আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং স্পেন—মহিমান্বিত ট্রফিটি ছুঁয়ে দেখা থেকে আর মাত্র দুটি ম্যাচ দূরে দাঁড়িয়ে। কার হাতে উঠতে পারে বিশ্বকাপের শিরোপা, তারই একটি ধারণা পেতে সেমিফাইনালে ওঠা এই চার দলের এখন পর্যন্ত পারফরম্যান্সের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছে বিবিসি স্পোর্টস।
চারটি দলই ইতোমধ্যে ছয়টি করে ম্যাচ খেলেছে। তবে নকআউট পর্বের ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর কারণে ফ্রান্স ও স্পেনের তুলনায় আর্জেন্টিনা পুরো এক ঘণ্টা বেশি ফুটবল খেলেছে এবং ইংল্যান্ড খেলেছে আধা ঘণ্টা বেশি।
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি গোল (১৭টি) করলেও আক্রমণভাগের সামগ্রিক পারফরম্যান্সের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে দুইবারের বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স। প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে সবচেয়ে বেশি গোল, যৌথভাবে সবচেয়ে বেশি শট এবং সর্বোচ্চ 'এক্সপেক্টেড গোলস'-এর দিক থেকে ফরাসিরাই সেরা দল।
দক্ষিণ আমেরিকার দল আর্জেন্টিনা সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কার্যকারিতা দেখিয়েছে; তারা নিজেদের তৈরি করা সুযোগের ১৮% গোলের রূপান্তর করেছে। অন্যদিকে, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। সেমিফাইনালের প্রতিপক্ষ ফ্রান্সের সমান শট (১১০টি) নেওয়া সত্ত্বেও তারা গোল করতে পেরেছে মাত্র ১১টি, যেখানে ফ্রান্স করেছে ১৬টি—যা প্রায় প্রতি ম্যাচে এক গোল কম।
শটের সংখ্যা এবং মান—উভয় দিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাকি তিন দলের তুলনায় ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ কিছুটা কম সৃজনশীল ছিল। তবে জুড বেলিংহাম এবং হ্যারি কেইনের চমৎকার ফিনিশিংয়ের কল্যাণে তারা প্রতি ম্যাচে গড়ে দুইয়ের বেশি গোল ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
রক্ষণভাগের দিক থেকে স্পেন এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নিরেট ও শক্ত অবস্থান দেখিয়েছে; কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয়ী হওয়ার ম্যাচে তারা চলতি টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম গোলটি হজম করে। অবশ্য ফ্রান্সও কম যায়নি, তারা ছয় ম্যাচে গোল খেয়েছে মাত্র দুটি।
ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে যেখানে রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য দেখাচ্ছে, সেখানে মঙ্গলবারের লড়াইয়ে তাদের এই 'অদম্য শক্তি' নাকি স্পেনের 'দুর্ভেদ্য প্রাচীর' শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়, তা দেখাটা হবে বেশ রোমাঞ্চকর।
অন্যদিকে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার অপর সেমিফাইনালটিতে আরও বেশি গোল দেখার বড় সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ কোনও দলই রক্ষণভাগে তেমন একটা নজরকাড়া পারফরম্যান্স দেখাতে পারেনি।
উভয় দলই এখন পর্যন্ত ছয়টি করে গোল হজম করেছে; যার মধ্যে ইংল্যান্ড প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে বেশি সুযোগ তৈরি করতে দিয়েছে এবং আর্জেন্টিনা সেই সুযোগগুলো রুখে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম সফল হয়েছে।
