যুদ্ধের কারণে আফগানিস্তান ছেড়েছেন অনেকেই। কেউ অন্য দেশে গিয়ে নাগরিকত্ব পেয়েছেন, কেউ আবার শরণার্থী হয়ে জীবন-যাপন করে যাচ্ছেন। আমির উদ্দিন শরিফি তাদেরই একজন। আফগানিস্তানে যুদ্ধের কারণে ৩৫ বছর আগে দেশ ছেড়েছে তার পরিবার। আশ্রয় নিয়েছে ইরানে। এরপর থেকে সেখানেই শরিফি পরিবারের বসতি। রাজধানী তেহরানে জন্ম নেওয়া শরিফি সেখানেই ছোটবেলায় ফুটবলে দীক্ষা নিয়েছেন। সময়ের পরিক্রমায় আফগান জাতীয় দল ছাড়াও বিভিন্ন দেশের ক্লাব ফুটবলে খেলে নিজ দেশের ঝাণ্ডা তুলে ধরছেন এই স্ট্রাইকার।
আফগানিস্তানের বাঘলান শহরে শরিফি পরিবারের বসতি ছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে পুরো পরিবার নিয়ে অন্যদের মতো তেহরানে চলে যান শরিফির বাবা ও মা। চার ভাই ও এক বোন নিয়ে চলতে থাকে বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। ভাই-বোনদের মধ্যে দুজনকে বেশ ফুটবলে টানতো। বড় ভাই আফগানিস্তানের বিচ ফুটবল দলের সদস্য। শরিফিও কম যাচ্ছেন না। ২০১৩ সাল থেকে আফগানিস্তান জাতীয় দলে খেলছেন। ২৩ ম্যাচে ৩ গোলও আছে তার।
২০১৩ সালে জাতীয় দলে খেলার আগে আফগানিস্তানে ক্লাব ফুটবলে তার অভিষেক। সেখান থেকে কিরগিজস্তানে চার বছর খেলে এখন বাংলাদেশের পুলিশ এফসিতে খেলছেন। প্রিমিয়ার লিগে পুলিশ এফসি পয়েন্ট তালিকায় চার নম্বরে আছে। দলের এখানে আসার পেছনে শরিফির অবদান অনেক। একটি হ্যাটট্রিকসহ আছে ৪ গোল।
আফগানিস্তানের নাগরিকত্ব তো আছেই। চেয়েছিলেন ইরানের নাগরিকত্বও। কিন্তু আইন না থাকায় এখনও শুধু বসবাসের অনুমতি নিয়েই থাকছে শরিফির পুরো পরিবার। তাই কিছুটা আক্ষেপের সুরে পুলিশ এফসির এই স্ট্রাইকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘ইরানের আইনে আমাদের নাগরিকত্বের কোনও সুযোগ নেই। আমাদের ও ইরানের ভাষা প্রায় কাছাকাছি। এখানে অমরা ভালো আছি। তবে আমাদের জন্য অনেক নিয়ম-কানুন আছে। ইচ্ছা করলেই আমরা অনেক কিছু করতে পারি না। উন্নতি করতে চাইলেও...।’
২০১২ সালে বড় ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম আফগানিস্তানে আসেন শরিফি। এরপর জাতীয় দলে ঢুকতেও সময় লাগেনি। সবশেষ ২০১৮ সালে নিজ মাতৃভুমিতে পা দিয়েছিলেন। চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ফুটবলের সঙ্গে অনেকদিন ধরেই তার বসবাস। ২৯ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার বললেন, ‘আসলে আমার ফুটবলের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখে খেলে যাচ্ছি। আমার বড় ভাই আফগানিস্তানের বিচ সকার দলের সদস্য। আমাদের পরিবারের কিছু সদস্য ইরান ও আফগানিস্তানে বসবাস করে। আমি চাই ফুটবলে আরও উন্নতি করতে।’
বর্তমানে আফগানিস্তান শাসন করছে তালেবান। সেখানে এখনও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। নানারকম দুর্ভোগ চলছে। তবে শরিফি বলছেন অন্য কথা, ‘এখন তালেবানদের শাসনামলের পরিস্থিতি একেবারেই অন্যরকম। আগের চেয়ে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি ভালো। শুধু নারীদের কিছু বিষয় আছে। এই দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।’ সঙ্গে যোগ করেছেন, ‘এটি তাদের (তালেবান) একটি প্রচলিত বিশ্বাস, ধারণা। তাদের বোঝা উচিত, সময় বদলেছে। বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি ভুল ধারণাগুলোর জায়গা দখল করে নিয়েছে।’
বাংলাদেশের লিগে দাপটের সঙ্গে খেলে যাচ্ছেন তিনি। লক্ষ্য প্রিমিয়ার লিগের সেরা খেলোয়াড় হওয়া। তবে তা যে কঠিন, বুঝতে পারছেন। বাংলাদেশের ফুটবলে মানসম্মত ফুটবলার চোখে পড়লেও সমস্যাও দেখছেন এই স্ট্রাইকার, ‘অবশ্যই যেকোনও ফুটবলার চায় নিজের সেরাটা দিতে। লিগে সেরা গোলদাতা কিংবা সেরা খেলোয়াড় হতে। আমি একজন স্ট্রাইকার হিসেবে গোল চাই। লিগে সেরা খেলোয়াড় হতে চাই। বাংলাদেশের লিগে কোয়ালিটি খেলোয়াড় আছে। তবে অনেক সমস্যাও আছে।’
সংগ্রাম করে বেড়ে ওঠা শরিফি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চান। ধমনীতে তার আফগান রক্ত। শরণার্থী থেকে ফুটবলের মাধ্যমে নিজ দেশের ঝাণ্ডা তুলে বেড়ানোতেই তার যত প্রশান্তি!








