ছোটবেলায় ব্যাংকার বাবা আমীর মোহাম্মদের মৃত্যুর পর চাপটা বাড়ছিলই। মা নাসিমা আক্তার চার সন্তান বড় করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত গলদঘর্ম হচ্ছিলেন। টানাপোড়েনের সংসারে বড় ছেলে আব্দুল্লাহ ওমরের ক্যারিয়ারও নানা আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল। শুরুতে ফুটবল ছেড়ে দিয়ে গার্মেন্টসে চাকরি, তারপর বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি। কিন্তু ভাগ্যের লিপিতে হয়তো লেখা ছিল একসময় ফুটবলেই ক্যারিয়ার গড়বেন। তাই গার্মেন্টসের চাকরি বাদ দিয়ে বিদেশ যাওয়া বন্ধ হলে আবারও ফুটবলে ফিরে জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেকের অপেক্ষায়। এমন কণ্টকাকীর্ণ জীবনে এই সময়ে এসে ২৩ বছর বয়সী ডিফেন্ডারের কাছে এখনও সবকিছুই মনে হচ্ছে স্বপ্নের মতো।
বাংলাদেশ দল এখন নেপালে অবস্থান করছে। ৬ ও ৯ সেপ্টেম্বর স্বাগতিকদের বিপক্ষে দুটি ফিফা প্রীতি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ। হাভিয়ের কাবরেরার দলে প্রথমবার ডাক পেয়েই চূড়ান্ত দলে জায়গা করে নিয়েছেন চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে উঠে আসা ফুটবলার। শুরুটা চট্টগ্রামের লাকী ক্লাব দিয়ে হয়েছিল। তারপর কাস্টমসের হয়ে প্রিমিয়ার লিগ খেলে হঠাৎ ছন্দপতন। ফুটবল ছেড়েছুড়ে গার্মেন্টসেও চাকরি করেছেন। পাশাপাশি পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন মধ্যপ্রাচ্যের কোনও এক দেশে। কিন্তু বিধাতা তো আব্দুল্লাহর ভাগ্যে ফুটবল ছাড়া অন্য কিছু রাখেননি। তাই গার্মেন্টসে কয়েক মাস কাজ করার পর দেশের বাইরে যাওয়ার নিদারুণ চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু কিছুতেই চাওয়া মতো মিলছিল না। এমন করতে করতে জীবন থেকে প্রায় দুবছর শেষ। বিদেশে যেতে না পেরে যখন হতাশায় নিমজ্জিত ঠিক সেসময় চট্টগ্রামের কিষোয়ান দলের হয়ে আবারও ফুটবলে ডাক আসে আব্দুল্লাহর। ডাক পেয়ে আর পিছনে তাকাননি।
এরপর ঢাকার ফর্টিস এফসির হয়ে শুরু থেকে খেলে এখন কাবরেরার দলে জায়গা করে নিয়েছেন। জীবনের এমন বাঁকবদল আব্দুল্লাহ ওমরের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। কাঠমান্ডুতে যাওয়ার আগে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে বাংলা ট্রিবিউনকে সেই কথাই শোনালেন তিনি, ‘আমার এখনও ভাবতে কেমন জানি লাগছে। কিছুতেই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না আমি বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলছি। প্রথমবার সুযোগ পেয়েছি, এটা আমার কাছে স্বপ্নের চেয়ে বড় কিছু। আমার ক্যারিয়ার কোথা থেকে কোথায় এসেছে, ভাবতেই অন্যরকম লাগে।’
শুধু জীবনের ঘাত প্রতিঘাত নয়, জাতীয় দলে ডাক পাওয়া নিয়ে নাটকীয় মুহূর্তও আছে তার। এর আগে দুবার ফোনে আব্দুল্লাহকে বলা হয়েছিল, ‘তুমি জাতীয় দলে আছো। তোমাকে ডাক দেওয়া হবে।’ আব্দুল্লাহ তাই খুশিতে তার মাকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু টানা দুবার এমনটির পর আর ডাকা হয়নি। এবার তাই বিশ্বাস হচ্ছিল না। আবার যদি শুধু ফোনেই সীমাবদ্ধ থাকে সবকিছু! তবে তৃতীয়বারের ডাক আর ভুল প্রমাণিত হয়নি। সত্যি সত্যি কাবরেরার দলে ডাক পেয়ে অনুশীলন করেছেন। তাই মাকে এবার সবকিছু সত্যি হওয়ার পরই খুশির খবরটি জানিয়েছিলেন। আব্দুল্লাহ এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে বসে বলছিলেন, ‘কী বলবো বলেন। আগের দুবার ডাকের কথা বলেও ডাকা হয়নি। এবার তাই শুরুতে বেশি খুশি হতে পারেনি। যখন দেখলাম সত্যি হচ্ছে, সবকিছু ভালো লাগা কাজ করতে শুরু করে। একপর্যায়ে মাকে বলেছি, সবাইকে জানিয়েছি, তারা বেশ খুশি। তারপরও আমার কাছে মনে হচ্ছে লাল-সবুজ জার্সি পরে খেলতে যাচ্ছি, দেশের প্রতিনিধিত্ব করবো- পুরো বিষয়টি এখনও অবিশ্বাস্য।’
আনন্দের মুহূর্তে স্মৃতি রোমন্থনও করেছেন আব্দুল্লাহ। গার্মেন্টেসে কিংবা বিদেশ চলে গেলে আজ জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করতে পারতেন না। যে সম্মানটা পেতে শুরু করেছেন, তা হয়তো পেতেন না। এলাকাবাসীসহ দেশবাসী অনেকেই তাকে চিনতে পারতো না, এ এক অন্য সম্মান। আব্দুল্লাহ বলছিলেন, ‘ফুটবলার না হলে তো আজ সেই সম্মান পেতাম না। আসলে বাবা মারা যাওয়ার পর ফুটবল খেলে শুরুতে তেমন টাকা পয়সা পেতাম না। মা ও চার ভাই-বোনের সংসার চালাতে বেশ কষ্ট হতো। তাই মা-ই বলছিলেন বিদেশে চলে যেতে। আমাদের এলাকার অনেকেই থাকেন। গার্মেন্টসে কাজ করছিলাম অভিজ্ঞতার জন্য। যেন বিদেশে গিয়ে কাজে সহায়তা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে নানা কারণে বিদেশে যাওয়া হয়নি। আমার একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর মাধ্যমে আবারও চট্টগ্রাম লিগে চলে আসি। তারপর ফর্টিসে টানা ৬ মৌসুম খেলে এখন বাংলাদেশ দলে।’
ফুটবল খেলে সংসারে ভালোমতোই সাহায্য করছেন আব্দুল্লাহ ওমর। মাসহ পরিবারের অন্যরাও খুশি। আব্দুল্লাহর চাওয়া এখন জাতীয় দলে স্থায়ী হওয়া। তবে তপু-তারিক কাজী-মেহেদী হাসানের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা কঠিন। এবার তো আবাহনীর শাকিল হোসেন চোটে পড়ায় আব্দুল্লাহর ভাগ্য অনেকটা খুলে যায়। চারদিন অনুশীলন করে চূড়ান্ত দলে আছেন।
আব্দুল্লাহ ওমরের ডাক নাম সজীব। মাঠে সুযোগ পেলে সজীবতা নিয়ে খেলেই নিজের জায়গাটা নিরেট করার ইচ্ছা এখন তার। তবে পথ যে কঠিন তা মানছেন। তাই জীবনের কঠিন পথে নিজেকে সঁপে দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে লড়াই চালিয়ে যেতে চান তিনি।








