের পথে হাঁটা শুরু মুশফিকের।
ছোটবেলা থেকেই নিজের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস ছিল তার। তবে দারিদ্র্যের বাস্তবতা বারবার সেই স্বপ্নকে ভয় দেখাত। অবশেষে ২০১৮ সালে সুযোগ আসে। এলাকার বড় ভাই রাশেদের হাত ধরে লালমনিরহাটের দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো ক্রিকেট বল হাতে ম্যাচ খেলতে নামেন।
প্রথম ম্যাচেই নজর কাড়েন তিনি। তার গতি ও বোলিং দেখে মুগ্ধ হন রংপুর বিভাগের কোচ বিপুল ফাতেমী নিকেল। শুধু প্রশংসাই করেননি, নিজের ফোনে মুশফিকের নম্বরও লিখে রেখেছিলেন।
বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই স্মৃতি তুলে ধরে মুশফিক বলেছিলেন, ‘‘লালমনিরহাটে (পাটগ্রাম, সাহেবডাঙা) আমি টেপ টেনিসে খুব জোরে বোলিং করতাম। রাশেদ ভাই ২০১৮ সালের দিকে আমাকে দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেটে নিয়ে যান। ওখানেই প্রথম ক্রিকেট বলে ম্যাচ খেলি। বোলিং ভালো হওয়ায় নিকেল স্যার আমাকে দেখে বলেছিলেন, ‘তুমি অনেক ভালো বোলার হবে। দুই মাস পর বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের মেডিক্যাল হবে, চলে এসো।’ আমার নম্বরও নিয়ে রেখেছিলেন।’’
কয়েক মাস পর সত্যিই কোচের ফোন আসে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান মুশফিক। কিন্তু সামনে বড় প্রশ্ন—বাবা-মা কি অনুমতি দেবেন?
সেই কঠিন কাজটিও সহজ করে দেন নানী। নাতির স্বপ্নে ভরসা রেখে তিনি বাবা-মাকে রাজি করান। পরিবারের সম্মতি নিয়েই রংপুরে গিয়ে বয়সভিত্তিক দলের বাছাইয়ে অংশ নেন মুশফিক। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জায়গা করে নেন অনূর্ধ্ব-১৬ দলে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার পেশাদার ক্রিকেটের পথচলা।
এরপর একের পর এক বাধা পেরিয়ে শুধু ক্রিকেটারই হননি, পরিবারের দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন। অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পাওয়ার পর ঢাকায় জীবিকার জন্য থাকা বাবা-মাকে আবার গ্রামের বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন।
২০২২ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের স্কোয়াডেও ছিলেন মুশফিক। ২০২৩ সালে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টের দলেও ডাক পেয়েছিলেন। তবে অভিষেক হয়নি। এবার নাহিদ রানার বদলি হিসেবে আবারও সুযোগ এসেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার তারকা পেসার কাগিসো রাবাদাকে আদর্শ মানা মুশফিকের স্বপ্ন অবশ্য শুধু জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলা নয়। তার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানো।
একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার দ্বারা যেন আমার পরিবারকে সবাই চেনে। আমি এমন কিছু করতে চাই, যাতে আমার মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল হয়। জাতীয় দলে খেলতে চাই। আর আমার বাবা-মায়ের আর্থিক কষ্ট দূর করতে চাই।’
নানীর আশীর্বাদ, নিজের অদম্য পরিশ্রম আর একরাশ স্বপ্ন নিয়ে মুশফিক এখন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে। এবার অপেক্ষা—স্বপ্নের সেই টেস্ট ক্যাপ কি শেষ পর্যন্ত তার মাথায় উঠবে?