আর্জেন্টিনা সবচেয়ে বেশি দূরত্ব (৭০৬.৫ কিমি) অতিক্রম করলেও, সেটি কেবল তারা বেশি সময় ফুটবল খেলার কারণেই হয়েছে।
খেলার সময়কে বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, সেমিফাইনালে ওঠা চার দলের মধ্যে আসলে তারাই সবচেয়ে কম দৌড়েছে এবং সবচেয়ে কম স্প্রিন্ট (তীব্র গতিতে দৌড়ানো) করেছে। প্রকৃতপক্ষে, এখন পর্যন্ত খেলা প্রতিটি ম্যাচেই তারা প্রতিপক্ষ দলের চেয়ে দৌড়ের দিক থেকে পিছিয়ে ছিল।
তাই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরার (প্রেসিং) ক্ষেত্রেও বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা সবচেয়ে কম আগ্রাসী ছিল; ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও স্পেনের তুলনায় প্রতিপক্ষের সীমানায় গিয়ে তাদের বল কেড়ে নেওয়ার হার ছিল সবচেয়ে কম।
এর ঠিক বিপরীত চিত্র স্পেনের ক্ষেত্রে। শেষ চারের মধ্যে তারাই সবচেয়ে বেশি পরিশ্রমী দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে; সেমিফাইনালিস্টদের মধ্যে তারাই সবচেয়ে বেশি দৌড়েছে, স্প্রিন্ট করেছে এবং প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে বেশি চাপে রেখেছে।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল বলের দখল রাখার ক্ষেত্রেও সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে (৬৬%)—যা কেবল ৪ সেমিফাইনালিস্ট নয়, বরং এই বিশ্বকাপের যেকোনও দলের চেয়ে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি আর্জেন্টিনার সঙ্গে যৌথভাবে টুর্নামেন্টে তাদের পাসিংয়ের নিখুঁত হারও সবচেয়ে বেশি (৯০.৪%), যদিও শেষ চারের চারটি দলই পাস দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ পারদর্শী।
ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারদের থ্রু বলগুলো রুখে দেওয়ার জন্য বেশ সতর্ক থাকতে হবে, যা আর্জেন্টিনা এবং বিশেষ করে লিওনেল মেসি এখন পর্যন্ত খেলতে ভীষণ পছন্দ করেছেন।
দলটির এই জাদুকরি অধিনায়ক চলতি বিশ্বকাপে অন্য যেকোনও খেলোয়াড়ের চেয়ে সবচেয়ে বেশিবার (১৫ বার) তার সতীর্থদের উদ্দেশে নিখুঁত থ্রু বল বাড়িয়েছেন।
তবে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডারদেরও ইংল্যান্ডের নিজস্ব আক্রমণভাগের হুমকি সামলাতে হবে।
থমাস টুখেলের দল সেমিফাইনালিস্ট চার দলের মধ্যে ওপেন প্লে-তে ক্রসিংয়ের দিক থেকে সবচেয়ে সফল হয়েছে; যেখানে তাদের প্রতি চারটি ক্রসের একটি সতীর্থদের খুঁজে পেয়েছে।
আর এই কারণেই তারা এই টুর্নামেন্টে যৌথভাবে সবচেয়ে বেশি হেডে গোল (চারটি) করেছে এবং যেকোনও দলের চেয়ে সর্বোচ্চ হেডে শট (২৪টি) নিয়েছে।
সেমিফাইনালের শেষ চারের মধ্যে আর্জেন্টিনার ভেসে আসা বলের দখলের লড়াইয়ের সাফল্যের হার সবচেয়ে কম; এই তথ্যটি ইংল্যান্ডকে আশাবাদী করতেই পারে যে ভেসে আসা বলে তাদের এই আধিপত্যের ধারা বজায় থাকবে। এ ছাড়া ৫০-৫০ বল দখলের লড়াইয়েও সামগ্রিকভাবে তাদের সাফল্যের হার সবচেয়ে বেশি (যদিও ব্যবধানটা খুবই সামান্য)।
চলতি বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির চেয়ে মাত্র দুই জন খেলোয়াড় বেশি ড্রিবলিং করে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে পেরেছেন, তবে তার সতীর্থদের খুব কম সময়ই এমন ড্রিবলিংয়ের চেষ্টা করতে দেখা গেছে।









