ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় রাতে জমকালো উৎসবের প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে গেছে প্যারিস ও মিলানে। একটি নগরী মেতে উঠবে আলোর ঝলকানিতে, আরেকটি ঢেকে যাবে বিষাদের ছায়ায়। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার রঙিন হবে নানা উজ্জ্বল আলোয়। মিউনিখ থেকে সেই আলো নিভিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করার ভাবনা ইন্টার মিলানের। কিন্তু ইতিহাস গড়ার দ্বিতীয় সুযোগ এবার আর হাতছাড়া করতে চাইছে না প্যারিস সেন্ট জার্মেই।
আজ শনিবার রাতে মিউনিখে ইন্টার ও পিএসজির চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল দিয়ে পর্দা নামছে ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবল মৌসুমের। বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় জার্মানির স্টেডিয়াম অ্যালিয়েঞ্জ এরেনায় মুখোমুখি হবে দুই দল।
শক্তির পরীক্ষায় পাস করে দুই দল ফাইনালে। নকআউট পর্বে লিভারপুল ও আর্সেনালকে বিদায় করেছে পিএসজি, আর বার্সেলোনা ও বায়ার্ন মিউনিখকে কাঁদিয়ে শিরোপার বেশ কাছে পৌঁছে গেছে ইন্টার। এখন শেষ বাধা টপকানোর পালা, কে পারবে?
ফাইনালের মতো হাইভোল্টেজ ম্যাচে অভিজ্ঞতা একটা বড় ব্যাপার। সেই হিসাবে এই ম্যাচে ফেভারিট ইন্টার। যে একাদশ তারা নামাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেটার গড় বয়স ৩০ বছর চার মাস, অন্যদিকে পিএসজির ২৪ বছর ৭ মাস। দুই বছর আগে সবশেষ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে খেলা আট জনকে দলে পাচ্ছে ইন্টার। আর পিএসজিতে বর্তমানে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে পাঁচ বছর আগের ফাইনালে খেলেছিলেন মারকুইনহোস। পাঁচ বছর আগের সেই ফাইনাল ছিল যার ক্যারিয়ারেরও প্রথম।
শনিবারের ফাইনালে প্যারিস ক্লাবের তারুণ্যকে ছাপিয়ে অভিজ্ঞতার বিচারে এগিয়ে থাকছে ইতালিয়ান ক্লাব।
শিরোপার এই লড়াইয়ে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন দুই দলের কিপার। ইন্টারের ইয়ান সমার ও পিএসজির জিয়ানলুইজি দোনারুম্মার বীরত্বেই তো সেমিফাইনালের কঠিন পথ পাড়ি দেওয়া গেছে। বার্সার বিপক্ষে দ্বিতীয় লেগে অন্তত পাঁচটি সেভে ইন্টারকে জেতাতে ভূমিকা রাখেন। দোনারুম্মাও পিএসজির হয়ে আর্সেনালের বিপক্ষে সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগে অসাধারণ সেভ করেন। মার্টিন ওডেগার্ড, গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি ও বুকায়ো সাকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে লুইস এনরিকের দলকে এগিয়ে রেখেছিলেন ইতালিয়ান কিপার। তাই এই ম্যাচকে দুই কিপারের দ্বৈরথ বললে ভুল হবে না।
তবে ডাগআউটে লুইস এনরিকের উপস্থিতি যেন পিএসজিকে নিয়ে গেছে অন্য এক পর্যায়ে। ২০১৫ সালে বার্সেলোনাকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লা লিগা ও কোপা দেল রে জেতানোর ১০ বছর পর আরেকটি ট্রেবল জয়ের সুযোগ তার সামনে। দুটি ভিন্ন ক্লাবের হয়ে দুইবার ট্রেবল জয়ের বিরল কীর্তিতে পেপ গার্দিওলাকে কি ছুঁতে পারবেন তিনি!
এনরিকের বিশ্বাস, মিউনিখে ইতিহাস গড়তে পারবে পিএসজি। ১৯৯৩ সালে মার্শেইর পর দ্বিতীয় ফরাসি ক্লাব হিসেবে ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ তাদের সামনে। ২০২০ সালে একমাত্র ফাইনাল খেলে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হারের কষ্টের পুনরাবৃত্তি করতে চায় না ফ্রান্সের চ্যাম্পিয়নরা।
শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে এনরিকে বললেন, ‘ইতিহাস গড়া এমন একটা ব্যাপার, যেটা ক্লাবে এর আগে কেউ করেনি। আমি তাদের (খেলোয়াড়দের) মানসিকতা পছন্দ করি। যেখানে আমরা থাকতে চাই, সেখানেই আছি। যতটা সম্ভব শক্তিশালী হয়ে কাল আমরা জিততে চাই। শুরুর পথচলা আমাদের জন্য কঠিন ছিল। কিন্তু আমাদের মধ্যে ভয়ের কোনও লক্ষণ নেই। কালও পাবো না।’
২০২৩ সালের ফাইনালে ম্যানসিটির কাছে হারতে হয়েছিল ইন্টারকে। তাতে ১৩ বছরের শিরোপা খরা সেদিন ঘুচাতে পারেনি ইতালিয়ান জায়ান্টরা। ২০১০ সালে সবশেষ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার পর সেই খরা বেড়ে এখন ১৫ বছরে। কোচ সিমোনে ইনজাগি বললেন, ‘খেলোয়াড়রা অসাধারণ কিছু করেছে। বায়ার্ন ও বার্সেলোনার মতো দুটি বিশ্বমানের দলের বিপক্ষে আমরা চারটি চমৎকার ম্যাচ খেলেছি। আমাদের ভক্তদের সঙ্গে এই অর্জন (ফাইনালে ওঠা) উদযাপন করা ছিল দারুণ।’
ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে ইন্টার কোচ বললেন, ‘এই ম্যাচ জেতার দৃঢ় সংকল্প ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমাদের মাঠে নামতে হবে। যে মানের খেলা খেলে আমরা এখানে, সেটাই আমরা আমাদের মতো করে খেলবো। এই যাত্রা ছিল চ্যালেঞ্জে পূর্ণ, সেটাই আমাদের দারুণ আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। এতদূর এসেছি, আমরা এখন থামতে চাই না।’
১৯৬৪, ১৯৬৫ ও ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়ন ইন্টার এবার চতুর্থ ট্রফি ঘরে তোলার অপেক্ষায়। কদিন আগে সিরি আ-র শেষ দিনে অল্পের জন্য নাপোলির কাছে শিরোপা হাতছাড়ার হতাশা একপাশে সরিয়ে রাখছেন ইনজাগি, ‘খেলায় মানসিক দিক গুরুত্বপূর্ণ। খেলোয়াড়রা অনেক পরিশ্রম করেছে। হ্যাঁ, অবশ্যেই আমরা সিরি আ শিরোপার হতাশা একপাশে রেখেছি। খেলোয়াড়দের আচ্ছন্ন হলে চলবে না, তাদের অবশ্যই সঠিক মাত্রার দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে।’
অ্যালিয়েঞ্জ এরেনায় যুদ্ধের জন্য তৈরি দুই দলই। শেষ পর্যন্ত কারা বিজয়ের হাসি হাসবে? উৎসব হবে প্যারিসে নাকি মিলানে? সেই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশে পাওয়া যাবে মধ্যরাতে। তবে উত্তেজনায় ঠাসা এক ম্যাচ যে হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।








